টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

জঙ্গি তৎপরতা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অভিশাপ

ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন

A-F-M-Khalid-Hossainচট্টগ্রাম, ২৭ জুলাই (সিটিজি টাইমস)::সন্ত্রাস পৃথিবীব্যাপী পরিচিত একটি বহুল আলোচিত শব্দ। সন্ত্রাস ও জঙ্গি তৎপরতা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অভিশাপ এবং মানবতার প্রতি চরম হুমকি। Encyclopedia Encarta তে সন্ত্রাসের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে,Violence or  the threat of violence, especially bombing, kidnapping, and assassination, carried out for  political purposes.

রাজনৈতিক কারণে হোক বা অন্য কোন ব্যাপারে স্বার্থ সিদ্ধি ও আতংক সৃষ্টি করার নিমিত্ত বোমা বিস্ফোরণ, অপহরণ, ভয়-ভীতি বা গুপ্ত হত্যার মত ঘৃণ্য কাজ করাই হল ‘সন্ত্রাসবাদ’; যা সভ্য সমাজে সাধারণত গ্রহণযোগ্য নয়।

সন্ত্রাসের কোন ধর্মীয় ভিত্তি নেই, ইসলাম ধর্মে এটি ঘৃণ্যতম কাজ। ভীতি তথা ফিতনা সৃষ্টি হত্যার চাইতেও মারাত্মক। ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্ম, বর্ণ, জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে সব মানুষের প্রাণ, সম্পদ, মর্যাদা অত্যন্ত পবিত্র।

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করল। আর যে ব্যক্তি কারো জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করল।’

জোর করে, শক্তি প্রয়োগ করে বা অস্ত্রের বলে ইসলামের আদর্শ কোথাও প্রচারিত হয়নি। পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে মুসলিম শাসকদের অনেক সময় প্রতিপক্ষ শক্তির আগ্রাসন প্রতিরোধে ‘পবিত্র জিহাদ’-এ আশ্রয় নিতে হয়েছে।

তরবারি বা অস্ত্রের মুখে ইসলাম প্রচারিত বা চাপিয়ে দেয়া হয়নি। যুগে যুগে সাধক, দরবেশ ও ধর্মপ্রচারকগণ দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে ইসলামকে দুনিয়ার এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁদের আমানতদারী, পরোপকারিতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, আদর্শের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা দেখে দলে দলে মানুষ ইসলামের ছায়া তলে আসে।

ইসলাম দেড় হাজার বছর ধরে ঠিকে আছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত ঠিকে থাকবে তার কালজয়ী আদর্শ, অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কারণে। ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে পারস্পরিক সহ-অবস্থান, সহিষ্ণুতা, মানবিক আচরণ ইসলামের অন্যতম শিক্ষা। ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, অঞ্চল, ধর্ম ও নৃতাতাত্তি¡ক জাতিগোষ্ঠীর (Pluralistic and diverse society) মাঝে ইসলাম ঠিকে থাকার ক্ষমতা আছে, তা প্রমাণিত বাস্তবতা।

ইসলামের সন্ত্রাসের কোনও ঠাঁই নেই, মুসলমানরা কোন সন্ত্রাস করতে পারে না। ইসলাম হচ্ছে শান্তির ধর্ম বা জীবনব্যবস্থা। তাই এর অনুসারীরা মানুষ হত্যা করতে পারে না, সম্পত্তি বিনষ্ট করতে পারে না।

কেননা, নিরপরাধ মানুষ হত্যাকে পবিত্র কুরআনে সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার শামিল বলে গণ্য করা হয়েছে। কাজেই কোনও মুসলমান নিছক রাগ-বিরাগের বশবর্তী হয়ে মানুষতো দূরের কথা অন্য কোনও প্রাণীও হত্যা করতে পারে না।

বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড সামাজিক নৈরাজ্য ও অস্থিরতার জন্ম দেয়। মহানবী (সা.)-এর ভাষ্য অনুযায়ী গোটা বিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাওয়া আল্লাহ তায়ালার নিকট যে কোন মানুষকে হত্যা করার তুলনায় অধিক তুচ্ছ ও নগন্য। এর কারণ আসমান জমিন মূলতঃ সৃষ্টি হয়েছে মানুষের উপকারার্থে; এখন যদি সে মানুষকে হত্যা করা হয় তা হলে এ পৃথিবীর প্রয়োজনীয়তা আর বাকী থাকে না।

সব ফেরেশতা ও পৃথিবীর সকল প্রাণী বিশেষত উলামা, সালেহীন, ফাসিক ও জালিম সবাই মিলে যদি কোন মানুষকে হত্যা করে তবে আল্লাহ তায়ালা এর অপরাধে তাদের সবাইকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতে বিন্দু মাত্র দ্বিধা ও কুন্ঠাবোধ করবেন না। ইসলামে যুলুম করা হারাম।

মহানবী (সা.) বলেন, তোমরা মযলুমের বদ দু’য়াকে ভয় করো। কেননা তার দু’য়া ও আল্লাহ তায়ালার মধ্যে কোন পর্দা থাকে না। মযলুমের দু’য়া আল্লাহ তায়ালার দরবারে তাৎক্ষণিকভাবে কবুল হয়। যে ব্যক্তি কোন যালিমের শক্তি বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্যে তাঁর সঙ্গে চলে; অথচ সে জানে যে, ওই ব্যক্তি যালিম, তখন সে ইসলামের গন্ডি হতে বের হয়ে গেল।

বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন,“আল্লাহর কসম ! যালিমের অত্যাচারের অভিশাপে এমনকি সারস পাখীও নিজের বাসায় কাতর অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।”

সমরক্ষেত্রে মানবিক আচরণ
সাধারণত যুদ্ধ ক্ষেত্রে মানবাধিকার ক্ষুন্ন হয়, মানবিক আচরণ ব্যাহত হয়, নির্বিচারে মানুষ মারা যায়। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ গোটা পৃথিবীর যুদ্ধের ইতিহাস নৃশংসতার উন্মত্ত তান্ডবের রক্তাক্ত দলিল। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) অনিবার্য কারণে যে ২৭টি সশস্ত্র যুদ্ধে (গাযওয়া) এবং তাঁর নির্দেশে সাহাবায়ে কেরাম যে ৩৮টি সশস্ত্র যুদ্ধে (সারিয়্যা) অংশ নেন তাতে যুদ্ধ্যমান ব্যক্তি ছাড়া সাধারণ মানুষের যাতে প্রাণহানি না ঘটে সে ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত সজাগ।

মহানবীর কঠোর নির্দেশ যুদ্ধক্ষেত্রে কোন অশীতিপর বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, শিশু, নারী, অসুস্থ, ধর্মীয় উপসনালয়ে অবস্থানরত পুরোহিতদের হত্যা করা যাবে না, কোন বৃক্ষ অকারণে কর্তন করা যাবে না এবং স্থাপনা ধ্বংস করা যাবে না। কিছু অনিবার্য ব্যতিক্রম ছাড়া রাসুলুল্লাহ (স.)- এর এ নির্দেশনা হাজার বছর ধরে প্রতিপালিত হয়ে আসছে।

সন্ত্রাবাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া
নিজ ধর্মের ইমাম ও অন্যধর্মের পুরোহিতদের হত্যা, হুমকি, বোমাবাজি, আতংক সৃষ্ঠি, বিদেশীদের জিম্মি বানিয়ে হত্যার মত সন্ত্রাসবাদের দূরপ্রসারী প্রভাবতো আছেই, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যাপক-

১) বিশ্ববাসীর কাছে ইসলাম সম্পর্কে ভুল বার্তা যায়। বিদেশীরা মনে করে ইসলাম সন্ত্রাসী ধর্ম এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের ইসলাম সহ্য করতে পারে না। যেখানে পারো তাঁদের খেদাও। ইসলামের দাওয়াতী তৎপরতা বাধাগ্রস্থ করা সন্ত্রাসীদের উদ্দেশ্য।

২) নাম, টুপি-দাড়ি, হিজাব, বোরকা-জিলবাব মুসলমানদের পরিচয় ও ঐতিহ্য বহন করে। বিদেশ বিভূঁয়ে বসবাসরত মুসলমান নারী-পুরুষ এ ঐতিহ্য লালন ও ধারনে ভীতিগ্রস্থ হচ্ছেন। পথে ঘাটে অপদস্থ হওয়ার বহু ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটেছে।

৩) যে দেশে বিদেশী ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও দাতাসংস্থার পরামর্শক (Consultant) সন্ত্রাসীদের হাতে মারা যায়, স্বাভাবিকভাকে সে দেশে বৈদেশিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও বিদেশী সাহায্য বাধাগ্রস্থ হয়। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়।

৪) জঙ্গিদমনে সহায়তা দানের প্রস্তাব নিয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে উঠে।

সন্ত্রাসবাদের বৈশ্বিক বিস্তৃতি
সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গি তৎপরতা আগে নির্দিষ্ট কতিপয় দেশে বা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল। ইদানিং পশ্চিম এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা ও আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ছে। বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত সশস্ত্র লোকেরা হামলা করার জন্য মার্কেট, হোটেল, গণপরিবহণের স্টেশন, বিমান বন্দর, ধর্মীয় উপসনালয় বেছে নেয়। আত্মঘাতী বোমার আঘাতে নিজেও উড়ে যায় অন্যদেরকেও উড়িয়ে দেয়। এখন পৃথিবীর কোন জায়গাই আর নিরাপদ নয়। সবাই ঝুঁকিতে। সন্ত্রাসবাদের সাথে ধর্মের সম্পর্ক নেই। ধর্মকে ব্যবহার করা হয় স্বার্থ হাসিলের জন্য। ধর্ম এখানে মূল অবলম্বন নয় অনুষঙ্গি মাত্র। কেউ নিজেদেরকে ‘সুন্নি’, ‘মুজাহিদ’, ‘আল্লাহর পথের যোদ্ধা’, ‘হকপন্থী’, ‘তাগুতের যম’, ‘বখতিয়ারের তলোয়ার’, ‘সালাহুদ্দিনের ঘোড়া’,‘তিতুমীরের কেল্লা’, ‘খিলাফত প্রতিষ্ঠার সৈনিক’ ইত্যাদি পরিভাষায় পরিচয় দিলে খোঁজ খবর নিতে হবে, চালাতে হবে অনুসন্ধান।

উৎস কোথায়, উদ্দেশ্য কী ? ইসলামের মৌল আদর্শ-শিক্ষার সাথে তাঁদের কর্মতৎপরতার সাদৃশ্য ও বৈশাদৃশ্য কী ? জানতে হবে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামদের মহিমান্বিত জীবনধারার সাথে তাদের কর্ম প্রয়াস ও তৎপরতার মিল আছে কিনা।

কেউ যদি কপালে ‘আল্লাহু আকবার’ ব্যাজ লাগিয়ে অথবা ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে সশস্ত্র অভিযান চালায় তাৎক্ষণিক পুলকিত হওয়ার কোন কারণ নেই। কেবল মাত্র ধর্মীয় পরিভাষার উপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নিলে সমূহ বিপদে পড়ার আশংকা বিদ্যমান। আমাদের মনে রাখতে হবে হযরত আলী (রা.)-এর যমানায় ধর্মীয় উগ্রগোষ্ঠী খারেজী সম্প্রদায় ‘ইনিল হুক্মু ইল্লালিল্লাহ’ শ্লোগান দিয়ে বিদ্রোহ করেছিল। মুসলিম বিশ্বে তারা সমূহ বিপর্যয় সৃষ্টি করে। তাঁদের হাতে বহু মুসলমান শাহাদত বরণ করেন।

হযরত আলী (রা.)-কে শহীদ করার পর ঘাতক আবদুর রহমান ইবন মুলজিম উচ্চস্বৈরে আল্লাহ আল্লাহ যিকির করছিল।

তরূণের হাতে অস্ত্র
সন্ত্রাসবাদের যারা মূলহোতা (Mastermind) তারা দূর থেকে পুরো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। তাদের অর্থের অভাব নেই। গোটা দুনিয়া জুড়ে তাদের নেটওয়ার্ক। তাদের পরিচয় কী তা তদন্ত ছাড়া স্পষ্ট করে বলা যাবে না। তবে আঁচ করা যায়। এক দিন তাদের মুখোশ খসে পড়বে। তরূণ ও যুবকরা তাদের টার্গেট। মানুষ চেতনা ও আবেগ দ্বারা পরিচালিত হয়। বৃদ্ধদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত তরুণদের মন মগজে চেতনা-আবেগ থাকে অধিক সক্রিয়।

পবিত্র জিহাদের ডাক, তাগুতের উৎখাত, জান্নাতের প্রত্যাশা, খিলাফত পুনপ্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে সামনে রেখে বাছাইকৃত তরূণদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং তুলে দেয়া অস্ত্র, বোমা ও গ্রেনেড। তারুণ্যের উচ্ছাসজনিত দুঃসাহসিকতাও (Adventurism) এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মুসলমানের ছেলেরা বুঝতে পারে না যে তারা অন্যের হয়ে কাজ করছে। এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবি ও মিডিয়ায় প্রচারণা চালাত যে, মাদরাসার ছাত্রগণ সন্ত্রাস ও জঙ্গি তৎপরতার সাথে জড়িত। তাঁদের মতে যেহেতু অধিকাংশ মাদরাসার ছাত্র সমাজের দরিদ্র শ্রেণী থেকে উঠে আসা; সহজেই মোহনীয় টাকার হাতছানি তাদেরকে সন্ত্রসবাদের সাথে যুক্ত করে।

তাঁদের এ অভিযোগে সম্পূর্ণ অসত্য, মিথ্যা ও কাল্পনিক। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে, এখন সন্ত্রাসী তৎপরতার সাথে যুক্ত তরূণরা সমাজের অতি বিত্তশালীদের সন্তান, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে উত্তীর্ণ ও দেশ-বিদেশের নামি-দামি সরকারী-বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া।

এখন এর কী জবাব আছে ? আমরা মনে করি সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী তৎপরতার জন্য কোন বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দায়ী নয়

গুলশান থেকে শোলাকিয়া
কুটনৈতিকপাড়া নামে খ্যাত ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে জঙ্গিদের হাতে ২০জন দেশী-বিদেশী প্রাণ হারানোর ঘটনায় দেশবাসী স্তম্ভিত, বেদনাহত ও আতংকগ্রস্থ। পবিত্র রামাযান মাসে নিরীহ মানুষদের নৃশংস হত্যাকান্ড কেউ সহজে মেনে নিতে পারেননি। ইতালীর যেসব ব্যক্তি আমাদের দেশে গার্মেন্টস ব্যবসার সাথে জড়িত এবং ঢাকার মেট্রোরেলের পরামর্শক (Consultant Engineer) হিসেবে জাপানের যেসব প্রকোশলী কর্মরত আমরা তাঁদের জিম্মি বানিয়ে জবাই করে দিলাম। তাঁরাতো কোন পক্ষ-বিপক্ষের লোক নয়, অপরাধী নয় বরং উন্নয়ন সহযোগী। এ হত্যাকাণ্ড কোন ধর্ম, আদর্শ, নৈতিকতা ও রাজনীতির মাপকাটিতে পড়ে না।

ইসলাম ও বাংলাদেশ সম্পর্কে বহির্বিশ্বে ভুলবার্তা (Wrong Message) গেছে, এতে কোন সন্দেহ নেই। পবিত্র ঈদের দিনে শোলাকিয়া ঈদগাহের অনতিদূরে পুলিশের সাথে বন্দুক যুদ্ধে দু’জন কনস্টেবলসহ ৪ব্যক্তি প্রাণ হারালেন। ঈদের দিনে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই প্রথম।

কারা আমার দেশের কম বয়সী তরূণদের হাতে অস্ত্র দিয়ে ইসলামের চেহারা কালিমা লিপ্ত করার প্রয়াস চালাল তাদের খুঁজে বের করে আইনের হাতে সোপর্দ করা রাস্ট্রের দায়িত্ব। রাজনৈতিক দোষারোপের (Political blaming) পুরনো খেলায় মেতে উঠলে প্রকৃত অপরাধী গা ঢাকা দেবে, নির্দোষ মানুষ শাস্তি পাবে।

একটা ব্যাপার লক্ষ্য করার মত নিহত জঙ্গিদের মৃতদেহ তাদের পরিবার নিতে আগ্রহী হয়নি। এমনকি শোলাকিয়ায় নিহত আবিরের জানাযায় কেউ শরীক পর্যন্ত হয়নি। জনৈক তত্ত¡াবধায়ক ইমামতি করে লাশ দাফনের ব্যবস্থা করেন। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, এদেশের মানুষ এসব জঙ্গি কর্মকান্ড পছন্দ করে না।

উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে 
সা¤্রাজ্যবাদীদের খেলা বহুমুখী। পৃথিবীর কোনও দেশে সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলেই মুসলমানদের ওপর তার দায়ভার চাপিয়ে দেবার প্রবণতা আমরা কয়েক দশক ধরে লক্ষ্য করছি। অথচ এফবিআই এবং ইউরোপোলের গবেষণাধর্মী রিপোর্ট থেকে স¤প্রতি ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেসব সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চলেছে তার সিংহভাগই চালিয়েছে অমুসলিমরা।

‘লোনওয়াচডটকম’ নামের ওয়েব সাইটের তথ্যানুসারে ইউরোপীয় ইউনিয়নে সংঘটিত সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের দশমিক ৪ শতাংশ ঘটেছে মুসলিমদের দ্বারা। বাকি ৯৯.৬ ভাগ সংঘটিত করেছে অমুসলিম বা অন্যধর্মের অনুসারীরা। ১৯৮০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় যত সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ঘটেছে তার ৬ শতাংশ মুসলিম নামধারীদের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। বাকি ৪২% ল্যাটিন, ২৪% বামমনা, ৭% ইহুদি চরমপন্থি, ৫% সমাজতন্ত্রী ও ১৬% ঘটেছে অন্য গ্রুপগুলোর দ্বারা।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, এশিয়ার বিভিন্ন দেশসহ ইউরোপ আমেরিকাতে কোনও সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলেই ঢালাওভাবে বাছবিচার না করেই মুসলমানদের ওপর তার দায় চাপিয়ে দেয়া হয়।

বিশেষ করে এক শ্রেণীর মিডিয়া সন্ত্রাসের দায়দায়িত্ব মুসলিম সংগঠনসমূহের ওপর চাপিয়ে যেন বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে বগল বাজাতে শুরু করে।

সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটিয়ে কখনও কখনও দু’একটি মুসলিম নামধারী গ্রুপ নিজেদের ইসলামের অনুসারী বলে দাবি করে। কিন্তু আসলেই কি তারা মুসলিম? নাকি মুসলমানের ছদ্মবেশে অন্য কেউ? তারা তো এমনও হতে পারে যে, কোনও পক্ষের হয়ে কাজ করার জন্য তাদের তৈরি করা হয়েছে।

বিশেষত ইসলাম এবং মুসলমানদের ওপর সন্ত্রাসের দায়ভার চাপিয়ে প্রকৃত সন্ত্রাসীরা নিজেদের দায়মুক্ত করবার চেষ্টা করছে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়াবার কাজটি কৌশলে চালিয়ে তার লক্ষ্য হাসিল করতে চাচ্ছে?

স¤প্রতি প্রকাশিত লোনওয়াচডটকমের রিপোর্ট দেখে এটা নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়ে জান-মালের যে ব্যাপক ক্ষতি করা হয়েছে তার জন্য ইসলাম বা এর অনুসারীরা দায়ী নয়। দায়ী অন্য কেউ। অন্য কোনও পক্ষ। আগামীদিনের বিশ্ব নিশ্চয়ই প্রকৃত সন্ত্রাসীদের চিনতে সক্ষম হবে।

মুসলমানদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি
হযরত উমর (রা.)-এর পর ১৪০০ বছর ধরে মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে বিভেদ, মতবিরোধ, বিসংবাদ, সহিংসতা, সংঘাতে বিধ্বস্ত-বিপর্যস্ত। রক্তপাতে বহু অমূল্য জীবনের অবসান হয়েছে।

প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, নানা দল-উপদল এক অপরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে নিজের জীবনীশক্তিকে এভাবে নিঃশেষ করে দিয়েছে যে, দুশমনের সাথে মুকাবিলা করার সামর্থ্য আর অবশিষ্ট নেই।

মানবতার বাণী, ঐক্যের ডাক, পরমত সহিষ্ণুতা উপহাসে পরিণত হয়। এর নেপথ্যে কুশীলবের ভূমিকায় ছিল ইহুদী আবদুল্লাহ ইবন সাবা, মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাই-এর অনুসারীরা। বর্তমানে তারা আরো বেশী সক্রিয়। এখন মুসলমানরা অনেক বেশী দলাদলিতে বিভক্ত। নিজেদের দল-উপদল নিয়ে সর্বক্ষণ ব্যতিব্যস্ত। পবিত্র কুরআনের ভাষায় “কুল্লু হিযবিন বিমা লাদাইহিম ফারিহুন”। কার লেখায় কার বর্ণনায় কার কিতাবে কী ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে তার অনুসন্ধানী গবেষণায় আমরা অহোরাত্রি ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছি। উরারফব ধহফ জঁষব পলিসি এখনও কার্যকর রয়েছে একথা আমাদের মনে নেই। শত্রু চিনতে ভুল হচ্ছে।

ভাই হয়ে গেল দুশমন, দূরের অপরিচিত লোক হয়ে গেল বন্ধু। নতুন বিভেদ সৃষ্টি এবং পুরনো বিভেদকে চাঙ্গা করার জন্য ইসলামের চিরশত্রুরা কতিপয় উদ্যমি তরূণ ভাইদের হাতে নেয় এবং এখনো নিচ্ছে।

হতাশ হলে চলবে না
পৃথিবীতে একেক সময় একেক বিপদ, ফিতনা, বিপর্যয় মানবজাতির অস্থিত্বকে বিপন্ন করে তুলেছে। ইহূদী আবদুল্লাহ ইবন সাবাহ, মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাই, গুপ্তঘাতকদের নেতা হাসান আল সাবাহ, খারেজী নেতা আবদুল্লাহ ইবন আল কাওয়া, পারস্যের নাদিরশাহ, মঙ্গোলিয়ার হালাকু খান-চেঙ্গিস খান, মধ্যএশিয়ার তৈমুর লঙ, বাংলার মীর জাফর, মহীশুরের মীর সাদিক, স্পেনের ওমর ইবন হাফসুন, জার্মানীর হিটলার, ইতালির মুসুলিনি, বলকানের কসাই ¯েøাভদন মেলোসিভিস-এর সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের কারণে এক সময় পৃথিবী ছিল সন্ত্রস্ত, বিপর্যস্ত, বাকরুদ্ধ।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে দিল্লী, বাংলা থেকে যুগো¯øাভিয়া পর্যন্ত রক্তের গঙ্গা বইয়ে দিয়েছে তারা। এখনো মাঝে মধ্যে তাদের উত্তরসূরীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। আমাদের হতাশ হলে চলবে না। সাহস সঞ্চয় করতে হবে।

আমাদের সব কাজ হবে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি বিধানের জন্য। ঘন কালো মেঘের আড়ালে সূর্য হাসে- এ কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। বৈরী পরিস্থিতির মুকাবিলার জন্য তৈরী থাকতে হবে।

আমাদের করণীয়
১) কেবল মাত্র সরকার বা রাষ্ট্র একার পক্ষে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ মুকাবিলা করা সম্ভব নয়। দেশের সর্বস্তরের মানুষদের এ ব্যাপারে সংগঠিত করতে হবে। সামাজিক শক্তিগুলোকে একতাবদ্ধ করতে হবে। জনসম্পৃক্ততা যে কোন উদ্যোগের সবচে বড় শক্তি।

২) সমাজে ধর্মীয় আদর্শ প্রতিষ্ঠার নামে যাতে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হত্যাকান্ড, বোমাবাজি বা আতংক ছড়াতে না পারে সে ব্যাপারে আমাদের সজাগ থাকতে হবে। আমাদের সন্তান-সন্ততি কোন উগ্রবাদী সংগঠনের সাথে জড়িত হচ্ছে কিনা সদা সতর্ক থাকতে হবে এবং জড়িত হয়ে পড়লে বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনতে হবে।

৩) প্রতিনিধিত্বশীল বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সংকট মুকাবেলায় রাজনৈতিক সংলাপের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ভারতসহ বহু দেশে এ সংস্কৃতি চালু আছে।

৪) বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানের সহযোগিতায় শিক্ষার্থীদের প্রতি গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে।

৫) ওলামা-মাশায়েখ সামাজিক শক্তির প্রতিনিধি। পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সর্বশ্রেণীর ওলামা ও মাশায়েখদের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এক প্লাট ফরমে জমায়েত হয়ে মিথ্যাচার, সাম্প্রদায়িকতা ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ঐক্যের বিকল্প নেই এসত্য যত তাড়াতাড়ি অনুধাবন করা যায় ততই মঙ্গল।

৬) সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, আলোচনা সভার আয়োজন ও ক্ষুদ্র-বৃহৎ পুস্তিকা ও জার্ণাল প্রকাশের মাধ্যমে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান তুলে ধরতে পারলে এবং আন্তঃধর্মীয় সংলাপের (Inter faith dialogue) ব্যবস্থা করা গেলে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।
৫) সন্ত্রাস ও জিহাদ যে এক নয় এ কথা আলিম, ইমাম ও খতিবগণ ওয়ায ও মসজিদের বয়ানে জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেন। জিহাদের পবিত্র চেতনাকে সন্ত্রাসের উম্মাদনার সাথে গুলিয়ে ফেলা হবে মারাত্মক ভ্রান্তি। ইসলামে উগ্রপন্থা নেই, মধ্যমপন্থা অনুমোদিত। জিহাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি বিধান। জিহাদের সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি আছে। জিহাদের নামে আল্লাহ তায়ালা নারাজ, অসন্তুষ্ট ও ক্রোধান্বিত হন এমন কোন কর্মকন্ড শরীয়ত অনুমোদন করে না।

৬) ইসলামের শান্তি, সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা ও মানবাধিকারের মৌলিক বাণী মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে ব্যাপকভাবে। মুসলিম দেশে অমুসলিমকে হত্যা করা, আতংকগ্রস্থ করা, সম্পদ বিনষ্ট করা, উপসনালয়ের ক্ষতি করা মহাপাপ। তাঁদের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ন্যায় বিচার পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত। এসব অধিকার যারা কেড়ে নিতে চায় তারা জঙ্গি-সন্ত্রাসী। এ কথাগুলো ব্যাখ্যাসহকারে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে সন্ত্রাস, নৈরাজ্যবাদ ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয় এমন কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ওমরগণি এম.ই.এস কলেজ, চট্টগ্রাম।

মতামত