টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

সাতকানিয়ায় শঙ্খের ভাঙ্গনে দিশেহারা মানুষ

বসতঘর মসজিদ মাদ্রাসা মাজার বরস্থান ফসলী জমি বিলীন

শহীদ ইসলাম বাবর
বিশেষ প্রতিনিধি

saচট্টগ্রাম, ২৪ জুলাই (সিটিজি টাইমস):: দক্ষিন চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় করালগ্রাসী শঙ্খনদীর ভাঙ্গনে বিলীন হচ্ছে বসত ঘর, মসজিদ,মাদ্রাসা, ফসলী জমি ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। নদীভাঙ্গনের ব্যাপকতায় বসত ঘর, ফসলী জমি হারিয়ে নিঃশ্ব হচ্ছে মানুষ। ভাঙ্গনের ধারা অব্যাহত থাকলে সাতকানিয়ার মানচিত্র থেকে হারিয়েছে যাবে চরতী ও আমিলাইশ ইউনিয়ন। অতিতে ভাঙ্গনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জনপ্রতনিধিরা ঘোষনা দিয়ে আসলেও ভাঙ্গনরোধে নেওয়া হয়নি কার্যকর পদক্ষেপ। ফলে ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে বাড়ছে ক্ষোভ আর হতাশা। ভাঙ্গন কবলিত মানুষদের মাঝে মধ্যে চাল ও নগদ টাকা বিতরণ করলেও তা ছিল চাহিদার তুলনায় খুবই নগন্য। সরেজমিন পরির্দশন,জনপ্রতিনিধি, ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সাথে আলাপ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

জানা যায়, পাহাড়ের পাদদেশ থেকে সৃষ্ট শঙ্খনদীটি বান্দরবান পার্বত্য জেলা ডিঙ্গিয়ে সাতকানিয়ার পুরানগড়, বাজালিয়া, কালিয়াইশ, নলুয়া,খাগরিয়া, আমিলাইশ ও চরতী দিয়ে আনোয়ারা হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়।

এর মধ্যে পাহাড়ি এলাকা হওয়াতে পুরানগড়ে ভাঙ্গনের প্রবনতা কম হলেও বাজালিয়া, কালিয়াইশ,নলুয়া, খাগরিয়া, আমিলাইশ ও চরতী ইউনিয়নে ভাঙ্গনের প্রবনতা বেশী।

সাম্প্রতিক সময়ে শঙ্খনদীতে সৃষ্ট ভাঙ্গনে চরতীর ৩শ, আমিলাইশের ২শ খাগরিয়ার ৫০, কালিয়াইশের ৫০,বাজালিয়ার ৫০ পরিবার গৃহহারা হয়েছে। এর বাইরে হদীগর্ভে হারিয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী মসজিদ,মাদ্রাসা, মাজার, কবর স্থান ওফসলী জমি। এর মধ্যে চরতী ও আমিলাইশ ইউনিয়নে নদী ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য মোট ১২ মে.টন খাদ্যশষ্যে ও নগদ টাকা বরাদ্ধ দেওয়া হলেও তা চাহিদার তুলনায় খুবই নগন্য। তবে সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ উল্যাহ চাহিদার তুলনায় বরাদ্ধের পরিমাণ কম স্বিকার করে আরো বরাদ্ধ চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পত্র প্রেরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন।

সরেজমিন পরির্দশনকালে দেখা যায়, চরতী ইউনিয়নের দ্বীপ চরতী এলাকায় শঙ্খনদীর ভাঙ্গনের কবলে পড়া লোকজন তাদের ঘরের মালামাল অন্যত্রে সরিয়ে নিচ্ছে। ভেঙ্গে ফেলছে পাকা দালান। আর কেহ দ্বীপ চরতী সড়কের উত্তর পাড়ে অস্থায়ী ভাবে থাকার জন্য ত্রিপল দিয়ে ঘর তৈরী করছে।

সাতকানিয়া উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও ঐ এলাকার বাসিন্দা রমিজ উদ্দিন আহমদ জানান, বেশ কয়েক বচল থেকে শুরু হওয়া ভাঙ্গনে উক্ত গ্রামের অন্তত ৩টি কবরস্থান, ১টি ঐতহ্যবাহি মসজিদ, ১টি দাখিল মাদ্রাসা, ১টি মাজার ও শত শত একর ফসলী জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙ্গনরোধে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে বার বার চেষ্টা তদবির করেও কার্যকর কোন সফলতা পায়নি।

একই এলাকার তরুন আইনজীবি দেলোয়ার হোসেন জানান, অন্তত ৭০ লক্ষ টাকা খরচ করে নির্মিত করা হয়েছিল দ্বীপ চরতী দক্ষিন পাড়া শাহি জামে মসজিদ, আর স্থানীয়দের সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দ্বীপ চরতী দারুল ইসলাম দাখিল মাদ্রাসা ও ছিদ্দিকিয়া (র.) এতিমখানা। গত কয়েক বছর থেকে শুরু হওয়া ভাঙ্গনের ফলে এসব স্থাপনার সবটুকুই নদীতে হারিয়েছে গেছে। মসজিদ ও মাদ্রাসার জন্য এ বৎসর সরকারী কোন সহায়তা না পেলেও উক্ত এলাকার হতদরিদ্র জনগোষ্টি নিজেদের প্রচেষ্টায় দারুল ইসলাম দাখির মাদ্রাসার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে অন্যত্রে অস্থায়ী ভাবে কয়েকটি ক্লাশ রুম তৈরী করেছে। ঐ এলাকার আবু শামা, নুরুচ্ছফা, আব্দু শুক্কুর, ছকিনা খাতুন,মনজিরা বেগম,মোহাম্মদ ইউনুছ, মো. সৈয়দ, মোহাম্মদ আলী, মো. নোমান, মোহাম্মদ সোলেমান,মনোয়ারা বেগম,জাফর আহমদ, আবু বকর,মফিজুর রহমান, সমসের আলম, মোতাহেরা বেগম, কবির আহমদ, মৃত জাগির হোসেন,মোজাম্মেদল হক, মাঈনুদ্দিন,মৃত ইউফুপ আলী,মোহাম্মদ হোসেন, মোহাম্মদ ইলিয়াছ, ফয়েজ আহমদ,মুর্শিদ আহমদ, হাছন বানু,জুহুরা বেগম ও নুরুল আলম তাদের বসত ঘর হারিয়ে অনেকটা নি:শ্ব অবস্থতায় দিনাতিপাত করছে।

আমিলাইশ ইউনিয়নের উত্তরাংশেও শঙ্খনদীতে বিলীন হচ্ছে বির্স্তীণ এলাকা। ইতিমধ্যে নদীবক্ষে বিলীন হয়ে গেছে শতাধিক বসত ঘর ও গুরুত্বর্পূণ সড়ক। অব্যাহত ভাঙ্গনের ফলে ২ ও ৩ নং ওয়ার্ড় এলাকা হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। স্থানীয় আহমদ ছফা জানান, সৈয়দ আহমদ, মোহাম্মদ আমিন, মোহাম্মদ আলম, মোহাম্মদ আইয়ুব, বদিউল আলম, মোহাম্মদ ইউনুছ, মোহাম্মদ ইউছুপ, সফিক আহম মফিজুর রহমান,ফরিদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম, ছিদ্দিক আহমদ, আব্দুল মজিদ, নুর আলম, আব্দুল করিম, নুরাইন বেগম, নুর হোসেন, আবু হানিফ ও আবুল কালামসহ আরো অন্তত ২০ জনের বসত ঘর নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙ্গনের বিষয়ে আমিলাইশ ইউপি চেয়ারম্যান সারওয়ার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ভাঙ্গনরোধ কল্পে প্রকল্প গ্রহনের জন্য আমি সব সময়ই চেষ্টা চালিয়ে থাকি। ভাঙ্গনরোধকল্পে বড় আকারের প্রকল্প গ্রহনের কথা আমাকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে কবে নাগাদ ভাঙ্গনরোধে কার্যকরী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তিনি। কালিয়াইশ ই্উনিয়নে ভাঙ্গনের বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সমাজ সেবক ডা. মোহাম্মদ আব্দুল জলিল জানান,মাইঙ্গা পাড়া ও উত্তর কালিয়াইশ এলাকায় ভাঙ্গনের তীব্রতা বেড়েছে। এসব এলাকায় ভাঙ্গনরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ উল্যাহ ভাঙ্গনের তীব্রতার কথা স্বীকার করে বলেন, ভাঙ্গন কবলিত এলাকা আমি পরির্দশন করেছি। ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা তৈরীর কাজ চলছে। ইতিমধ্যে চরতী ও আমিলাইশ ইউনিয়নে ভাঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে চাল ও নগদ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ প্রতিষ্ঠান সমূহের ব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত ভাবে জানানো হয়েছে। ভাঙ্গনের বিষয়ে জানতে চাইলে সাতকানিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, গত ২০ জুলাই চট্টগ্রাম জেলা সমন্বয় সভায় আমি সাতকানিয়ার নদী ভাঙ্গনের বিষয়ে চিত্র তুলে ধরে জরুরী ভিত্তিতে তা রোধকল্পে ব্যবস্থা গ্রহনের দাবী জানিয়েছি। উক্ত সভায় পানি উন্নয়ন বোর্ড়ে ভাঙ্গনরোধ কল্পে প্রায় ৩শ ৯৫ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করলেও কবে নাগাদ কাজ শুরু হবে তা জানাতে পারেনি। নদী ভাঙ্গনের বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ড়ের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন, দ্বীপ চরতী, চরতী, আমিলাইশ, নলুয়া এলাকায় ভাঙ্গনের তীব্রতা বেশী। শঙ্খ, ডলু, টঙ্কাবর্তি, কাটাখালী, হাঙ্গরসহ আরো কয়েকটি নদী ভাঙ্গন এলাকা আমরা পরির্দশন করে একটি প্রকল্প তৈরী করে মন্ত্রনালয়ে পাঠিয়েছি। এ প্রকল্পের আওতায় নদী ভাঙ্গন রোধের জন্য ৩শ ৯৫ কোটি টাকা ব্যায় ধরা হয়েছে। এ প্রকল্প পাশ হলে শীঘ্রই নদী ভাঙ্গন এলাকায় ভাঙ্গনরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মতামত