টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মিরসরাইয়ে ধ্বংস হচ্ছে মৎস্য সম্পদ : নির্বিকার প্রশাসন

মিরসরাইয়ের বঙ্গপোসাগর মোহনা ও ফেনী-মুহুরী নদীতে অবাধে চলছে গলদা চিংড়ীর পোনা আহরণ

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি 

Mirsarai-Fish-Nidon-Photo-1চট্টগ্রাম, ২১ জুলাই (সিটিজি টাইমস)::  মিরসরাইয়ের বঙ্গোপসাগরের মোহনা ও ফেনী ও মুহুরী নদীর মোহনা তথা মুহুরী প্রকল্প পর্যন্ত শত কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন নদী ও সংযোগ খাল থেকে অবৈধভাবে সরকারি নিষেধ অমান্য করে প্রায় শত কোটি টাকার গলদা চিংড়ির রেণু পোনা শিকার করছে অসাধু জেলে এবং ব্যবসায়ীরা।

কামাল ব্যাপারী, পোনা সংগ্রহকারী। খুলনা থেকে মিরসরাই এসেছেন ৭-৮ বছর পূর্বে। তিনি বঙ্গোপসাগর হতে ভেসে আসা জোয়ারের পানি থেকে গলদা চিংড়ীর রেনু সংগ্রহ করে খুলনা নিয়ে বিক্রি করেন। আগে নিজে জোয়ারের পানিতে নেমে পোনা ধরতেন। এখন তার অধীনে কাজ করেন ৮-১০ জন যুবক। যাদের প্রায় সবার বাড়ী খুলনা বিভাগে। কমিশনের ভিত্তিতে তারা প্রতিদিন চিংড়ীর রেনু পোনা সংগ্রহ করেন। এভাবে কামাল ব্যাপারীর মতো যশোর, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা থেকে অর্ধশত চিংড়ীর রেনু ব্যবসায়ী মুহুরী প্রজেক্টের পশ্চিম তীরে গড়েছেন অস্থায়ী বসতি। যারা স্থানীয়দের টাকা দিয়ে নদী থেকে গলদা চিংড়ীর রেনু পোনা সংগ্রহ করে ব্যবসা করতেছেন। চিংড়ীর রেনু পোনা ধরতে গিয়ে নদীতে মাছের বংশ করতেছেন নিরবংশ।

জানা গেছে, দিনের বেলায় বিকাল ৩টা ও রাতে আড়াই থেকে ৩টার মধ্যে বঙ্গোপসাগর থেকে জোয়ার আসে মিরসরাইয়ের উপকূল হয়ে ফেনী নদীর মুহুরী প্রজেক্ট এলাকায়। এসময় জোয়ারের পানিতে বঙ্গোপসাগর থেকে ভেসে আসে চিংড়ী, কোরাল, ইলিশ সহ নানা প্রজাতির মাছের পোনা। জোয়ার আসার পর জেলেরা মশারি দিয়ে তৈরী বিশেষ ধরণের জাল (স্থানীয় ভাষায় ঠেলা জাল), নেট জাল, ছাকনী ও চাদর দিয়ে পানি ছেঁকে এ পোনা শিকার করে স্রোতের মধ্যে মাছের রেনু ধরে। জোয়ার যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত তারা রেনু ধরে পাতিলে ভরে। ভাটায় জোয়ারের পানি নেমে গেলে পরবর্তীতে তারা পাতিল থেকে মাছের রেনু প্লেটে নিয়ে গলদা চিংড়ীর রেনু বাচাই করে। এসময় তারা গলদা চিংড়ী ও বাগদা চিংড়ীর রেনু নিয়ে বাকী রেনু এবং পানি নদীর পাড়ে ফেলে দেয়। এতে করে মারা যাচ্ছে হাজারো প্রজাতির মাছের রেনু। প্রতি জোয়ারে একজন জেলে ৪’শ থেকে ৫’শ পর্যন্ত গলদা চিংড়ীর রেনু ধরতে পারেন। জেলেরা প্রতি হাজার গলদা চিংড়ীর রেনু পোনা পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা করে। এই পোনা সংগ্রহ করার জন্য দেশের উত্তরাঞ্চলের ব্যবসায়ীরাও এখানে আসেন। পাইকাররা ড্রাম ও বড় পাতিল পোনা ভর্তি করে খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটেসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে নিয়ে আড়ৎদারের কাছে প্রতিটি পোনা বিক্রি করে ৫ থেকে ৬ টাকা ধরে। পোনা সংগ্রহকারীদের বেশীরভাগই বংশপরাক্রমায় জেলে নয়। এরা গলদা চিংড়ীর রেনু সংগ্রহের জন্য পাইকারদের বেতনভুক্ত কর্মচারী। পাইকাররা রেনু সংগ্রহের জন্য মুহুরী প্রজেক্টের বাঁধের পশ্চিম পার্শ্বে ঘর তৈরী করেন তাদের জন্য। যাতে জোয়ার আসার সাথে সাথে পোনা সংগ্রহ করা যায়। পোনা ধরার মৌসুম শেষ হয়ে গেলে তারা আবার নিজ আবাসস্থরে চলে যান।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রশাসন কখনো নামেমাত্র অভিযান চালালেও কার্যত সবই যেন শুভংকরের ফাঁকি বলে সচেতন মহলের অভিযোগ। নিষিদ্ধ হলেও বছরের চৈত্র মাস থেকে শ্রাবন মাস পর্যন্ত মুহুরী ও ফেনী পাড় সহ মিরসরাই উপজেলার উপকূল জুড়ে শত শত জেলে চিংড়ি পোনা সংগ্রহ করে চলেছে। ফলে এসময় চিংড়ি রেণুর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির পোনাও নষ্ট হচ্ছে। জেলেদের সংগ্রহ করা পোনা কেনার জন্য যশোর, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা থেকে এই মৌসুমের ব্যবসায়ীরা ও এখানকার পোনা আহরনকারীদের সাথে লেনদেন এর মাধ্যমে আয়ত্ব করে পোনা আহরন করে নেয়। কিন্তু এতে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে গলদা ও ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা। মহাজনের দাদনের জালে বন্দী জেলেরা সব বাধা-নিষেধ অমান্য করে রেণু আহরণ করছে। ফলে দিন দিন মিরসরাইয়ের উপকূলীয় নদীর মোহনা এলাকায় ইলিশসহ বিভিন্ন মাছের আকাল দেখা দিচ্ছে। মৎস্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রসাশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নাকের ডগায় অবাধে চিংড়ির রেণু শিকার অব্যাহত থাকলেও কোনো অভিযান না থাকায় প্রকাশ্যে বিক্রি ও আহরণ করছে জেলেরা এ পোনা। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রতিবছর উপজেলার সাহেরখালী, মঘাদিয়া, বগাচতর, ইছাখালীর উপকূলীয় এলাকার চৈত্র মাস থেকে শ্রাবন মাস পর্যন্ত চলে মৎস্য চিংড়ি রেণু আহরণের উৎসব চলে। প্রতি মৌসুমে চিংড়ির পোনার উপর এখানে লক্ষ লক্ষ টাকার লেনদেন হয় নিয়মিত।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, নদী থেকে চিংড়ির রেণু পোনা ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফেনী নদীতে অবস্থিত মুহুরী প্রজেক্ট মিরসরাই উপজেলা এবং সোনাগাজী উপজেলার মধ্যখানে অবস্থিত হওয়ায় আমারা চাইলেও যেকোন সময় অভিযান চালাতে পারি না। অভিযান চালানের আগে সোনাগাজী উপজেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করতে হয়। এতে করে দেখা যায় আমরা যখন অভিযানের জন্য প্রস্তুতি নিই তখন হয়তো সোনাগাজীর প্রশাসন সময় দিতে পারে না। দুই উপজেলা সমন্বয় করে আমরা শীঘ্রই মুহুরী প্রজেক্ট এলাকায় অভিযান পরিচালনা করবেন বলে জানান তিনি।

মতামত