টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

“নিভে গেল আরেকটি আলোর প্রদীপ”

ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন

mচট্টগ্রাম, ২৯ জুন (সিটিজি টাইমস)::  ২৫ জুন’১৬ ইফতারের পূর্ব মুহূর্তে বজ্রপাতের মত চমকে দেয়া খবর এল বাংলাদেশের তারকা আলিম ও বরেণ্য বুদ্ধিজীবি হযরত মাওলানা মুহিউদ্দিন খান (১৯৩৫-২০১৬) আর নেই। নিভে গেল আরেকটি আলোর প্রদীপ, থেমে গেল জীবনের স্পন্দন। তিনি ছিলেন আমাদের অভিভাবক, জাতিসত্ত্বা নির্মাণের অন্যতম কাণ্ডারি, বাংলাদেশে সীরাত সাহিত্যের পথিকৃৎ ও ইসলামী রেঁনেসার পুরোধা ব্যক্তিত্ব। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের অধিকারী এ মনীষীর জীবনসাধনার বহুমাত্রিকতা আমাদের জন্য মডেল ও পাথেয়। ইসলামের সোনালী আদর্শে সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তোলার আন্দোলনে তিনি ছিলেন উৎসর্গিতপ্রাণ ও সাহসী কর্মি। ইসলাম, কুরআন ও নবীজীবন (সা.) ও ধর্মীয় শিক্ষার উপর যখনই আঘাত এসেছে তখনি তিনি প্রতিবাদ-প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন লড়াকু সৈনিকের ন্যায়। বাতিলের বিরুদ্ধে হকের ময়দানে তাঁর ভূমিকা ছিল আপোষহীন। ৮১ বছর বয়সে মৃত্যুকে পরিণত বলতে হবে কিন্তু এ মৃত্যুর ক্ষত শুকাতে সময় লাগবে। এমন এক সময়ে তিনি চলে গেলেন যখন তাঁর প্রয়োজন ছিল সবচে বেশী। একে একে ভেঙ্গে যাচ্ছে আলোর মিনার। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে আমরা যেসব রাহবারকে হারিয়েছি তাঁদের মধ্যে শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.), আল্লামা মুফতি ফজলুল হক আমিনী (রহ.) ও আল্লামা মুফতি আবদুর রহমান (রহ.) অন্যতম। তাঁদের কাফেলায় যুক্ত হলেন হযরত মাওলানা মুহিউদ্দিন খান (রহ.)।

আজ থেকে ৬৫ বছর আগে ময়মনসিংহের গফরগাঁও থেকে তিনি ঢাকা আলিয়ায় হাদীস ও ফেকাহ শাস্ত্রে উচ্চতর শিক্ষা (কামিল) অর্জনের জন্য এসেছিলেন। অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে তিনি ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। সাহিত্য রচনা করেছেন, জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, দিক নির্দেশনা দিয়েছেন ও আশার বাণী শুনিয়েছেন। অবশেষে ঢাকাকে বিদায় জানিয়ে ২৬ জুন গ্রামের ছেলে গ্রামে ফিরে গেলেন চিরদিনের জন্য। গফরগাঁও উপজেলার আনসারনগরে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর শেষ শয্যা রচিত হল। প্রার্থনা করি আল্লাহ তায়ালা যেন তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চতর মাকাম নসীব করেন, আমিন।

হযরত মাওলানা মুহিউদ্দিন খান (রহ.) আমাদের পিতৃতুল্য ও শ্রদ্ধাভাজন অভিভাবক। তিনি যখন ১৯৫৫-৫৬ সালে ঢাকা আলিয়ায় কামিল করছেন তখন আমার জন্ম। আমৃত্যু তাঁর সাথে আমার গভীর, আন্তরিক ও গুরু-শীষ্য সম্পর্কে ছেদ পড়েনি। তিনি আমাকে পছন্দ করতেন, স্নেহ করতেন, মুহাব্বত করতেন। ঢাকার বিভিন্ন জাতীয় প্রোগ্রামে আমাকে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করতেন কিন্তু অনেক দূরে চট্টগ্রাম শহরে একটি কলেজে শিক্ষকতার কাজে যুক্ত থাকায় সব প্রোগ্রামে শরিক হতে ঢাকা যেতে পারিনি। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে বেশ ক’বছর আগে তাঁরই নেতৃত্বে আমি আলিম-ওলামাদের একটি ডেলিগশনের সদস্য হিসেবে সচিবালয়ে মাননীয় শিক্ষমন্ত্রীর সাথে জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেয়ার সুযোগ লাভ করি। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত সীরাত স্মারকে আমার বেশ ক’টি লেখাও প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর আগ্রহ ছিল আমার লেখা যেন স্মারকে থাকে।

২০১২ সালে এক বিকেলে তাঁর সাথে মদীনা ভবনে সাক্ষাত করি। আমি তাঁকে বলি খতিবে আযম হযরত মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ (রহ.)-এর জীবন ও কর্মসাধনার উপর একটি প্রামাণিক স্মারক প্রকাশের কাজ হাতে নিয়েছি; আপনার লেখা চাই। ইতোপুর্বে লেখা চেয়ে আমি চিঠি লিখেছিলাম কিন্তু অত্যধিক ব্যস্ততার কারণে তিনি কলম ধরতে পারেননি। পুরনো পল্টনের মদীনা ভবনে আসলে তাঁকে সাক্ষাৎপ্রার্থীরা ঘিরে ধরেন নানা কাজে। আমি আবদার করে তাঁকে বললাম আগামী কাল বিকেলে আসবো এক ঘন্টার জন্য কক্ষ বন্ধ করে রাখবো, আপনি বলবেন আমি লিখবো। বাইরে দারোয়ান দাঁড়িয়ে থাকবে। প্রোগাম অনুযায়ী আমি যথা সময়ে অফিসে পৌঁছে দরজা বন্ধ করে দিই। তিনি বলছেন আমি লিখছি। এক সময় লেখা যখন শেষ হয়ে গেল আমি তাঁকে বললাম লেখাটি সম্পাদনা করে আপনাকে কখন দেখাবো ? তিনি যে উত্তর দিলেন তা অবাক করার মত। ‘দেখাতে হবে না। আপনার লেখাই আমার লেখা। আপনার লেখার প্রতি আমার আস্থা আছে। জাতীয় দৈনিকে বিশেষত ‘ইনকিলাব’ ও ‘আমার দেশ’-এ আপনার যেসব লেখা প্রকাশিত হয় আমি অত্যন্ত আগ্রহভরে পড়ি। আমার পরে তো আপনারাই।’ হযরত মাওলানা মুহিউদ্দিন খান সাহেবের সে দিনের উক্তি চিরকাল আমার মনে থাকবে। খতিবে আযম হযরত মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ (রহ.)-এর স্মৃতি উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি তাঁর লেখায় যে মন্তব্য করেন তা পাঠকদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করছি, যা এখনো প্রাসঙ্গিক:

“আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে আল্লামা শিবলী নুমানী বিরচিত ‘আল-ফারুক’ যখন আমি উর্দূ হতে বাংলায় তরজমা করে ছাপার অক্ষরে বের করি, তা দেখে তিনি (খতিবে আযম মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ রহ.) অত্যন্ত খুশী হন। আমাকে খবর দিয়ে এনে মিষ্টিমূখ করান। আসার সময় আমার পকেটে ২০টাকা গুঁজে দিয়ে বলেন, অতিরিক্ত টাকা থাকলে এক হাজার দিতাম। দু‘আ করি, কাজ করে যাও। তখনকার সময় আলিম-উলামাদের মধ্যে উর্দূ চর্চার প্রচলন ছিল বেশী। করাচী ও লাহোর হতে যেসব উর্দূ পত্রিকা আসতো আমরা তাই আগ্রহভরে পড়তাম। বাংলা ভাষায় উন্নত মাসিক পত্রিকা ছিল একেবারে হাতে গোনা। আমি যখন মাসিক ‘মদীনা’ বের করি। তিনি আমার এ চ্যালেঞ্জিং উদ্যোগ দেখে আমার জন্য বিশেষভাবে দু‘আ করেন; আজো আমি তাঁর দু‘আর বরকত অনুভব করি।

এমন একসময় ছিল যখন মাওলানা আকরাম খাঁ (রহ.), মাওলানা নূর আহমদ আযমী (রহ.), মাওলানা শামসুল হক ফরিদপূরী (রহ.), মুফতী দ্বীন মুহাম্মদ (রহ.), আল্লামা রাগিব হাসান (রহ.), মুফতী আমীমুল এহসান (রহ.), মাওলানা আবদুল্লাহ আল-কাফী আল-কুরায়শী (রহ.), ও মাওলানা আতাহার আলী (রহ.), মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ (রহ.), খতীব মাওলানা ওবায়দুল হক (রহ.)-এর মত প্রবাদপ্রতীম ব্যক্তিত্বের স্নেহ ছায়ায় আমরা ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করেছি। আজ এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তাঁদের তুল্য কোন মানুষ চোখে পড়ে না; একটু পরামর্শ নেব, একটু আশ্রয় নেব, দিক নির্দেশনা খুঁজবো, সে মানুষ নেই। বর্তমানে আত্মার খোরাকের দারুন অনটন। এমন আলিমের অভাব রয়েছে যার সাথে আলোচনা করে যে কোন জিজ্ঞাসার শান্তিপূর্ণ ও যুক্তিনির্ভর জবাব পাওয়া যায়। পরিশেষে বলতে চাই আমরা আসলে সৌভাগ্যবান ছিলাম কিন্তু সৌভাগ্যকে মূল্য দেবার বোধশক্তি আমাদের হয়নি। বর্তমানে ইসলামী আন্দোলনের সতীর্থদের মধ্যে পারষ্পরিক মুহাব্বত ও সহমর্মিতার অভাব আমাদের পীড়িত করে।”

হযরত মাওলানা মুহিউদ্দিন খান (রহ.)-এর মৃত্যুর পর একই কথা আমাদের বেলায়ও খাটে। তাঁর মত বটবৃক্ষসম ব্যক্তিত্ব আর চোখে পড়ে না, যার ছায়ায় একটু আশ্রয় নেব। জ্ঞান গবেষণার পাশাপাশি তিনি স্বেচ্ছাসেবা ও মানবকল্যাণধর্মী অনেক কাজ করে গেছেন। ইয়াতিম ও হতদরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের লেখা পড়ার ব্যয়ভার ও দুস্থদের বাস্তুভিটা তৈরীর দায়িত্ব তিনি বহন করতেন। ‘তাওহিদ মিশন’ নামক সংস্থার মাধ্যমে বান্দরবান জেলায় প্রায় তিন শতাধিক দরিদ্র নও মুসলিমকে তিনি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন।

হযরত মাওলানা মুহিউদ্দিন খান (রহ.) বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে স্থায়ী কাজ করে গেছেন। প্রায় শতাধিক গ্রন্থ তিনি উর্দূ থেকে বাংলায় ভাষান্তরিত করেন। এর মধ্যে তাফসির সীরাতে রাসূল ও ইতিহাসনির্ভর গ্রন্থ সবচেয়ে বেশী। আল্লামা মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) বিরচিত ৮ খণ্ডের কালজয়ী তাফসির গ্রন্থ ‘মাআরিফুল কুরআন’ তিনি উর্দূ থেকে বাংলায় ভাষান্তর করেন। ইসলামিক ফাউণ্ডেশন থেকে এটি প্রকাশিত হয়। ১৪১৩ হিজরীতে মদীনাস্থ বাদশাহ ফাহদ কুরআন মুদ্রণ প্রকল্পের উদ্যোগে ‘মাআরিফুল কুরআন’ সংক্ষিপ্তাকারে ১খণ্ডে বাংলায় ছেপে সারা দুনিয়ায় বাংলাভাষীর মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। ইমাম গাজালীর ‘ইহয়াউ উলুমিদ্দিন’ ও মাওলানা আবুল কালাম আযাদের ‘ইনসানিয়ত মওত কে দরওয়াযে পর’ ( জীবন সায়াহ্নে মানবতার রূপ) গ্রন্থের স্বার্থক অনুবাদক মাওলানা মুহিউদ্দিন খান (রহ.)। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মদীনা পাবলিকেশন্স ১৯৫৭ সাল হতে এ পর্যন্ত কুরআন, হাদীস, সীরাতে রাসূল, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অভিধান বিষয়ক ৬০০ মানসম্মত গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। এসব গ্রন্থ বাংলাদেশে এবং বিদেশের বাজারে ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। মাসিক মদীনা মাওলানা মুহিউদ্দিন খান (রহ.)-এর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি। এক সময় এর সার্কুলেশন এক লাখে পৌঁছে। এ পত্রিকাটির জন্য তিনি অনেক মেহনত করেন। এমনকি মাথায় নিউজপ্রিন্ট বহন করে প্রেসে নিজে পৌঁছে দিতেন। তাঁর সম্পাদিত ‘মাসিক মদীনা’র প্রশ্নোত্তর বিভাগটি ছিল পাঠকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। পাঠকদের আগ্রহে প্রশ্নোত্তর সঙ্কলন ‘সমকালীন জিজ্ঞাসার জবাব’ ২০ খণ্ডে মদীনা পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে। সমকালীন ও আধুনিক অনেক মাসআলা মাসায়েলের দালিলিক জবাব রয়েছে এতে। এক কথায় তিনি বিজ্ঞ অনুবাদক, প্রাজ্ঞ সীরাত গবেষক, স্বার্থক লেখক, দূরদর্শী ইসলামী চিন্তাবিদ, তুখোড় বক্তা ও দক্ষ সংগঠক।

আরেকটি আশ্চর্য বিষয় হল তিনি কওমি মাদরাসায় না পড়েও দেওবন্দী চিন্তাধারা অনুসারী ছিলেন। সারাটি জীবন দেওবন্দী চিন্তা-চেতনাকে লালন করেন। দেওবন্দী ওলামা মাশায়েখদের লিখিত গ্রন্থ বাংলায় তরজমা করেন। দেওবন্দী ধারার সংগঠন জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দের প্রাক্তন মুহতামিম আল্লামা কারী তাইয়েব (রহ.) ‘মাসলাকে ওলামায়ে দেওবন্দ’ গ্রন্থে লিখেন ‘দরসে নিজামী পড়া ও পড়ানোর নাম দেওবন্দিয়ত নয়; এটি একটি বোধ ও চিন্তাধারার নাম যা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকীদার উপর প্রতিষ্ঠিত’। মাওলানা মুহিউদ্দিন খান (রহ.) তার উজ্জ্বল নিদর্শন। গোটা জীবন কওমি মাদরাসায় পড়েও দেওবন্দী হতে পারেননি এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়।

হযরত মাওলানা মুহিউদ্দিন খান (রহ.)-এর বিদায় আমাদের জন্য বিরাট আঘাত ও প্রচণ্ড শুণ্যতা। তাঁর অভাব পূরণ হতে বহুদিন সময় লাগবে। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর কালজয়ী সাহিত্য ভাণ্ডারের মধ্যে। বাংলা সাহিত্য অঙ্গন তিনি সমৃদ্ধ করে গেলেন। তিনি যোগ্য সন্তান রেখে গেছেন তাঁর মিশন চালু রাখার জন্য। মাসিক মদীনা ও মদীনা পাবলিকেশন্স আগামী দিনগুলোতে তাঁর স্মৃতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেবে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত