টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মিতু হত্যা তদন্তে যেখানে হোঁচট খাচ্ছে পুলিশ!

বিশেষ সংবাদদাতা
সিটিজি টাইমস

চট্টগ্রাম, ১৫ জুন (সিটিজি টাইমস): যেকোনো ঘটনারই কোনো না কোনো চিহ্ন বা আলামত থেকে যায়, যার সূত্র ধরে অপরাধীর কাছে পৌঁছে যায় গোয়েন্দারা। কিন্তু খোদ পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যকান্ডের বেলায় বিষয়টি যেন ব্যতিক্রম। পুলিশ কোনোমতেই পৌঁছতে পারছে না খুনিদের কাছে।

বরং খুনিদের রেখে যাওয়া চিহ্ন ও আলামত ধরে এগোতে গিয়ে যেন হোঁচট খাচ্ছে পুলিশ। বিশেষ করে সন্দেহভাজনদের আটকের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা বিভাগীয় শাস্তির মুখে পড়তে পারেন বলে আভাস পাওয়া গেছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, মিতু হত্যা মামলায় তদন্ত ও রহস্য উদঘাটনে দীর্ঘসূত্রতায় চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক। শুধু তাই নয়, আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে মিতু হত্যা মামলার কোনো সূত্র না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে এর কৈফিয়ত তলব ও শোকজ করার কথাও বলেন তিনি।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাস ভট্টাচার্য এ প্রসঙ্গে বলেন, মিতু হত্যকান্ড মঙ্গলবার ১০ দিন অতিবাহিত হলেও খুনিদের চিহ্নিত করতে পারিনি আমরা। যদিও আলামত ও ভিডিও ফুটেজে দেখা যুবক শাহ জামান ওরফে রবিন নামে এক খুনিকে আটক করে পুলিশ।”

এর আগে মনির হোসেন নামের আটক যুবকও ভিডিও ফুটেজে দেখা যাওয়া যুবক বলে স্বীকার করে নিজেই। এর আগে চট্টগ্রামের হাটহাজারি উপজেলার ফরহাদাবাদ এলাকা থেকে শিবির কর্মী ও মুসাবিয়া মাজারের খাদেম আবু নছর গুন্নু, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন থেকে আটক ইব্রাহিম এবং হত্যকান্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের প্রকৃত মালিক আবদুর রহিম ও ঘটনার সময় সিসিটিভির ফুটেজে দেখা কালো মাইক্রোবাস ও তার চালক জানে আলমকেও আটক করা হয়েছিল।

তাদের জিজ্ঞাসাবাদে মিতু হত্যকান্ড ও খুনিদের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য মেলেনি। এ ক্ষেত্রে মনির ও রবিন হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটনে সবেচেয়ে মোক্ষম মোটিভ মনে করছে পুলিশ। তবে আবু নছর গুন্নুসহ অন্যদের আটকে পুলিশ হোঁচট খেয়েছে।

দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, মনির ও রবিন সাত দিনের রিমান্ডে রয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্য থেকে এখনো পর্যন্ত পুলিশ খুনিদের চিহ্নিত করতে পারেনি। আলামত ও আটককারীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ধরে এগিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ এক জায়গায় গিয়ে থমকে যাচ্ছে। খুনিদের হত্যকান্ড পরিকল্পনা এত নিখুঁত যে, তা পুলিশের সময় লাগছে।

প্রথম মোটিভে হত্যকান্ড ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটির নম্বরপ্লেট ভুয়া হওয়ায় প্রকৃত খুনি চিহ্নিত করায় থমকে যেতে হয়েছে। দ্বিতীয়ত, পেছনে থাকা কালো মাইক্রোবাস চালক জানে আলম ভাড়া নিয়ে যাওয়ার পথে ঘটনার সামনে পড়ে যান। পুরো ঘটনা তিনি দেখেছেন বলে জানালেও তা খুনিদের চিহ্নিত করার কাজে তেমন সফলতা আসেনি।

চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন থেকে ছোরাসহ ইব্রাহিম নামের এক যুবককে আটক করা হলেও জিজ্ঞাসাবাদে মিতু হত্যকান্ড তার সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ মেলেনি। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে শিবিরকর্মী ও মাজারের খাদেম আবু নছর গুন্নুকে আটক করা হলেও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মিতু হত্যায় কোনো তথ্য মেলেনি। বরং মাজারের দ্বন্দ্ব নিয়ে একটি পক্ষ গুন্নুকে মিতু হত্যায় ফাঁসানোর চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে চরম অসন্তোষ পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে।

অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, হত্যকান্ডের আগে মিতুর মুঠোফোনে দেওয়া এসএমএস নিয়েও রয়ে গেছে রহস্য। ভুয়া কোনো সফটওয়্যার ব্যবহার করে এই এসএমএস দেওয়া হতে পারে। তাছাড়া মিতুর মুঠোফোনের সংগৃহীত কললিস্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায় এটি নগরীর চকবাজার থানার শুলকবহরের বড় গ্যারেজ এলাকায় এসে বন্ধ হয়ে যায়, যেখান থেকে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। এ থেকে বুঝা যায় মুঠোফোনটি খুনিরা নিয়ে গেছে। এ জন্য নিয়ে গেছে, যাতে তাদের দেওয়া এসএমএস কীভাবে কোথা থেকে দেওয়া হয়েছে সেটা যেন ধরা না পড়ে। সব মিলিয়ে খুনিদের পরিকল্পনা ছিল নিখুঁত।

দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, র‌্যাব, পুলিশ, ডিবি, পিবিআই, সিআইডিসহ প্রশাসনের সব কটি সংস্থা এ হত্যাকান্ডের রহস্য নিয়ে কাজ করলেও প্রকৃতপক্ষে খুনিদের চিহ্নিত করতে না পারায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ফলে গত শনিবার এই হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন করে গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কর্মকর্তা কামরুজ্জামানকে তদন্তভার দেওয়া হয়েছে।

সেই সাথে সংস্থা ভেদে পাঁচটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি কমিটিতে সর্বনি¤œ পাঁচজন থেকে সর্বোচ্চ নয়জনকে সদস্য করা হয়েছে। নগর পুলিশ ও বিভিন্ন থানার দক্ষ এবং চৌকস কর্মকর্তাদের এসব কমিটিতে রাখা হয়েছে।

কমিটিগুলোর মধ্যে রয়েছে, অভিযান, আসামিকে জেরা, কেস ডকেট পর্যালোচনা, ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনা এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ।

এর মধ্যে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সর্বশেষ একটি চিরকুট নিয়ে এগোচ্ছে, যা বর্তমানে কারাবন্দি জেএমবি সদস্য ফুয়াদ ওরফে মো. বুলবুলের লেখা। বুলবুল এ চিরকুটে নিজেকে আইএস দাবি করে জেএমবি নেতা জাবেদকে খুনের অভিযোগ এনে পুলিশ সদস্যদের হত্যার আহ্বান জানানো হয়েছে।

বিভিন্ন হাত ঘুরে চিরকুটটি পৌঁছ্য়া পিবিআই এবং একটি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার কাছে। গত ৫ জুন এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম ওরফে মিতু হত্যার আগে চিরকুটটি অবশ্য নগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছেও পৌঁছেছিল। কিন্তু এ নিয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধানের মধ্যেই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে যায়।

হত্যার ঘটনা অনুসন্ধানে নেমে পিবিআই এখন চিরকুটের আহ্বান অনুযায়ী জেএমবি বাবুল আক্তারের ওপর প্রতিশোধ নিতে তার স্ত্রী মিতুকে খুন করেছে কি না সেটি খতিয়ে দেখছে। মূলত পিবিআই এখন এই একটিমাত্র প্রশ্নেই এগোচ্ছে।

এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার কামরুজ্জামান বলেন, সিসিটিভির ফুটেজে দেখা মনির ও রবিনকে মামলার মোক্ষম সূত্র মনে করা হলেও পরে দেখা যায় ফুটেজে দেখা ব্যক্তিদের ছবি অস্পষ্ট হওয়ায় রবিনের চেহারা মিলানো সম্ভব হচ্ছে না। জিজ্ঞাসাবাদেও তার কাছ থেকে হত্যাকান্ডের তেমন তথ্য পাওয়া যায়নি।

প্রশ্নের জবাবে কামরুজ্জামান বলেন, ফাঁস হওয়া চিরকুটে দেখা যাচ্ছে বাবুল আক্তারসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে হত্যার পরিকল্পনা জঙ্গিদের আছে। এখন বাবুল আক্তারকে না পেয়ে তার স্ত্রীকে খুন করা হয়েছে কি না, প্রতিশোধ নেয়ার জন্য এই খুন কি না এসব বিষয় আমরা খতিয়ে দেখছি।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত