টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

কর্মব্যস্ততা বেড়েছে মিরসরাইয়ের মুড়ি পল্লীতে

রমজানে চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি 

Mirsarai-Muri-Photoচট্টগ্রাম, ১৩ জুন (সিটিজি টাইমস):: মিরসরাইয়ে কর্মব্যস্ততা বেছেড়ে উপজেলার মুড়ি পল্লীগুলোতে। সারা বছর হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা থাকলেও রমজান আসলে এই চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় কয়েকগুণে। বাজারের চাহিদা মেটাতে বাড়তি লোক নিয়োগ দিয়ে কাজ করতে হয় কারিগরদের। তবে দেশী হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা থাকলেও বাজারে কারখানায় উৎপাদিত রাসায়নিক মুড়ির ভীড়ে যেন অস্তীত্ব হারাতে বসেছে দেশীয় মুড়ি। তবে হাতে ভাজা মুড়ি উৎপাদন করতে খরচ বেশী পড়ায় মেশিনের তৈরী মুড়ির চেয়ে এর দামটা বাজারে একটু বেশীই থাকে সব সময়। রমজান মাসে মুড়ির চাহিদা বেশী থাকায় উপজেলার মুড়ি পল্লীগুলোতে আগের চেয়ে বেড়েছে কর্মব্যস্ততা।

সরজমিনে উপজেলার মঘাদিয়া ইউনিয়নে গজারিয়া এলাকার পলাশ ডা. বাড়ীতে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের নারী-পুরুষের সবার কর্মব্যস্ততায় দিন কাটছে। রাত দিন মুড়ি ভাজার কারণে নাওয়া খাওয়াও নেই অনেকের। কেউ চুলোয় খোলা (মুড়ি তৈরীর পাত্র) বসিয়ে চাউলে নাড়তেছে। কেউ চাউল থেকে তৈরী হওয়া মুড়ি গুলো বালি থেকে চালন দিয়ে চেলে আলগা করছে। আর কেউ এটা বস্তায় ভরছে বাজারজাতকরণের জন্য।

মুড়ি তৈরীর কারিগর অণিল বরণ মজুমদার বলেন, সব ধানের চাউল দিয়ে মুড়ি হয় না। দেশীয় জাতের ধান গিয়জ, মুতপান ধানের চাউল দিয়ে মুড়ি ভালো হয়। এধানের চাউল দিয়ে তৈরী মুড়ি দেখতে সুন্দর আর খেতেও সুস্বাধু। আমরা ধানগুলো স্থানীয় ধানের বাজার আবুতোরাব, বড়দারোগারহাট ও মিঠাছরা বাজার থেকে সংগ্রহ করি। প্রতি আড়ি ধানের দাম পড়ে ২২০-২৫০ টাকা। ধান আনার পর ধান চাউল কলে দিয়ে খোসা আলাদা করি। পরে চাউল গুলো প্রথমে পানিতে একটু ভিজায়। ভিজানোর পর চুলোয় খোলা বসিয়ে আগুন দিয়ে উত্তপ্ত করা বালিতে পরিমাণ মতো চাউল দেওয়ার পর সলা দিয়ে আস্তে আস্তে নাড়লে চাউলগুলো মুড়িতে পরিণত হয়। পরে মুড়ি বালি থেকে আলাদা করে বিক্রির জন্য প্লাস্টিকের ব্যাগে রাখা হয়। মুড়ি বিক্রির জন্য আমরা আগে স্থানীয় বিভিন্ন বাজারে নিয়ে যেতাম। এখন পাইকারী ব্যবসায়ী ও বড় দোকানদাররা বাড়িতে এসে আমাদের মুড়ির অর্ডার দিয়ে যায়। সারা বছর দেশীয় মুড়ির চাহিদা থাকলেও রমজান মাস আসলে মুড়ির চাহিদা বেড়ে যায়। আমরা হাতে ভাজা মুড়িতে রাসায়নিক কোন পদার্থই মিশাই না। ফলে মানুষের বিশ্বাস হাতে ভাজা মুড়ির প্রতি দিন দিন বাড়তেছে। হাতে ভাজতে মুড়িতে খরচ বেশী পড়ে তাই এর দামও বেশী। বর্তমানে মেশিনে মুড়ি বাজারে আসায় হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা আগের চেয়ে অনেকটা কমেছে। কেননা হাতে ভাজা ১কেজি মুড়ির টাকা দিয়ে মেশিনের মুড়ি ২ কেজি পাওয়া যায়।

মণিকা রাণী দাশ বলেন, বাজারে হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা থাকলেও পুঁজি না থাকায় আমরা মুড়ির ধান বেশী সংগ্রহ করতে পারিনি। বেসরকারী ভাবে এনজিওগুলো থেকে কিস্তিতে টাকা নিলে সুদ বেশী পড়ে তাই আমাদের পোষায় না। সরকারী ভাবে যদি বিনা সুদে আমাদের টাকা দেওয়া হয় তাহলে হাতে মুড়ি ভাজাটা একটা শিল্পে পরিণত হতে পারে। পূর্ব পুরুষের স্মৃতি হিসেবে আমরা এখনো মুড়ি ভাজি। তবে বর্তমানে নতুন প্রজন্ম এই কাজে আসতে চায় না। এভাবে চলতে থাকলে একদিন হারিয়ে যাবে হাতে মুড়ি ভাজার কাজ।

উপজেলার মিরসরাই সদর ইউনিয়নের দাশ বাড়ি, মঘাদিয়া ইউনিয়নের ভূইয়া বাড়ী, চৌকিদার বাড়িতে হাতে মুড়ি ভাজা হয়। সম্প্রতি উপজেলার মিঠাছরা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, মেশীনে তৈরী প্রতি কেজি মুড়ি বিক্রি হচ্ছে ৫৫-৬৫ টাকা। আর হাতে ভাজা মুড়ি বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৪০ টাকা পর্যন্ত। তবে দেশীয় পদ্বতিতে তৈরী হাতে ভাজা মুড়ির দাম বেশী হলেও চাহিদা একটুও কমেনি।

মিঠাছরা বাজারের মুড়ি বিক্রেতা শিবু জানান, মেশিনের তৈরী বিভিন্ন চাউলের মুড়ি বাজারে থাকলেও হাতে ভাজা মুড়ির চাহিদা মানুষের কাছে রয়েছে এখনো প্রচুর পরিমাণে। যদিও হাতে ভাজা মুড়ি এখন আগের মতো ভাজা হয় না। তবে সরকারী ভাবে যদি পৃষ্ঠপোষকতা করা তাহলে হাতে ভাজা মুড়ি দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানী করা সম্ভব।

উপজেলা কৃমি কর্মকর্তা শাহ আলম বলেন, উচ্চ ফলনশীল জাতের ব্রি ২৮, ২৯ জাতের ধান দিয়ে মুড়ি ভালো হয়। তবে দেশীয় কিছু জাতের ধান দিয়েও মুড়ি ভালো হয়। আমন মৌসুসে এই ধানের ফলন মিরসরাইতে হেক্টর প্রতি ৬ টনের মতো হয়। ধানের ফলন ভালো হওয়ায় মুড়ি কারিগররা ধান সংগ্রহে তেমন কষ্ট করতে হয় না।

মতামত