টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের টার্গেট ছিলেন এসপি ও তার পরিবার!

ছবিঃ অনুপম বড়ুয়া

ছবিঃ অনুপম বড়ুয়া

চট্টগ্রাম, ০৫  জুন (সিটিজি টাইমস): : মহানগরীসহ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় জঙ্গি, সন্ত্রাসী ও দুর্ধর্ষ অপরাধীদের কাছে আতঙ্ক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তার। চাকরি জীবনের শুরু থেকেই চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলায় দায়িত্বপালনকারী পুলিশ বাহিনীর এই দুঃসাহসিক কর্মকর্তা একের পর এক জঙ্গি বিরোধী অভিযান, সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি গ্রেনেড ও অস্ত্র উদ্ধার করে সারা দেশেই আলোচিত ছিলেন।

গত সপ্তাহেই পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পেয়ে ঢাকায় পুলিশ সদর দপ্তরে যোগদানের আদেশ পেয়েছিলেন বাবুল আক্তার। আজ রোববার সকালে তার ঢাকায় পুলিশ সুপার পদে যোগদান করার কথা ছিল। কিন্তু আজকের দিনেই দুর্বৃত্তরা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে গুলি করে হত্যা করেছে।

ধারণা করা হচ্ছে এসব জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের সব সময়ই টার্গেট ছিলেন বাবুল আক্তার ও তার পরিবার। আর সেই ধারাবাহিকতায় রোববার সকালে নগরীর জিইসি মোড়ে ওআর নিজাম রোডের বাসা থেকে পুত্রকে স্কুল বাসে তুলে দিতে বাসার বের হলে বাবুল আক্তারের স্ত্রী মিতুকে দুর্বৃত্তরা গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়।

পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বাবুল আক্তার চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা বিভাগে কর্মরত ছিলেন। তার সহকর্মিরা জানান, বাবুল আক্তার পুলিশ বাহিনীর একজন দুর্ধর্ষ সাহসী ও চৌকস কর্মকর্তা। মূলত তাকে কাবু করতে, কিংবা নিষ্ক্রিয় করতে কোনো সন্ত্রাসী কিংবা জঙ্গি গোষ্ঠী এই বাবুল আক্তারের স্ত্রীকে হত্যা করেছে।

বাবুল আক্তার ২০০৫ সালে র‌্যাবে যোগ দিয়ে নিজ উদ্যোগে ক্লুলেস আলোচিত কিশোরগঞ্জের সিক্স মার্ডার মামলার রহস্য উদঘাটন ও আসামিদের গ্রেপ্তার করে দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন। সে কারণে তিনি পেয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক। এ ছাড়া তিনি চট্টগ্রামের হাটহাজারীর সার্কেল এএসপি হিসেবে যোগ দিয়ে উত্তর চট্টগ্রামে একের পর এক অভিযান চালিয়ে গণমানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান।

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার ১১ জনের একটি ডাকাতদলকে এক রাতে ক্রস ফায়ারে হত্যার পর বাবুল আক্তারের নাম সমগ্র চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রামের খলিল ডাকাত, কাদের ডাকাত, উত্তর চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান ওসমান ওরফে কিলার ওসমানসহ অসংখ্য সন্ত্রাসীর অপরাধ জীবন থামিয়ে দিয়েছিলেন বাবুল আক্তার।

সর্বশেষ হাটহাজারী ও কক্সবাজারে দায়িত্ব পালন শেষে ফের সিএমপির গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি হিসেবে যোগ দেন বাবুল আক্তার। যোগ দিয়েই আগ্রাবাদে কথিত প্রেমিকের হাতে মা ও মেয়ের হত্যার রহস্য উদঘাটন করেন প্রত্যক্ষদর্শী এক বোবা ভিক্ষুকের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে। তারপর গ্রেপ্তারও করেন ওই হত্যার সঙ্গে জড়িতদের। এমনকি ডিআইজির বাসভবনের সামনে পুলিশ কনেস্টেবল হত্যা মামলার রহস্যও উদঘাটনসহ চট্টগ্রামের আলোচিত অনেক মামলার রহস্য উদঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

আলোচনায় থাকা বাবুল আক্তার ফের আলোচনায় আসেন গত বছর নগরীর কর্ণফুলী থানার খোঁয়জনগর এলাকার একটি ভবনের নিচ তলায় জেএমবি আস্তানায় অভিযান চালাতে গিয়ে। এদিন তিনি জেএমবি জঙ্গিদের গ্রেনেড হামলা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পান। সেখানে তাকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়ে মেরেছিল নিহত জঙ্গি নেতা জাবেদ। এরপরও সেখান থেকে গ্রেপ্তার করেন জেএমবি চট্টগ্রামের সামরিক শাখার প্রধান মোহাম্মদ জাবেদসহ পাঁচ জঙ্গিকে। উদ্ধার করেছেন শক্তিশালী নয়টি হ্যান্ড গ্রেনেড, প্রায় ২শ’ রাউন্ড একে ২২ রাইফেলের গুলি, একটি বিদেশি পিস্তল, ১০টি ছোরা, বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জাম, অস্ত্র তৈরির মেশিন ও জিহাদি বই। গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর হাটহাজারীর আমান বাজারের একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে জেএমবি নেতা ফারদিনের বাসা থেকেও বিপুল বিস্ফোরক ও অত্যাধুনিক মার্কিন স্নাইপার রাইফেল উদ্ধার করে আলোচনায় ছিলেন তিনি।

এই ছবি এখন শুধুই স্মৃতি। আজ সকালে ঘাতকের হাতে খুন হয়েছেন মাহমুদা খানম মিতু

একের পর এক সন্ত্রাস ও জঙ্গিবিরোধী অভিযানের কারণে সব সময়ই সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের টার্গেট ছিলেন বাবুল আক্তার। এই টার্গেটের কারণেই কি রোববার সকালে স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা?

বাবুল আক্তারের স্ত্রীর হত্যাকা- বিষয়ে চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার জানিয়েছেন, এ হত্যাকা-ের সাথে কোনো জঙ্গি গোষ্ঠী জড়িত রয়েছে কি-না খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই হত্যাকা-ে যারাই জড়িত দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের চিহ্নিত ও গ্রেপ্তার করা হবে। ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রতিটি থানায় বিশেষ বার্তা প্রেরণ করে এলার্ট জারি করা হয়েছে। নগরীর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারে তল্লাসি অভিযান চলছে।

প্রসঙ্গত, পুলিশের ২৪ তম ব্যাচের বিসিএস কর্মকর্তা বাবুল আক্তার ২০০৫ সালে পুলিশে যোগ দেন। সারদা পুলিশ একাডেমিতে প্রশিক্ষণ শেষে র‌্যাব-২-এ কর্মজীবন শুরু করেন। ২০০৮ সালে নগর পুলিশের কোতোয়ালি জোনের সহকারী কমিশনার পদে যোগ দেন। এরপর তিনি জেলা পুলিশের হাটহাজারী সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার পদে কর্মরত ছিলেন।

পরবর্র্তীতে পদোন্নতি পেয়ে বাবুল আক্তার দীর্ঘদিন কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং দুই দফায় দুই বছর জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর থেকে নগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) পদে দায়িত্ব পালন করেন।

অপরাধ দমনে সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে বাবুল আক্তার পেয়েছেন রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক পিপিএম (সেবা) (২০০৮), ২০০৯ পিপিএম (সাহসিকতা), ২০১০ সালে আইজিপি ব্যাজ, ২০১১ সালে পুলিশের সর্বোচ্চ মর্যাদাশীল পুরস্কার বাংলাদেশ পুলিশ মেডাল (সাহসিকতা)। বেসরকারি পর্যায়ে ২০১২ সালে সিঙ্গার-চ্যানেল আই (সাহসিকতা) পুরস্কার লাভ করেছেন বাবুল আক্তার।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত