টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

১৩ দিনের জাহাজ ধর্মঘটে শত কোটি টাকার ক্ষতি

চট্টগ্রাম, ০২ মে (সিটিজি টাইমস):: দেশব্যাপী চলমান জাহাজ মালিকদের ধর্মঘট তের দিনের মাথায় সোমবার রাতে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ধর্মঘট প্রত্যাহার হলেও এর ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আমদানীকারক ও ব্যবসায়িদের শত কোটি টাকা ক্ষতি গুণতে হবে। আর এ প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তাদের উপর এমন দাবি ব্যবসায়িদের। 

সোমবার রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙ্গর এবং দেশের ৩৬ ঘাটে বিভিন্ন জাহাজে ভাসছে শত শত কোটি টাকা পণ্য। খালাসের অপেক্ষায় থাকা এসব পণ্যের বেশির ভাগই খাদ্য পণ্য। ফলে গত ১৩ দিন যাবত কোন পণ্য খালাস না হওয়ায় এসবে অধিকাংশ নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন আমদানীকারক ও ব্যবসায়িরা।

নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খানের আশ্বাসে পণ্যবাহী জাহাজ মালিকদের চলে আসা ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন জাহাজ মালিকরা। এর আগে দুপুর ২টা থেকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে জাহাজ মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন মন্ত্রী শাজাহান খান। এ সময় শ্রমিকদের বেতন-ভাতার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন মন্ত্রী। এ আশ্বাস পেয়ে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে পণ্যবাহী জাহাজ মালিকরা।

জানা গেছে, বেতনভাতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবী দাওয়া নিয়ে প্রথমে নৌ যান শ্রমিক ধর্মঘট, পরে মালিকদের জাহাজ না চালানোর সিদ্ধান্তের কারণে টানা ১৩ দিন যাবত এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। টানা এই অচলাবস্থার কারণে বড় অঙ্কের অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি পণ্য খালাসে অপেক্ষমাণ জাহাজের ক্ষতির খাতেও শতকোটি টাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ব্যবসায়িরা জানান, বিশাল এ ক্ষতির কারণে দ্রব্যমূলের দাম বৃদ্ধি পাবে এবং এজন্য সাধারণ মানুষের উপর চাপ পড়বে। শ্রমিকদের কর্মবিরতি প্রত্যাহার হলেও লাইটারেজ জাহাজ মালিকদের ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ৬৭টি জাহাজ থেকে পণ্য খালাস বন্ধ ছিল সোমবার রাত পর্যন্ত।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা ৬৭টি জাহাজ ১৩ দিন ধরে পণ্য খালাসের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অপেক্ষা করছে। মজুরি বৃদ্ধির জন্য লাইটারেজ জাহাজ ও নৌযান শ্রমিকদের ধর্মঘট এবং পরে মজুুরি বৃদ্ধির ঘোষণা বাস্তবায়ন সম্ভব নয় জানিয়ে লাইটারেজ জাহাজ মালিকদের ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য লাইটারিংয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত বহির্নোঙরে ৬৫টি বড় জাহাজে আটকে রয়েছে ১৮ লাখ ৩১ হাজার টন পণ্য। এর মধ্যে রয়েছে সার, গম, অপরিশোধিত চিনি, ভোজ্যতেল, সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল, রড তৈরির কাঁচামাল, ইটভাটায় ব্যবহারের কয়লা, পোলট্রি খাদ্যসহ ১৬ ধরনের পণ্য। অথচ ১২ দিন আগে ধর্মঘট শুরু আগের দিন পর্যন্ত বহির্নোঙরে ৪৯টি বড় জাহাজে ১২ লাখ ৩০ হাজার টন পণ্য খালাসের অপেক্ষায় ছিল।

লাইটার জাহাজ পরিচালনাকারী বেসরকারি সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের তথ্য অনুযায়ী, বন্দর থেকে খালাস করার পর দেশের বিভিন্ন ঘাটে রোববার পর্যন্ত ৭৩২টি জাহাজে আটকে ছিল ৮ লাখ ২৬ হাজার টন পণ্য। বহির্নোঙর ও অভ্যন্তরীণ নৌপথে কেবল সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামালই আটকা পড়েছে সাড়ে ১৩ লাখ টন। ছোট-বড় বিভিন্ন জাহাজে ৩ লাখ ৩৯ হাজার টন গম, দেড় লাখ টন ডাল ও সরিষা, ১ লাখ ৩৩ হাজার টন পুরোনো লোহার টুকরা ও বিলেট, ১ লাখ ৭৮ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া ও এমওপি সার, ৯৫ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি, ৮৮ হাজার টন কয়লা আটকা পড়েছে। এ ছাড়া সিরামিক শিল্পের কাঁচামাল, পোলট্রি খাদ্য, ভোজ্যতেলও রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন) জাফর আলম জানান, যেসব আমদানিকারকের নিজস্ব লাইটার জাহাজ রয়েছে-তারা নিজেদের জাহাজ দিয়েই বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস করছে। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব লাইটার জাহাজ নেই তারা লাইটার জাহাজ ভাড়া করে পণ্য খালাস করে থাকেন। তাই জাহাজ মালিকরা ধর্মঘটের কারণে এতোদিন মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ধর্মঘট প্রত্যাহার করায় রাত থেকে পণ্য খালাস শুরু হয়েছে।

আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, ১৩ দিন পণ্য খালাস না হওয়ায় এবং জাহাজগুলো পণ্য খালাসের অপেক্ষায় বহির্নোঙরে অলস দাঁড়িয়ে থাকায় কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। প্রতিটি জাহাজের জন্য দৈনিক ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এই ক্ষতি দেশের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।

চট্টগ্রাম চেম্বার অব কর্মাস এর সভাপতি মাহবুবুল আলম ধর্মঘট প্রত্যাহারে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, লাইটারেজ জাহাজ মালিক শ্রমিকদের ধর্মঘটের ফলে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এতে ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের মাশুল গুনতে হবে। ব্যবসায়ীরা এতে কয়েকশ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। এর পরও ধর্মঘট প্রত্যাহার হওয়ায় ব্যবসায়িদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে বলে মন্তব্য করেন এ ব্যবসায়ি নেতা।

উল্লেখ্য, মজুরি বৃদ্ধিসহ ১৫ দফা দাবিতে গত ২০ এপ্রিল রাত ১২টা থেকে সারাদেশে নৌযান শ্রমিকদের লাগাতার ধর্মঘট শুরু হয়। নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাসের পর এক সপ্তাহের মাথায় ২৬ এপ্রিল রাত ১০টায় স্থগিত করা হয়।

বৈঠকে নৌযানের শ্রমিকদের সর্বনিম্ন ধাপের মজুরি ৭ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত হয়। এ সিদ্ধান্তে কথা মন্ত্রী জানানোর পর ধর্মঘট কর্মসূচি স্থগিত করার ঘোষণা দেন শ্রমিক নেতারা। কিন্তু জাহাজ মালিকরা সরকারের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে পরদিন থেকে ‘জাহাজ না চালানোর’ কর্মসূচি শুরু করেন। তারা বলছে সরকারের নির্ধারণ করে দেয়া অতিরিক্ত মুজরী দিয়ে জাহাজ চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এতে তারা পোষাতে পারবেন না। এ পরিস্থিতিতে গত শনিবার সকালে চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে এ সভার আয়োজন করা হয়। প্রায় সাড়ে ৩ ঘন্টা ধরে চলা সভায় জাহাজ মালিক, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও বন্দরের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু কোন ধরনের সিদ্ধান্তে না পৌছায় মালিকরা ধর্মঘট অব্যাহত রাখে। এদিকে সর্বশেষ রোববার রাজধানীর বিজয়নগরে নৌযান-মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ কার্গো ভ্যাসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সংগঠনটির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কোন ধরনের ফলপ্রসূ না হওয়ায় জাহাজ না চালানোর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন মালিক পক্ষ।

সর্বশেষ সোমবার অনুষ্ঠিত নৌপরিবহণ মন্ত্রী শাহজাহান খানের সাথে অনুষ্ঠিত সভা থেকে মালিকরা ধর্মঘট প্রত্যাহরের ঘোষণা দেন।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত