টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

জাপানে নজিরবিহীন বিপর্যয়

japanচট্টগ্রাম, ১৭  এপ্রিল (সিটিজি টাইমস) :: ৬ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পের একদিন পরই আচমকা আরেক শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাতে জর্জরিত জাপান। ৭ দশমিক ৩ মাত্রার দ্বিতীয় ভূমিকম্পে যা কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, এর নজির আধুনিক জাপানে আর নেই। জনবসতি গড়ে ওঠা পার্বত্য অঞ্চল ভেঙে দুভাগ, অসংখ্য ভবন ও সড়ক ধসে পড়া, ভূমিধসে আস্ত আস্ত সেতু ভেসে যাওয়া- কী নেই ক্ষতির তালিকায়! এখন পর্যন্ত ৩৬টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

শনিবারের ভূমিকম্পে স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে পুরো জাপান, নড়ে উঠেছে বিশ্ব। অসংখ্য ধ্বংসস্তূপের ভেতর কেবল মানুষের তৈরি দালানকোঠাই তো নেই, এবার প্রকৃতিই ভেঙে পড়েছে জাপানের ওপর। বিশাল ভূমিধসে ভেঙে পড়া মাটি শুধু ঘরবাড়ি পথঘাটের ওপরেই নয়, নদীর তীরেও আছড়ে পড়েছে। পার্বত্য এলাকায় অবস্থিত নদীটির পানি ঝরনাধারায় নেমে আসছে বন্যার মতো।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে বলেছেন, জীবিতদের উদ্ধারে ‘সময়ের সঙ্গে যুদ্ধে’ নেমেছে জাপান। মানুষের জীবনের চাইতে মূল্যবান আর কিছুই নেই। তাই দিনের আলো থাকতে থাকতে উদ্ধারকাজে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ও শনিবার সকালের ভূমিকম্পে। নিহতের সংখ্যা বহুগুণে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দক্ষিণ কিয়ুশু দ্বীপে উদ্ধারকাজ চলছে। কিন্তু ভূমিধস, ভবনধস, সড়কে ধস, সবমিলিয়ে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে উদ্ধারকাজ ভীষণ রকমের ব্যাহত হচ্ছে। ফলে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা এখনো অজানা।

সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে উদ্ধারকাজ আরো দ্রুত করার চেষ্টা চলছে, কারণ ভারি বৃষ্টি শুরু হওয়ার আশঙ্কা করছে জাপান, যা উদ্ধারকাজকে আরো কঠিন করে তুলবে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় দ্বীপটির কুমামোতোর কাছে ভূমিকম্পটির উৎস ছিল মাটির মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে জানিয়েছে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস।

ভূমিকম্পের কারণে বিভিন্ন এলাকায় বিশাল বিশাল সব ফাটল, কল্পনাতীত রকমের বড় গর্ত তো সৃষ্টি হয়েছেই, তাতে ধসে পড়া সেতু, ঝুলতে থাকা বাড়িঘর, অগ্নিকাণ্ড, বিদ্যুৎ সংকট ইত্যাদির ছবি প্রকাশ করেছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম। ড্রোন থেকে ধারণ করা হয়েছে এসব দৃশ্য।

একটি বাঁধ ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এছাড়া শত বছরের আঁচড় গায়ে নিয়ে মাথা উঁচু করে এতদিন দাঁড়িয়ে থাকা চারশ’ বছরের পুরোনো কুমামোতো দুর্গ ভূমিকম্পে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রায় দুই লাখ বাড়িঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় চার লাখেরও বেশি মানুষ ন্যূনতম পানি পাচ্ছেন না। জানিয়েছে জাপানের সংবাদমাধ্যমগুলো।

সনি করপোরেশন, হোন্ডা মোটরের মতো বহুজাতিক কোম্পানি উৎপাদন বন্ধ রেখে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যাচাইয়ে ব্যস্ত।

প্রথম ভূমিকম্পের পরই প্রায় ৪৪ হাজার মানুষ নিজেদের বাসাবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গিয়েছিলেন। কম্বল নিয়ে চুপচাপ কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রের মেঝতে হাজারো মানুষের শুয়ে থাকার হৃদয় বিদারক ছবি প্রকাশ করেছে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল।

ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিনামিয়াসো ও মাশিকি গ্রামের বাসিন্দারা। কুমামোতোর কেন্দ্র থেকে প্রায় নয় মাইল দূরের মাশিকির প্রায় সবগুলো ভবন আস্ত আস্তই ধসে পড়েছে টুকরো টুকরো হয়ে, দরজা, জানালার কাঁচ, দেওয়াল সবকিছুই গুঁড় হয়ে পড়ে রয়েছে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে। কিয়ুশুত দু’টো বিচ্যুতির কাছাকাছি অবস্থিত মাশিকি। এছাড়া কাছাকাছি রয়েছে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি মাউন্ট আসো। পাঁচ হাজার ২২৩ ফুট উঁচু পাহাড়টি ভূমিকম্পের উৎসস্থল থেকে দেড় ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত।

বৃহস্পতিবারের ভূমিকম্পে সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে অগ্ন্যুৎপাত ঘটবে কিনা, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নয় প্রশাসন। ভূমিকম্পের পর এক মাসের মধ্যে প্রথমবার মাউন্ট আসো আগ্নেয়গিরি থেকে ধোঁয়া ও ছাই বের হওয়া শুরু হলেও ভূমিকম্পের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে কিনা, তা এখনো অস্পষ্ট। নিকটবর্তী তিনটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কোনো সমস্যা হয়নি বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ভূমিকম্প পরবর্তী ‘আফটারশক’-এর আশঙ্কা কাটেনি এখনো। আফটারশক হিসেবে শতাধিক ছোট ছোট মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, আগামী এক সপ্তাহে এ রকম আরো কয়েকশ’ আফটারশক অনুভূত হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

জাপানের আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, শনিবারের ভূমিকম্পটিই সম্ভবত মূল কম্পন ছিল। বৃহস্পতিবারের ভূমিকম্পটি কেবল পূর্বসতর্কতা ছিল। প্রথম ভূমিকম্পেই ১০ জন নিহত হয়েছেন।

সেনাবাহিনীর অতিরিক্ত ২০ হাজার সদস্যকে উদ্ধারকাজে লাগিয়েছে জাপান সরকার। সহায়তার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে অঞ্চলটির সমস্ত পুলিশ ও অগ্নিনির্বাপক কর্মীদেরও।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত