টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মহাবিপাকে চট্টগ্রাম নগর বিএনপি!

চট্টগ্রাম, ১৫ এপ্রিল (সিটিজি টাইমস) :: ইয়েস শাহাদাত, নো শাহাদাত। এটাই এখন বন্দরনগরী চট্টগ্রামে বিএনপির জিকির। কেন্দ্রে পদ পেয়ে ডাক্তার শাহাদাত বেশ ফাঁপরে আছেন। তার রাজনৈতিক ছক পুরো এলোমেলো হয়ে গেছে। মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তিনি, কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য সভাপতি। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অনেক উপরে পদ পাচ্ছেন, এমন আলোচনা থেকে ধরেই নেয়া হচ্ছে সভাপতির পদে থাকছেন না তিনি। কিন্তু কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ায় দলের ‘এক নেতা এক পদ’ নিয়মে চট্টগ্রামের পদ ডাক্তার সাহেবকেও ছাড়তে হবে। তাহলে ৭ বছর তিলে তিলে গড়ে তোলা ঐক্য কে রক্ষা করবে, প্রশ্ন মাঠ-কর্মীদের। এই প্রশ্ন আসে এই কারণে যে, ২০০৯ সালে খসরু-শাহাদাত কমিটি আসার পর জঘন্য গ্রুপিং-এর খেলা অনেকটাই বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে।

ডাক্তার শাহাদাত হোসেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হওয়ার প্রাথমিক উচ্ছ্বাসটা কেটে গেছে। এখন শংকার প্রহর। তিনি কেন্দ্রে চলে গেলে চট্টগ্রাম মহানগরীর কী হবে? সাধারণ হিসেবে উত্তর, পরবর্তী যোগ্য নেতা দায়িত্ব নেবেন। কিন্তু এই উত্তর ধোপে টেকে না অন্তত চট্টগ্রামের রাজনীতিতে। গ্রুপিং এর জন্য বিখ্যাত চট্টগ্রাম। দলীয় গ্রুপিং টিকিয়ে রাখার জন্য ভিন্ন দলের সাথে হাত মেলানো চট্টগ্রামের বিগ শট নেতাদের পুরানো অভ্যাস।

বিএনপির রাজনীতিতে গ্রুপিং হানাহানির দীর্ঘ পরিক্রমায় সবচেয়ে সংহত অবস্থান বর্তমান আমলে, সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক ডাক্তার শাহাদাত। অল্পদিনের আহবায়ক কমিটি বাদ দিলে আগের কমিটিও বেশ সংহত ছিল। সভাপতি মীর মোহাম্মদ নাছিরুদ্দীন, সাধারণ সম্পাদক আলহাজ দস্তগীর চৌধুরী। ওই কমিটির সময় আব্দুল্লাহ আল নোমান, মোরশেদ খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে যার অবস্থান থেকে গ্রুপিং-এর আগুনে হাওয়া দিয়ে গেছেন। মীর নাসির ‘কাত’ হয়ে যাওয়ার পর জায়ান্ট প্লেয়াররা একটু নিষ্ক্রিয় হন। ওয়াহিদুল আলমকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় স্বল্পমেয়াদী কমিটি। এরপর আসেন আমীর খসরু ও শাহাদাত হোসেন।

দুজনের সম্পর্ক নিয়ে শুরুতে কিছুটা টানাপড়েন ছিল। ডাক্তার শাহাদাত অনেক জুনিয়র হওয়াতে এই আলোচনার সূত্রপাত বলে মনে করা হত। কিন্তু অত্যন্ত সক্রিয় নেতা হিসেবে তার কর্মকাণ্ডে মহানগর সংগঠন গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। সভাপতি সাধারণ সম্পাদক ছোট খাটো বিভেদ কাটিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মাঠে নামান। থানা, ওয়ার্ডসহ বিভিন্ন ইউনিটের সম্মেলন হয়। আর নগরজুড়ে এই কর্মতৎপরতার মধ্যদিয়ে অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতা ডাক্তার শাহাদাত তৃণমূল পর্যায়ে নিজেকে ভীষণ গ্রহণযোগ্য করে তোলেন। চট্টগ্রাম মেডিক্যালের ছাত্রনেতার মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হওয়া নিয়ে যারা নানা বাক্যবাণ ছুঁড়তেন, তারাও মানতে বাধ্য হলেন সাদাসিধা ডাক্তার চট্টগ্রাম বিএনপির গ্রুপিং এর চিকিৎসা ঠিকভাবেই করছেন।

গ্রুপিং ঘা সদ্য শুকিয়েছে, এখন এই সবল কর্মীবাহিনী নিয়ে দল শক্তিশালী পায়ে সামনে আগাবে, এমন এক সময়ে ডাক্তার শাহাদাতকে কেন্দ্রে নিয়ে আসায় গোটা মহানগরের নেতাকর্মীরা বেশ দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বলা যায়। এ ব্যাপারে কথা বলতে চাইলাম ডাক্তার শাহাদাতের সাথে। ব্যস্ত মানুষ, একটু ফাঁক পেয়ে ঢাকা এসেছেন শ্বশুরবাড়িতে, সপরিবারে। খুব ব্যস্ত, ফোনে ধরিয়ে দিলেন নগর বিএনপি নেতা মোহাম্মদ আলী মিঠু। অল্প আলাপ।

ডাক্তার শাহাদাত বললেন, ”ওয়ান ইলেভেনের সময় জীবনবাজি রেখে খসরু ভাই ও আমি নগর বিএনপিকে আঁকড়ে রেখেছি। নেতা কর্মীদের শত দুর্বিপাকেও হাল ছাড়েনি, ঐক্য নষ্ট হয়নি। ৭ বছরে নির্যাতিত-নিপীড়িত নেতাকর্মীরা গোটা মহানগরে সংহত অবস্থান নিয়েছে। সভাপতির সক্রিয় তত্ত্বাবধানে থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিট কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখন এই ফোর্স সরকার পতনের চূড়ান্ত ধাপে লড়াই করবে। আমি থাকতে পারলে রেজাল্ট ভালো হত, কিন্তু চেয়ারপারসন যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তাই চূড়ান্ত। কোন নতুন সিদ্ধান্ত হলেও সেটা তিনিই নেবেন। আমি দলের অনুগত কর্মী। দল যা বলবে তাই করব।”

কিন্তু খসরু ও শাহাদাত একসাথে বিদায় নিলে তৃণমূলে ভয় কীসের? আলোচনা হল বিএনপি, শ্রমিকদল, যুবদল ও ছাত্রদলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা কর্মীদের সাথে। কী বলেন তারা? যতভাবেই কমিটি করা হোক না কেন, খসরু-শাহাদাতের হাতের পরশে নতুন করে যারা যোগ্যতার মাপকাঠিতে উঠে এসেছেন, তারাই বিভিন্ন পদে থাকবেন। খসরু স্থায়ী কমিটিতে যাবেন, নিশ্চিত। শাহাদাত সাংগঠনিক হয়েছেন। তাদের হাতে গড়া সেরা নেতারা মহানগর কমিটিতে স্থান পাবেন, এটা ঠিক।

কিন্তু সভাপতি সাধারণ সম্পাদক যারা হবেন, তারা এই নেতাদের ‘সাইজ’ করবেন, এটা সবাই খোলাখুলি বলছেন। গ্রুপিং ঝামেলা হবে না, এমন নেতাই নাকি আর নেই! আবার এ হিসেবে খসরু শাহাদাত বিদায় নিলে যারা মূল দায়িত্বে আসবেন বা আসতে পারেন, তাদের নাম চট করে বলা মুশকিল। কিছু নাম আছে, যারা ঐতিহাসিকভাবেই গ্রুপিং, চাঁদাবাজি আর ভুমিদস্যুতার সাথে জড়িত। সব সময় সরকারের সাথে আন্ডার টেবিল যোগাযোগ তাদের নাকি ঐতিহ্য। আর তারা এলে কমিটির ৯০ ভাগ নেতাই কাজ করতে পারবেন না। নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বেন।

‘তবে ম্যাডাম পারেন তার ক্ষমতাবলে মহানগরে ডাক্তার শাহাদাতকে রাখতে। একাধিক পদে কাউকে রাখার ক্ষমতা তার রয়েছে।’ এ কথা উল্লেখ করে থানা কমিটির এক সভাপতি বললেন, ‘ডাক্তার সাহেবকে সভাপতি করলে দল উপকৃত হবে।’ সেক্ষেত্রে সাধারণ সম্পাদক কে হবেন? পতেঙ্গার প্রবীণ এক নেতার মতে, ছাত্রদলের রাজনীতির প্রবাদ পুরুষ আবু সুফিয়ানের নাম আসে। কিন্তু তিনি এই কমিটির সহ সভাপতি। ছাত্রদলেও ডাক্তার শাহাদাতের অনেক সিনিয়র।দরকার হলে আবু সুফিয়ানকে সভাপতি করে হলেও ডাক্তার শাহাদাতকে আগের পদে দেখতে চান তৃণমূলের বড় একটি অংশ। এর প্রধান কারণ, ওয়ান ইলেভেনের সময় থেকে চট্টগ্রাম বিএনপির ‘১৭২’ পদের গ্রুপিং বন্ধ হয়েছে খসরু-শাহাদাতের নিরলস কর্মকাণ্ডে। এখন দুজনেই সরে গেলে আবার সেই ‘গুটিবাজ’ গ্রুপিং জায়ান্টরা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় কিনা, সেই আশংকা সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের। তারা আর গ্রুপিং চান না।

তবে এই আশংকা না করতে দলের নেতাকর্মীদের পরামর্শ দিয়েছেন নগর সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, ‘আমি ও শাহাদাত, দুজনেই তো চট্টগ্রাম আছি। ৭ বছরে তিলে তিলে যে বিশুদ্ধ কর্মীবাহিনী সংগঠিত করেছি, তাদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সুযোগ কেউ পাবে না। গ্রুপ একটাই। মহানগর কমিটি। আমরা দায়িত্ব ছাড়লে যোগ্য নেতারাই আসবে।’

গতরাতে ফোনালাপে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, সাবেক মন্ত্রী আমীর খসরুকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের একটা বক্তব্য জানানো হয়। সেটি হল, ”আপনার নেতৃত্বে ডাক্তার শাহাদাত একটা বিশাল ওয়ার্কিং ফোর্স তৈরি করেছেন, এই ফোর্সটা তিনি সভাপতি হিসেবে দুর্দান্ত গতিতে মার্চ করাতে পারতেন। এই বিবেচনায় চেয়ারপার্সন কি তার বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন? ডাক্তার শাহাদাত একই সঙ্গে কেন্দ্র ও নগরে থাকতে পারবেন?”

জবাবে আমীর খসরু জানালেন, এমন কোন সম্ভাবনা তার জানা নেই। বিষয়টি চেয়ারপার্সনের স্পেশাল পাওয়ার, যা ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত কনফিডেন্সিয়াল।

এদিকে গুলশান কার্যালয় থেকে আভাস মিলেছে, কিছু নেতার ক্ষেত্রে চেয়ারপার্সন তার ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন বলে শোনা যাচ্ছে। কয়েকজন নেতা একাধিক পদে থাকবেন, সে সাময়িক ভিত্তিতেও হতেও পারে। এই বিবেচনা পেতে পারেন ডাক্তার শাহাদাত হোসেন, হাবিব উন নবী সোহেল, সাইফুল ইসলাম নীরব ও মীর সরাপত আলী সপু।

তবে সব কথার শেষ কথা বাদামী ফাইল ম্যাডাম খালেদা জিয়ার হাতে। লন্ডনেও একই রকম আরেকটি ফাইলে কাজ চলছে। শীর্ষ থেকেই সিদ্ধান্ত পাওয়ার অপেক্ষা করতে হবে চট্টগ্রাম বিএনপিকে।-এসবি

মতামত