টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রামে ফ্লাইওভার নিয়ে দুই পক্ষে বিরোধ

চট্টগ্রাম, ১২ এপ্রিল (সিটিজি টাইমস) :  চট্টগ্রাম নগরীতে সবে যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হলো বহদ্দারহাট ও কদমতলী উড়ালসড়ক। কাজ চলছে মুরাদপুর-লালখান বাজার উড়ালসড়কের। এতে নগরীর সৌন্দর্য বর্ধনের সাথে যানজটও কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। তবুও এসব স্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। যার সঙ্গে জড়িত ক্ষমতাসীনরাই।

বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার নির্মাণ কাজের শুরুতেই প্রশ্ন তোলা হয়- কোন কাজে আসবে না; এই সড়কটি নগরীর জন্য বোঝা হবে-এমন কথাও বলেছেন নগর বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তাদের সুরে তাল মিলিয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশও।

নির্মাণ কাজ চলাকালে বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার ধসে পড়ে নিহত হয় ২০ জনেরও বেশি। তবে নানা ঘাত প্রতিঘাত ঠেলে এখন ঠাঁই দাড়িয়ে এই উড়ালসড়ক। তবে কোন রকম দুর্ঘটনা ঘটেনি কদমতলী ফ্লাইওভার নির্মাণের সময়। বর্তমানে দ্রুত এগিয়ে চলছে মুরাদপুর লালখানবাজার ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ।

যারা নগরীতে উড়ালসড়ক নির্মাণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তারা বহদ্দারহাটে ধসের ঘটনা সামনে এনে নানা কথা বলছেন। তাদের দাবি, বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয়ে এসব ফ্লাইওভার জনগণের কোন কাজে আসেনি। শুধু এক শ্রেণির ব্যবসায়ীর পকেটে টাকা গেছে।

গত শনিবার চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে গোলটেবিল আলোচনায় ফ্লাইওভার নিয়ে নানা কথার জেরে প্রায় হাতাহাতির পর্যায়ে চলে যান গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী মোশাররফ হোসেন এবং চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য আফছারুল আমীন। তবে পরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলমের হস্তক্ষেপে শান্ত হন আফছারুল আমীন।

পুরো ঘটনা চলাকালে দুই নেতার পাশেই উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। উড়ালসড়ক নির্মাণের মূল নায়ক হিসেবে তাকেই ধরা হয়। ২০১০ সালের গোড়ার দিকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে প্রায় ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার। দ্বিতীয় ফ্লাইওভার নির্মাণ হয় যানজট কবলিত আরেক মোড় কদমতলিতে।

সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে যখন ক্ষমতায় আসেন তখন চট্টগ্রাম ছিল গিঞ্জি নগরী। সড়গুলো ছিল সরু। যানজটে নাকাল ছিল নগরবাসী। সে সড়ককে দ্বি-মুখীসহ সম্প্রসারণের পাশাপাশি যানজট কবলিত স্থান হিসেবে বহদ্দারহাটে ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়। বলতে গেলে এটা ছিল প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ’।

আবদুচ ছালাম বলেন, ‘অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে হয়তো বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারে দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কোন রকম অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়নি। এই উড়ালসড়ক দিয়ে গাড়ি চলে না- নিন্দুকদের এমন দাবি অপপ্রচার। এই সড়ক উদ্বোধনের পর বহদ্দরহাটে যানজট কমেছে। কদমতলিতেও এখন যানজট নেই বললেও চলে। মুরাদপুর ফ্লাইওভার নির্মাণ শেষ হলে সেখানেও যানজট কমে যাবে। তাছাড়া এই উড়ালসড়কের কারণে নগরীর সৌন্দর্যও বেড়েছে’।

গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘কিছু ফি দিলে চুয়েট-বুয়েট নিজেদের অনুকূলে সমীক্ষা প্রতিবেদন দেয়। বহদ্দারহাট ও কদমতলি ফ্লাইওভারে তেমন গাড়ি উঠে না। গাড়ি না উঠলে তো এক পর্যায়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এগুলো ভেঙে ফেলতে হবে’।

তবে সংসদ সদস্য আফছারুল আমীন বলেন, ‘যেগুলো হয়েছে সেগুলো তো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলেই হয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তখন আমরা অনেকে মন্ত্রী ছিলাম, আবার অনেকে সংসদ সদস্য ছিলাম। তাই এর দায়ভার তো আমাদেরও নিতে হবে’।

অনুষ্ঠানে পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া অনুষ্ঠানে বলেন, ‘নগরীতে ফ্লাইওভারের দরকার নেই। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ঠিক করা হলে নগরের যানজট অনেকাংশেই কমে যাবে। এর জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করার প্রয়োজন নেই’।

তবে সুভাষ বড়ুয়ার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদ ওমর ইমাম। তিনি বলেন, ‘নগরে ব্যক্তিগত ও গণপরিবহনের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। আবার ধীরগতির যানবাহনের (বিশেষ করে রিকশা) কারণে সড়কের অন্য গাড়ির চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এসব কারণে ফ্লাইওভারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ফ্লাইওভার দিয়ে ধীরগতির যানবাহন চলাচল করতে পারে না’।

উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে নেতাদের দ্বন্দ্বে বিব্রত আওয়ামী লীগের কর্মীরা। তারা বলছেন, বিরোধী দল না থাকায় ক্ষমতাসীন দলের লোকজন নিজেরাই নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারে দিনের বেলায় অটোরিকশা, প্রাইভেট কার, ও কোন কোন ক্ষেত্রে মিনিবাস চলছে। রাতের বেলায় মালবাহী ট্রাক ও দূরপাল্লার বাসও চলে বলে জানান স্থানীয়রা।

মিনিবাস চালক আবদুল গফুর বলেন, ফ্লাইওভারটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের সঙ্গে শাহআমানত সড়কমুখী হওয়ায় যানবাহন কম চলে। কালুরঘাট সড়কমুখী হলে ব্যবহার বেশি হতো। তাছাড়া নির্মাণ চলাকালে দুর্ঘটনার কারণে এক ধরণের ভীতি কাজ করছে।

বহদ্দারহাট পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক ইকবাল হোসেন বলেন, ‘ফ্লাইওভারটি একমুখী। তাছাড়া দক্ষিণমুখ খোলামেলা হলেও উত্তরমুখ সরু। যেখানে গিয়ে আটকে যায় যানবাহন’।

চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব বেলায়েত হোসেন বলেন, যে বহদ্দারহাট ও কদমতলি ফ্লাইওভার থেকে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে গাড়ি ওঠা-নামার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। গাড়ি ওঠা-নামার ব্যবস্থা রাখা হলে যানবাহন চলাচল বেড়ে যেত।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রকৌশলী আমির হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ফ্লাইওভারগুলো যখন নির্মাণ করা হচ্ছিল তখন ছিল প্রয়োজনীয়তা। এখন যা বলা হচ্ছে, তা হচ্ছে চাহিদা। বহদ্দারহাট ফ্লাইওভারটি কালুরঘাট সড়কমুখী করা হলে সে চাহিদা পূরণ হবে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) সেখানে নতুন একটি র‌্যাপ নির্মাণ (শুধু নামার পথ) করার উদ্যোগ নিয়েছে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত