টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম, ০৩ এপ্রিল (সিটিজি টাইমস) :: চট্টগ্রামের জনস্বাস্থ্য দিনে দিনে অবনতির দিকে যাচ্ছে। অলিগলি থেকে শুরু করে অভিজাত রেস্টুরেন্টের খাবার নিয়েও ভোক্তাদের অসন্তুষ্টি। সবার একটাই উদ্বেগ খাদ্যের নামে কী খাচ্ছি আমরা। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মেয়াদোত্তীর্ণ পোড়া তেলে তৈরি ভেজাল খাদ্য খেয়ে ভোক্তাদের এ ধরনের প্রশ্ন। হোটেলে অস্বাস্থ্যকর ফ্রিজে একসঙ্গে রাখা হচ্ছে মাছ, মাংস, আটা-ময়দার খামি, পুরোনো নাশতা, কাঁচা সবজি তরকারি, আগের দিনের রান্না করা তরকারি। অভিজাত ফাস্টফুড দোকানে খেতে গেলেও একই সংশয়।

নিজেই ঘরে রান্না করে কিছু খাবেন, সে ব্যবস্থাও ত্রুটিপূর্ণ। অধিকাংশ মানুষকে রান্নার উপকরণ কিনতে হয় খোলাবাজার থেকে- যেগুলো ভেজালে ভরা। সরেজমিনে দেখা গেছে, গাছের গুঁড়ি ও ধানের কুঁড়ার সঙ্গে রং মিশিয়ে ধনেপাতা পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে, একইভাবে নিম্নমানের মেয়াদোত্তীর্ণ মরিচ, হলুদে নানা রং মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে রান্নার মসলা। খাতুনগঞ্জ, আসাদগঞ্জ, চাক্তাইসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এসব ভেজাল খাদ্যপণ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে।

চট্টগ্রামের মানুষের একটি প্রিয় খাদ্য হচ্ছে বিভিন্ন জাতের মাছের শুঁটকি। কিছুদিন আগে আসাদগঞ্জের শুঁটকিপল্লিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের ফলে জানা যায়, সংরক্ষণ ও পোকার আক্রমণ থেকে বাঁচাতে দীর্ঘদিন ধরে শুঁটকিতে কীটনাশক মেশানো হচ্ছে।

সম্প্রতি ভেজালবিরোধী অভিযানে পঞ্চাশেরও অধিক হোটেল, কুলিং কর্নার, মিষ্টি বিপণী, বেকারিকে জরিমানা করতে গিয়ে বের হয়ে আসে নগরের খাদ্য নিয়ে এরূপ অনিয়ম।

ভেজালবিরোধী অভিযানের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রুহুল আমিন এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ভেজাল ওষুধ অভিযানে অনিয়ম ধরতে গিয়ে চোখে পড়ল খাদ্যে আরও বেশি অনিয়ম।’

একইভাবে নগরের সবগুলো বাজার ফরমালিনমুক্ত করা নিয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক যোবায়ের আহমদের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে নিয়মিত মনিটরিং করা হয়, অনেক সময় জরিমানা করা হয়, তবে ফলের মধ্যে ফরমালিন টেস্ট করার মেশিনটি নিয়ে হাইকোর্টে রিট হওয়ায় আমরা এগোতে পারছি না।’

খাদ্যে ভেজালের কারণে ক্যানসার রোগের ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও বিভিন্ন চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে জানা যায়, বৃহত্তর চট্টগ্রামজুড়ে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ। সেই সঙ্গে প্রায় অর্ধ লাখ মানুষ প্রতিবছর নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে।

এ ছাড়া অনিরাপদ ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, দূষিত পরিবেশ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ও প্রকোপও বাড়াচ্ছে নগরে ব্যাপক হারে। এ ছাড়া মাত্রাতিরিক্ত যানজট, শব্দদূষণ, খোলামেলা স্থানের অভাব- সবকিছুই হাঁপিয়ে তুলছে নাগরিকদের।

নগরশিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। নিজেদের অজ্ঞতা, অসচেতনতা ও বিজ্ঞাপনের প্রলোভনে পড়ে এসব শিশুকে কেমিকেল, কালার, ফ্লেভারযুক্ত ম্যাঙ্গো, অরেঞ্জ, লেমন, স্ট্রবেরি, লিচি, অ্যাপেল ইত্যাদি নামে বিভিন্ন জ্যালি, চাটনি, ড্রিংকস কিনে দিচ্ছেন অভিভাবকেরা। নগরের স্কুলের সামনে ও বিভিন্ন ফুটপাতে বিভিন্ন মুখরোচক আচার-চাটনি খেতে তো রীতিমতো অভ্যস্ত শিক্ষার্থীরা। নামিদামি ব্র্যান্ডের আইসক্রিমের সঙ্গে বিক্রি হয় নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে তৈরি হওয়া নিম্নমানের আইসক্রিম। অভিযোগ আছে, এসব আইসক্রিমে উচ্চমাত্রায় ‘ঘনচিনি’ মেশানো হয়। ওয়াসার লাইনের পানি ও নোংরা বরফ দিয়ে এসব আইসক্রিম তৈরি হয়।

ইউএসটিসি হাসপাতালের শিশুবিভাগের বিভাগীয় অধ্যাপক ড. দিদারুল আলম বলেন, ‘দোকনের কেমিকেল ও ফ্লেভারযুক্ত নানা চটকদার খাদ্য খাওয়ার কারণে সাধারণ খাবারের প্রতি শিশুর ক্ষুধা নষ্ট হয়, যার ফলে শিশুর পুষ্টি আহরণ বাধাগ্রস্ত হয়।’

এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বন্দরনগরীতে প্রতিদিন নিরাপদ খাওয়ার পানির চাহিদা ৫ লাখ ৭০ হাজার লিটার এবং এই চাহিদার একাংশ পূরণের জন্য গড়ে উঠেছে প্রায় ১০০টি ড্রিংকিং ওয়াটার ম্যানুফ্যাকচারার্স কোম্পানি। কিন্তু এসবের মধ্যে মাত্র ২০টি প্রতিষ্ঠানের বিএসটিআই লাইসেন্স আছে। সরাসরি ওয়াসার পানি জারে ঢুকিয়ে দেওয়া, নোংরা-অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পানি সংরক্ষণ, ইত্যাদি ছাড়াও নানা অভিযোগ রয়েছে অধিকাংশ কোম্পানির বিরুদ্ধে। নিরাপদ পানি পান করার জন্য অনেকেই এসব জারের পানির ওপর নির্ভর করে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে এসব অনিরাপদ পানি সেবনকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে ফ্লাইওভার ও রাস্তা নির্মাণের কারণে ধুলাবালুতে প্রায় আচ্ছন্ন থাকে নগরের অধিকাংশ সড়ক। পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ক্লিন এয়ার অ্যান্ড সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট (কেস) প্রকল্পের আওতায় দেশের ১১টি কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন বাতাসের মান পরীক্ষা করে দেখা হয়। এর মধ্যে চট্টগ্রাম শহরের আগ্রাবাদ ও খুলশী এলাকায় রয়েছে পৃথক দুটি স্টেশন। বাতাসের মান পরীক্ষায় পাওয়া তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম শহরের বাতাস এতই দূষিত যে এখন মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

 পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রামের পরিচালক মো. আজাদুর রহমান মল্লিকের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি জানান, নগরে বায়ুদূষণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি কলকারখানা, বিশেষ করে স্টিল মিল ও ইন্ডাস্ট্রি, সেই সঙ্গে অতিরিক্ত যানবাহনকে দায়ী করেছেন। কিছু স্টিল মিলের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও ম্যাজিস্ট্রেট না থাকার কারণে যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো যাচ্ছে না বলে তিনি জানান।

মতামত