টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

ইডেনে আজ ভারত-পাকিস্তান মহারণ

চট্টগ্রাম, ১৯ মার্চ (সিটিজি টাইমস) ::  ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের বাকি আর মাত্র কয়েকঘন্টা। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। একদিকে প্রথম ম্যাচে জয়ে আত্মবিশ্বাসী আফ্রিদি বাহিনী। অন্যদিকে প্রথম ম্যাচে পরাজয়ে বাড়তি চাপে রয়েছে স্বাগতিক ভারত।

আজ আরো একবার বারুদগন্ধী সেই ম্যাচের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বিশ্ব ক্রিকেট। সেই উত্তেজনা, উত্তাপ অনুরণিত হচ্ছে সর্বত্র। এই তো কয়েকদিন আগে মিরপুরে লড়েছিল দুই দল। তিন সপ্তাহ যেতে না যেতেই আবারো একে অপরের সামনে। দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবারো বাজাচ্ছে মহারণের দামামা। আজকের মঞ্চ উপমহাদেশীয় ক্রিকেটের নন্দনকানন ইডেন গার্ডেন্স। চারদিকে একটাই রব_ ইডেন আজ কার?

সব ফরম্যাট মিলেই ভারত পাকিস্তানের চেয়ে মোট লড়াইয়ে অনেক পিছিয়ে। তবু ফরম্যাটগুলোর আগে বিশ্বকাপ শব্দটা বসিয়ে দিলে পাকিস্তান যোজন যোজন পিছিয়ে পড়ে।

আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপের কোনো লড়াইয়েই ভারতের সঙ্গে পারেনি পাকিস্তান! ওয়ানডে বিশ্বকাপে হেরেছে ছয়বার। টি-টোয়েন্টিতে বিশ্বকাপে চারবার। ওয়ানডে ফরম্যাটে তবু মোট লড়াইয়ে পাকিস্তান এগিয়েই আছে।

কিন্তু ফরম্যাট পাল্টে যখন খেলাটা টি-টোয়েন্টি হয়ে যায়, তখন বিশ্বকাপ আর যে কোনো লড়াই প্রায় সবই সাম্যাবস্থায় বিরাজ করে। এখানে ভারত পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়েই। সব ফরম্যাটের সামগ্রিক বিবেচনায় পাকিস্তান অবশ্য ৮৪-৬৫ ব্যবধানে ভারতের চেয়ে ঢের এগিয়ে।

টেস্টে পাকিস্তান ১২-৯ ভারত, ওয়ানডেতে পাকিস্তান ৭২-৫১ ভারত। কিন্তু শুধু টি-টোয়েন্টি-তে যে ভারত ৫-১ ব্যবধানে পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে!

কলকাতার ইডেন গার্ডেনে আজকের ম্যাচকে ঘিরে পুরো শহর উত্তাল হয়ে উঠেছে।

নিরাপত্তার কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটি প্রায় শেষ মুহুর্তে ধর্মশালা থেকে কলকাতায় সরিয়ে আনতে হয়েছে – কিন্তু বিশ্বকাপের এই বাড়তি পাওনাটাই যেন কলকাতাকে ওই ম্যাচের একটা টিকিটের জন্য পাগল করে তুলেছে।

ইডেনের কর্মকর্তারা টিকিটের দাবি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন, ওদিকে স্টেডিয়াম-টিম হোটেল থেকে শুরু করে শহরের আনাচ-কানাচ ঘিরে দেওয়া হয়েছে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায়।

ইডেন গার্ডেন থেকে ঢিলছোঁড়া দূরত্বে গঙ্গার ধারে কলকাতার বাবুঘাট। সেই ঘাটের ধারে, স্টেডিয়ামের আশেপাশে সর্বত্র ছোট ছোট জটলা – শনিবার সন্ধ্যার ম্যাচের একটা টিকিটের জন্য চরম আকুলিবিকুলি।

উড়ো গুজবের পেছনে বিস্তর ছোটাছুটি করে অনেকেই নিরাশ হচ্ছেন – কিন্তু যারা টিকিট পেয়েছেন আর যারা পাননি, সবাই বলেন এই পাগলামি কলকাতাকেই মানায়।

কোনোক্রমে টিকিট জোগাড় করতে পারা এক যুবক বলেন, ‘দেখুন এটুকু তো হবেই। সত্তর হাজার আসনের স্টেডিয়াম, এমন কী লক্ষ লোক বসার ব্যবস্থা থাকলেও তাতেও দেখতেন সামাল দেওয়া যেত না – কলকাতায় ক্রিকেট এতটাই জনপ্রিয়।’

তবে মহামেডান স্পোটিং মাঠের কাউন্টার, যেখান থেকে সামান্য কিছু টিকিট বিলি করা হচ্ছিল, অনেককেই দেখা গেল টিকিট যেভাবে বিক্রি করা হয়েছে তার পদ্ধতি নিয়ে প্রবল ক্ষুব্ধ।

ইডেন গার্ডেনের মালিকানা যাদের, সেই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গল বা সিএবির নতুন সচিব হয়েছেন অভিষেক ডালমিয়া, প্রয়াত জগমোহন ডালমিয়ার ছেলে। এই বিরাট ম্যাচের আগের দিন তিনি বলছিলেন – ‘দুশ্চিন্তার কিছু নেই, দেখবেন ইডেন ঠিক আবার বাজিমাত করবে’।

অভিষেক ডালমিয়ার বলেন, ‘ইডেন তো আগে বিশ্বকাপের ফাইনালও আয়োজন করেছে। এমন তো নয় যে আগে আমরা এত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ করিনি। ফলে এবারেও দেখবেন, দর্শকরা দারুণ একটা ম্যাচ উপহার পাবেন।’

কলকাতার একটা বৈশিষ্ট্য হলো, শোয়েব আখতার, ইমরান খান বা আসিফ ইকবালের মতো পাকিস্তানি ক্রিকেট তারকারাও এ শহরে যে পরিমাণ ভালবাসা পেয়েছেন তা ভারতের অন্য কোনো শহরে বোধহয় ভাবাই যায় না।

বর্ষীয়ান পাকিস্তানি ক্রিকেট সাংবাদিক আবদুর রশিদের তাই বলতে দ্বিধা নেই, পাকিস্তানের জন্য ভারতে এর চেয়ে ভাল মাঠ বোধহয় কিছু হতেই পারত না।

তিনি বলেন, ‘এটা পাকিস্তানের জন্য খুব পয়া মাঠ। চার চারবার ভারতকে তারা ওয়ানডেতে এখানে হারিযেছে। হ্যাঁ, বিশ্বকাপে আমরা কখনো ওদের হারাইনি ঠিকই, কিন্তু কে বলতে পারে পয়া ইডেনেই আমাদের কপাল খুলে যাবে না? আর তা ছাড়া এ মাঠের মেজাজটাই আলাদা, দর্শক এখানে ক্রিকেটের সমঝদার, এ মাঠের একটা ইতিহাস আছে, ঐতিহ্য আছে।’

আবদুর রশিদ যেটাকে ক্রিকেটের জন্য ভালবাসা বলছেন, ইডেনের প্রধান প্রবেশপথের সামনে দুই প্রবীণ সিএবি সদস্য – যারা পঞ্চাশ বছর ধরে এ মাঠে খেলা দেখতে আসছেন তারা আবার বাঙালির আবেগ বলেই এটাকে বর্ণনা করতে চান।

এম এন ভৌমিক ও পিএন ঘোষ নামে সিএবির ওই দুই ভেটারেন বলছিলেন, ‘টিকিটের জন্য এমন হুড়োহুড়ি তো কলকাতাতেই হবে। কারণ বাঙালি খেলা আর মেলা নিয়েই বুঁদ হয়ে আছে। আর পাকিস্তান ম্যাচ তো আলাদা জিনিস!’

বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ নিয়ে একটা কথা খুব বলা হয়, এই ম্যাচে জিতলে তারপর বিশ্বকাপ হারলেও কোনো দুঃখ নেই। ম্যাচের একটা টিকিট যারা বগলদাবা করতে পেরেছেন, তাদের মধ্যে আজ প্রায় সেই বিশ্বজয়ের অনুভূতি।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ক্রিকেট সাংবাদিক শমীক চক্রবর্তী বলেন, ‘সেই ১৯৮৭তে বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ফাইনাল ইডেনে হবে কলকাতা সেই আশা করে বসেছিল। কিন্তু সে বার অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্সে দুটো দলই সেমিফাইনালে হেরে যায়। আর তার প্রায় তিরিশ বছর পর আজ ইডেনের স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে, বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে এ মাঠে মুখোমুখি হচ্ছে দুটো দেশ।’

চক্রবর্তী অবশ্য মনে করেন, ভারত ও পাকিস্তান দুটো দলেরই পরস্পরের প্রতি ভাল শ্রদ্ধা আছে। মাঠে অল্পস্বল্প ঝগড়াঝাঁটি হলেও দুদলই খেলার স্পিরিট বজায় রেখে চলবে বলেই তার বিশ্বাস এবং ইডেন শেষ পর্যন্ত একটা দারুণ ম্যাচ উপহার পাবে।

কোনো সন্দেহ নেই ইডেন গার্ডেন একটা অসম্ভব উপভোগ্য ম্যাচ দেখার জন্য মুখিয়ে আছে – কিন্তু মাঠের লড়াই শুরু হওয়ারও অনেক আগে কলকাতার আরো বড় লড়াই শুরু হয়ে গেছে – আর তা হল টিকিট জোগাড়ের লড়াই!

ভারত দল (সম্ভাব্য)
শিখর ধাওয়ান, রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, সুরেশ রায়না, যুবরাজ সিং, হার্দিক পাণ্ডে, এমএস ধোনি (অধিনায়ক ও উইকেট রক্ষক), রবীন্দ্র জাদেজা, রবিচন্দ্রন অশ্বিন, আশিষ নেহরা এবং যশপ্রিত বুমরাহ।

পাকিস্তান (সম্ভাব্য)
সারজিল খান, আহমেদ শেহজাদ, মোহাম্মদ হাফিজ, শরফরাজ আহমেদ (উইকেট রক্ষক), শোয়ব মালিক, উমর আকমল, শহীদ আফ্রিদি (অধিনায়ক), ইমাদ ওয়াসিম, মুহাম্মদ আমির, ওয়াহাব রিয়াজ, মুহাম্মদ ইরফান।

মতামত