টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

পারিবারিক বিরোধে প্রবাসীর স্ত্রী খুন!

khচট্টগ্রাম, ০৭  মার্চ (সিটিজি টাইমস) ::  ‘রাত ৯টায় গৃহশিক্ষক চলে যাওয়ার পর দরজা খোলা ছিল। আমি টেবিলে বই-খাতা গুছিয়ে রাখছিলাম। হঠাৎ তিনজন অপরিচিত লোক দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে যায়। তারা ঢুকেই ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়। আম্মা চিৎকার করলে তিনজন তাকে বেডরুমে নিয়ে বিছানায় ফেলে একজন দুই পা, একজন দুই হাত ও একজন মুখ চেপে ধরে। পরে একজন আমাকে ধরে বাথরুমে নিয়ে যায়। আমার গলা টিপে ধরে বলে আমাদের যত স্বর্ণ আছে সব দিয়ে দিতে। এরপর আমাকে বেডরুমে নিয়ে স্টিলের আলমারি ভেঙে স্বর্ণালঙ্কার, মোবাইল, টাকা নিয়ে নেয়। আম্মা বারবার চিৎকার করায় আরেকজন তার মুখের ওপর চেপে বসে। একসময় আম্মার চিৎকার বন্ধ হয়ে যায়। ওরা আমার গলাও চেপে ধরে খামচে দেয়। তারা চলে যাওয়ার সময় বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে দেয়। আম্মাকে ডাকার পরও সাড়াশব্দ না পেয়ে পরে আমি জোরে চিৎকার করে দরজায় ধাক্কা দিতে থাকি। আমার জ্যাঠাতো ভাই মামুন এসে দরজা খুলে দেন।’

গত শনিবার রাতে বাসায় ডাকাতি ও পালক মা পারভিন আক্তারের (৩৬) খুনের ঘটনার বর্ণনা এভাবেই দেয় পঞ্চম শ্রেণী পড়ূয়া নুর মোহাম্মদ সাঈদ (১১)। চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানার রৌফাবাদ বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির ১৩ নম্বর রোডের ৩৮ নম্বর প্লটে খাতুন ভিলায় এ ঘটনা ঘটে।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার সাদেকনগর গ্রামের দুবাই প্রবাসী নুরুল আলমের স্ত্রী পারভীন থাকতেন স্বামী ও ভাশুরের মালিকানাধীন খাতুন ভিলার তৃতীয় তলায়। দ্বিতীয় তলায় তার ভাশুর মোহাম্মদ শুক্কুর থাকেন পরিবার নিয়ে। সাঈদ স্থানীয় হলি চাইল্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র। তাকে শিশু বয়সেই দত্তক নেন পারভিন আক্তার ও তার স্বামী। ১৯৯৭ সালে বিয়ে করার পর সন্তানহীন এ দম্পতি তাকে নিজের সন্তানের মতোই লালন-পালন করতেন। সাঈদ বর্তমানে বায়েজিদ বোস্তামী থানা হেফাজতে আছে।

থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহসিন বলেন, ‘রাত ১১টার দিকে পারভিনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ রাত ১২টায় খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায়। পারভিনের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে রাখা হয়েছে।’

সরেজমিনে খাতুন ভিলার পারভিনের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, দুটি বেডরুমেই বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলোভাবে পড়ে আছে। পাশের তিন ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা জানান, তারা কোনোকিছুই টের পাননি। ভবনের দারোয়ান বাসেত আলী বলেন, ‘আমাকে শুক্কুর ভাইয়ের মেয়ে দোকানে পাঠিয়েছিল। দোকান থেকে ফিরে ভাত খেয়ে বাথরুমে যাই। বাথরুম থেকে বের হয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে তিনতলায় উঠি। তখন বিষয়টি জানতে পারি। ততক্ষণে পারভিনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।’

ঘটনাস্থলে সিআইডির ক্রাইম সিনের পরিদর্শক আবদুর রহমান বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছি। উদ্ধারকৃত আলামতগুলোর মধ্যে একটি ক্যাপও পাওয়া গেছে, যা ওই বাসার কারও নয়।’

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা বায়েজিদ বোস্তামী থানার সেকেন্ড অফিসার উপপরিদর্শক ওমর ফারুক বলেন, ‘সাঈদের জ্যাঠাতো ভাই মামুনের কয়েকজন বন্ধু বেড়াতে এসেছিল রাতে। আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, তারা ঘটনার আগেই ওই বাসা থেকে চলে যায়। রাস্তার সিসি ক্যামেরা, বাসার গেট ও কলাপসিবল গেটে লাগানো সিসি ক্যামেরার ফুটেজে কিছু ক্লু পাওয়া গেছে।’ প্রাথমিকভাবে ডাকাতির সময় হত্যাকাণ্ড মনে হলেও পারিবারিক বিরোধ কিংবা অন্য কোনো কারণে এ ঘটনা ঘটেছে কি-না খতিয়ে দেখছে পুলিশ। আবদুস শুক্কুরের ছেলে আবদুল্লাহ আল মামুন (২৫) এবং গৃহশিক্ষক জনি প্রকাশ জয়সহ (২৪) চারজনকে বায়েজিদ থানায় জিজ্ঞাসাবাদ করছে বায়েজিদ থানা পুলিশ।

ছয়তলা ওই ভবনের বাসিন্দারা জানান, তিনতলায় পারভিন আক্তার যে তলায় থাকেন সেই তলার তিনটি ফ্ল্যাটের মালিক পারভিনের স্বামী। তারা পারভিনের কাছেই ভাড়া দেন। বাকি সব ফ্ল্যাটের ভাড়া তোলেন আবদুস শুক্কুরের ছেলে। নুরুল আলমের দুবাইয়ে ব্যবসা আছে। বছরে দু’বার তিনি দেশে আসেন। সর্বশেষ চার মাস আগে এসেছিলেন। সম্পত্তি নিয়ে দুই ভাইয়ের পরিবারের মধ্যে বিরোধ আছে কি-না_ এমন ব্যাপারে ভবনের দারোয়ান কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। আবদুস শুক্কুরের ছেলে আবদুর রহমান মাসুদ বলেন, ‘সম্পত্তি নিয়ে তাদের কোনো বিরোধ নেই। এটা ডাকাতির ঘটনা। এর বেশি কিছু নয়।’ তবে মাসুদ প্রথমে গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ঘটনার পর তিনিই প্রথম দরজা খুলে ভেতরে ঢোকেন। কিন্তু সাঈদের বর্ণনা অনুযায়ী মামুন দরজা খুলেছিলেন।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (পাঁচলাইশ) আসিফ মহিউদ্দিন বলেন, ‘আলামত দেখে ডাকাতি বলে সন্দেহ হচ্ছে। তবে আমরা সন্দেহের তালিকায় কয়েকজনকে রেখেছি। অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ও থাকতে পারে।’ এদিকে গতকাল রোববার সকাল থেকে সিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের পুলিশের একটি টিমও তদন্তে নেমেছে। টিমের সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

গোয়েন্দা বিভাগের উপপরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা বলেন, ‘ঘটনাটি কি নিছক ডাকাতি, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য আছে, সেটা আমরা খতিয়ে দেখছি।’

এ ঘটনায় বায়েজিদ বোস্তামী থানায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। নিহতের স্বামী নুরুল আলম ঘটনা শুনে দুবাই থেকে রওনা দিয়েছেন বলে জানায় সাঈদ। তিনি এসে মামলা দায়ের করবেন বলে জানান ওসি মহসিন।-সমকাল

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত