টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

দৃষ্টিজুড়ে বিশ্বকাপ: যাদের নিয়ে স্বপ্ন

চট্টগ্রাম, ০৪ মার্চ (সিটিজি টাইমস) :  ক্রিকেট দুনিয়া ঘিরে দিন দিন বেড়ে উঠছে লাল-সবুজ স্বপ্নের পরিধি। স্বর্ণসোপান বেয়ে বিজয়ের সূর্য উজ্জ্বলতর হচ্ছে দিন দিন। তাই মাঠের টাইগার-ক্রিকেটার আর বাইরে দর্শক-ক্রিকেটারের চেতনা এক বিন্দুতে লীন। দিন শেষে পাঁচ টাকার নোট গুনতে গুনতে যাদের ঘুমের সময় চলে আসে, তারাও জগতের অমোঘ হিসাব ভুলে ওই স্বপ্নের পরিধি ঘিরে উল্লাসে মেতে ওঠেন।

বুধবার এমনই এক জাতীয় ঐক্যের উচ্ছ্বাস-জোয়ার বয়ে গেছে গোটা বাংলাদেশে। উদ্বেগ-উত্তেজনা, অনিশ্চয়তা আর সম্ভাবনার বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে যে উচ্ছ্বাসের সাগরে অবগাহন, তাতে যেমন আনন্দাশ্রু মুছেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তেমনি স্লোগান তুলে রাস্তায় নেমেছেন খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষটিও।

ফাইনালে রবিবার ভারতের বিপক্ষে কী হবে, সেটা তোলা থাকল আরেকটি রাতের হাতে। তার আগে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ঘিরে অনেক প্রত্যাশা জমা হচ্ছে ক্রিকেটাঙ্গনে। সেই প্রত্যাশার শতরঞ্জিতে আছে এমনকি বিশ্বকাপের (চ্যাম্পিয়ন) আলপনাও। যারা পর পর ম্যাচে শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানের মতো সাবেক ক্রিকেট বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের হারাতে পারে, তাদের জন্য বিশ্বকাপ জেতা কি কঠিন কাজ? প্রশ্নটা কিন্তু এখন এক পাশে সরিয়ে রাখাই যায়।

যে দলে আছে মাশরাফির মতো পাঞ্জেরি, যাদের বোলার বহরে তিন-চারটা বিশ্বমানের পেসার-কামান আছে, যেখানে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার বেড়ে ওঠে, ইংরেজকুল থেকে ক্লাবকর্তারা যে দেশের ‘বিস্ময় বালক’কে দলে ভিড়িয়ে ‘গর্বিত’ হয়, তাদের বিশ্বকাপ জয় করা কষ্টকল্পনা হওয়ার কথা নয়। তার পরও যদি কোনো সংশয় থাকে, তা এখন এক পাশে সরিয়ে রাখা যায়!

মাশরাফি- স্বপ্ন দেখানোর পাঞ্জেরি

‘জয় আসবার কত দেরি পাঞ্জেরি?’- মাশরাফি মাঠে নামার আগ পর্যন্ত মিরপুর মগ্ন এই চিন্তায়। ‘এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে’-পরিস্থিতি ঠিক যেন এমন। তার জায়গায় নামার কথা ছিল মিথুনের। ম্যাচের অবস্থা গুরুতর। নবাগতকে না পাঠিয়ে নিজের কাঁধেই তুলে নিলেন দায়িত্ব। মাঠে নামার সময় ফিল্ডারদের পজিশন দেখে নিলেন। ক্রিজে দাঁড়িয়ে পরপর দুই বলে দুটি চার মেরে বুঝিয়ে দিলেন কেন তিনি আগে নামলেন। প্রথম শটটা পোড় খাওয়া ব্যাটসম্যানের প্রতিচ্ছবি। দ্বিতীয় শটকে আন্দাজ কিংবা গা বাঁচানো বললে আপনার ক্রিকেট জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। অমন বাউন্সারে ব্যাট ছুঁয়ে দিয়েছেন। পজিশন দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় টার্গেট ছিল ফাইন লেগ। নামতে নামতে দেখে নিয়েছিলেন ওখানে খালি। আর আমির শেষ দিকে বাউন্সার দিতে চাইবে, সেটা তো স্বাভাবিক। সব মিলিয়ে মাশরাফি চারে-চারে আট করে ফেলেন। ততক্ষণে পাকিস্তানের যা বোঝার, তা বোঝা হয়ে যায়। এই দুই চারই যে টার্নিং পয়েন্ট হবে সেটা মনে হয় আমিরও বুঝতে পেরেছিলেন। না হলে সমস্ত রাগ পা দিয়ে ওভাবে মাটির ওপর ঝাড়বেন কেন তিনি! সেই সঙ্গে আফ্রিদি আবার দলে জায়গা পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় পড়ে গেলেন। দুই অধিনায়কে কী ‘সুন্দর’ পার্থক্য। একজন বিপদের সময় ব্যাটিং লাইনআপে উপরে না উঠে প্যাড পরে অপেক্ষায় রইলেন। বল হাতে আবার শেষ দিকে ফুলটস দিলেন। অদ্ভুতভাবে একজনকে ‘কাউকর্নার’ থেকে ডিপে নিয়ে গেলেন। এভাবে ম্যাচের বারোটাই বাজিয়ে দিলেন।

অন্যদিকে আরেকজন যা যা করলেন তার সবটাই কাজে লাগল। এমন একজন অধিনায়ক টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ পর্যন্ত ফিট থাকলে শিরোপা জিততে আর কী লাগে!

মুস্তাফিজ- নাম শুনে যার আশা জাগে

বালকের কথা কিছু বলার নেই। চিন্তা শুধু একটাই-মাশরাফির রোগ তার শরীরে জেঁকে বসছে না তো! হরহামেশা ইনজুরি। এই নিয়ে টানা দুই সিরিজে মাঝপথে মাঠের বাইরে যেতে হলো তাকে। জিম্বাবুয়ে সিরিজে ইনজুরিতে পড়ার পর বিশ্রামে পাঠানো হয়। এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কা ম্যাচে আবার সেই অবস্থা। ভারতের বিপক্ষে উইকেট না পেলেও পরের দুই ম্যাচে ঠিকই নিজের জাত চেনান। ক্রিকেট খেলায় ফর্ম বলে একটা কথা আছে, সেই জিনিসটা ২০ বছরের এই তরুণের কাছে গৌণ। মুখ্য শুধু ফিট থাকা। খেলতে পারলে যে কোনো দলের ঘুম হারাম হবে, এ কথা হলপ করে বলে দেয়া যায়। ইনজুরিতে থাকা অবস্থায় ইংল্যান্ড থেকে সুখবর শুনেছেন। ঐতিহ্যবাহী সাসেক্স কাউন্টি দলে নাম লিখিয়েছেন। বিশ্বকাপের পরপরই দেশটিতে উড়াল দেয়ার কথা। সবকিছু যেন ঠিকঠাক থাকে।

রিয়াদ: আবার ভরসার নাম

বিশ্বকাপে জোড়া সেঞ্চুরি করে আসার পরও তার ওপর কেউ বাজি ধরতে চাইতেন না। বিপিএল থেকে ধারাবাহিকতার ¯্রােতে ভাসছেন। তবু কিছুটা চিন্তা ছিল। জাতীয় দলে এলে ছন্দ ধরে রাখতে পারবেন তো? সেই রিয়াদ এশিয়া কাপের প্রতিটি ম্যাচে টুকটুক করে যা করছেন, তা ওই সঞ্জীবনী সুধার মতো। বিশ্বকাপেও তাকে ঘিরে স্বপ্নরা ভিড় করবে, এটাই স্বাভাবিক।

আল-আমিন, তাসকিন: তাক লাগানোর তুফান

বাংলাদেশের স্পিন ঐতিহ্য ঢাকা পড়ে যাচ্ছে এদের কারণেই। মুস্তাফিজ, মাশরাফি, রুবেলের সঙ্গে তারা দুজন পেস আক্রমণের প্রধান ঘোড়া। রুবেল ইনজুরির কারণে বাইরে আছেন। দলে ফিরলে শক্তি বাড়বে, সন্দেহ নেই। তার অনুপস্থিতিতে আল-আমিন আর তাসকিন যেভাবে তোপ দাগছেন, হাথুরুসিংহের স্বস্তি তো পাওয়ারই কথা। আল-আমিনের বাউন্সার, সঙ্গে হালকা সুইং। তাসকিনের গতি, ভারত-বাংলাদেশ মিলিয়েও এ যাবৎকালে যা আগে দেখা যায়নি। সুতারং ভয় কী!

সাকিব-মুশফিক: ছন্দে ফেরার অপেক্ষা

সাকিবকে নিয়ে চিন্তার আকাশটা ক্রমে বড় হচ্ছে। শারীরিক ভাষাটা ঠিক আগের মতো নেই। যে শটে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে শিরোপা এনে দিয়েছিলেন, সেই শট পাকিস্তানের বিপক্ষে দুবার খেলেও নাগাল পেলেন না। দ্বিতীয়বার তো আউটই! রান না পাওয়াটা চিন্তার কিছু নয়। আউট হয়ে যেভাবে হতাশায় ভেঙে পড়ছেন, সেটাই ভাবাচ্ছে। তার মানের খেলোয়াড় যখন এভাবে ভেঙে পড়েন, তখন বুঝতে বাকি থাকে না তাল কাটার মাত্রা কতখানি। মুশফিকের অবস্থা সাকিবের মতো অতটা চিন্তার নয়। উইকেটের পেছনে বরং আগের চেয়ে সাবলীল মনে হচ্ছে। ব্যাট হাতে অবশ্য নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারছেন না সেই বিপিএল থেকে। পাকিস্তান প্রিমিয়ার লিগেও খুব একটা ভালো করতে পারেননি। সাকিবের সঙ্গে তার জুটি দেশসেরা। আগেও অনেকবার দুজনের ব্যাট হেসেছে সময়ের ব্যবধানে। বিশ্বসেরারা নাকি সবাইকে অবাক করে ফিরে আসেন, জয়ধ্বনি করতে করতে। বাংলার ক্রিকেট ইতিহাসের সুবর্ণ মহলে চোখের পলকে ফিরবেন তারা, পরিচিত কোনো ফুলের রেণু থেকে জনে জনে রটে যাবে সেসব অলিখিত আনন্দ-উপাখ্যান। অপেক্ষায় গোটা দেশ!

মতামত