টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

সীতাকুন্ডে পরকিয়া এবং সম্পদ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে স্বামীকে খুন, ৪ মাস পর লাশ উদ্ধার

2চট্টগ্রাম, ০৩ মার্চ (সিটিজি টাইমস) :  নিখোঁজ হওয়ার চারমাস পর চট্টগ্রামের শিপব্রেকিং ব্যবসায়ি মোহাম্মদ সেলিম (৪২) এর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

বৃহস্পতিবার বিকাল চারটায় ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে সীতাকুন্ডের পন্থিছিলা স্কুলের পাশের একটি পুকুর পাড়ের মাটির নীচ থেকে সেলিমের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

সীতাকুন্ড থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ইফতেখার হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, স্ত্রী শাহনাজের প্রেমিক রাসেলের স্বীকারোক্তি মতে নিখোঁজ ব্যবসায়ি সেলিমের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে।

নিহত সেলিমের স্বজনরা জানান, স্ত্রীর পরকিয়া আর সম্পদ দুটোই কাল হয়ে দাড়িয়েছিল সেলিমের জীবনে। স্ত্রীর পরকিয়া জেনে যাওয়ায় এবং সেলিমের সম্পদ হাতিয়ে নিতে প্রথম স্ত্রী প্ররোচনায় প্রেমিককে দিয়ে খুন করায় স্বামী সেলিমকে। নিখোঁজের চার মাস পর পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে সেলিমকে হত্যা করা হয়েছে।

তবে এ হত্যাকাণ্ডের সাথে নিজের ছেলে টিপুর সম্পৃক্তা রয়েছে বলেও জানা গেছে। সীতাকুন্ড থানার এয়াকুব নগর বটতল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত সেলিমের বাড়ী নগরীর ডবলমুরিং মনসুরাবাদ এলাকায় তার পিতার নাম নবী ফকির। সীতাকুন্ডের এয়াকুবনগরে বাড়ী করে সেখানে প্রথম স্ত্রীসহ থাকতেন তিনি।

স্বামীকে খুন করানোর পর রীতিমত থানায় নিখোঁজ ডায়রী করে নিজেকে সন্দেহের আড়াল করার চেষ্টা করেছিল স্ত্রী শাহনাজ। ইতোমধ্যে সেলিমের দুটি গাড়ী নিজের ভাইয়ের নামে করে নিয়েছে স্ত্রী শাহনাজ। নিখোঁজের পর পুলিশী তদন্তে এসব তথ্য বেরিয়ে আসে বলে জানান মামলা তদন্ত কর্মকর্তা।

সেলিমের বড় ভাই আবদুল গফুর বাবুল জানান, জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে মৃত্যুর আগে সীতাকুণ্ড থানা সাধারণ ডায়রি করেছিল আমার ছোট ভাই। এ জিডির তদন্ত হলে হয়তো আমার ভাইকে প্রাণ দিতে হতো না।

তিনি বলেন, গত বছরের ২০ অক্টোবর একটি সাধারণ ডায়রি করেছিলেন সেলিম। কিন্তু উক্ত ডায়রীর বিষয়ে পুলিশের রহস্যজনক নীরবতা পালন করে পুলিশ।

আবদুল গফুর বাবুল আরো জানান, শীপ ইর্য়াডের স্ক্র্যাপের ব্যবসা করতো সেলিম। শহর এবং সীতাকুণ্ড কেন্দ্রিক ছিল তার ব্যবসার পরিধি। গত ২২/২৩ বছর আগে সীতাকুণ্ডের এয়াকুব নগর এলাকার মেহেরুল্লার মেয়ে শাহনাজকে বিয়ে করে সেলিম। তাদের সংসারে ১৯ বছরের একটি ছেলে ও ১৩ বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। এ ছাড়া গত ৭ বছর আগে কুমিল্লার চাঁদপুর থেকে রাহেনা নামের আরেক জনকে বিয়ে করে সেলিম। দ্বিতীয় সংসারে একটি ৬ বছরের ছেলে সন্তান রয়েছে। কিন্তু তবুও সুখেই চলছিল তাদের সংসার।

এক সময়ের ভবঘুরে সেলিমের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়ে যায়। প্রথম স্ত্রী শাহনাজ থাকত সীতাকুণ্ডের বাসায় আর দ্বিতীয় স্ত্রী রাহেনা নগরীর মনসুরাবাদের সিএন্ডবি কলোনীর বাসায়। সেলিম প্রতি সপ্তাহে তিন দিন প্রথম স্ত্রীর কাছে থাকতেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে স্ক্র্যাপ ব্যবসা করে কোটি টাকার মালিক হয়ে যায় সেলিম। নিজের নামে গাড়ী ও জমি ক্রয় করে সীতাকুণ্ডে।

তবে সেলিমের দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নেয়নি প্রথম স্ত্রী শাহনাজ। এরই মধ্যে প্রথম স্ত্রী শাহনাজের সাথে স্থানীয় রাসেল নামের এক যুবকের পরকিয়া প্রেম শুরু হয়। এক পর্যায়ে স্ত্রীর পরকিয়া ধরা পড়ে সেলিমের চোখে। নানাভাবে বোঝাতে থাকে স্ত্রীকে। কিন্তু তাতে কোন কাজ হয়নি। বরং হিতে বিপরীত দেখা দেয়। স্ত্রী শাহনাজ তা তার প্রেমিক রাসেলকে বলে দেয়।

বড় ভাই গফুর বলেন, এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর রাসেল সেলিমকে নানা ভাবে হুমকি ধমকি দিতে থাকে। ১৮ অক্টোবর সেলিমের সীতাকুণ্ডের বাড়ীতে কে বা কারা রাতের আধাঁরে আগুন লাগিয়ে দেয়। নিখোঁজ হওয়ার আগ পর্যন্ত অনেকটা সন্ত্রস্ত ছিলেন সেলিম। তাই জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে গত বছরের ২০ অক্টোবর সীতাকুন্ড থানায় একটি সাধারণ ডায়রী করেন তিনি।

এর ৮ দিন পর ২৯ অক্টোবর থেকে নিখোঁজ হন সেলিম। ৩১ অক্টোবর তার প্রথম স্ত্রী শাহনাজ সীতাকুণ্ড থানায় একটি নিখোঁজ ডায়রী করে। কিন্তু সেলিমের স্ত্রীর সাথে কোন এক গোপন সমঝোতার কারণে সে জিডির অগ্রগতি হয়নি। স্বামী নিখোঁজ হলেও তখনও স্বাভাবিক ছিল প্রথম স্ত্রী শাহনাজ। নিজে একবারও কোথাও খোঁজ নেননি স্বামীর। গত চার মাস ধরে তার পক্ষ থেকে কোন সহযোগিতা পায়নি সেলিমের পরিবার।

আবদুল গফুর বাবুল জানান, সেলিম নিখোঁজ হওয়ার পর মামলা করার জন্য সীতাকুণ্ড থানায় গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। বলেছে রাসেল খুব প্রভাবশালী। তার বিরুদ্ধে মামলা নেয়া যাবেনা। এ ছাড়া সেলিমের স্ত্রী শাহনাজের কথাবার্তা এবং গতি বিধি সন্দেহজনক মনে হয়। সেলিমের বিষয়ে কোন কথা বলতে চাইলে সে রেগে যেত। এক পর্যায়ে তাকেও এ নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে নিষেধ করে।

জানাগেছে গত বছরের ১৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম অতিরিক্ত চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে মামলা করেন সেলিমের মা নুর জাহান বেগম। মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় সীতাকুণ্ড থানার উপ পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) কামাল উদ্দিনকে। এর আগে ৮ নভেম্বর চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন সেলিমের ভাই আবদুল গফুর।

এামলার তদন্ত কর্মকর্তা সীতাকুণ্ড থানার উপ পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) কামাল উদ্দিন জানান, মামলা তদন্তকালীনও প্রথম স্ত্রী শাহনাজের কোন সহযোগিতা পায়নি পুলিশ। তদন্তে নেমে প্রথমে সেলিমের ব্যবহৃত মোবাইল সিমটি উদ্ধার করে পুলিশ।

সেলিম নিখোঁজের পর সিমটি ব্যবহারকারী আল আমিন নামের এক রেস্টুরেন্ট কর্মচারীকে নগরীর অলংকার মোড় থেকে গত মাসের শেষের দিকে আটক করি। পরে তাকে রিমাণ্ডে নেয়ার পর মামলার কিছুটা জট খুলতে থাকে। আল আমিনের কাছ থেকে রিমাণ্ডে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ন তথ্য পাওয়া যায়। বর্তমানে আল আমিন জেল হাজতে রয়েছে। তার দেয়া স্বীকারোক্তিতে গতকাল বুধবার এ ঘটনার মূল আসামি শাহনাজের প্রেমিক রাসেল (৩২) সেলিমের শ্যালক মো. হাশেম উল্লাহ (৩৬) ও শাহনাজের ভগ্নিপতি মহিউদ্দিনকে আটক করে পুলিশ।

আটকের পর তাদেরকে আলাদা আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে সেলিমকে হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। এবং মাটি খুঁড়ে লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

সেলিমের দ্বিতীয় স্ত্রী রাহেনা জানান, সর্বশেষ ২৯ অক্টোবর স্বামীর সাথে রাত ৯ টায় শেষ কথা হয় তার। পরের দিন বাসায় আসবেন বলেছিলেন কিন্তু সেদিন সকাল থেকে মোবাইল বন্ধ পাওয়ায় বিষয়টি সবাইকে জানায় সে। এর পর স্বামীর লাশ উদ্ধারের খবর আসে তার কাছে। এক সন্তান নিয়ে সে এখন ঠিকানা হারা বললেন রাহেনা।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত