টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রামে ৩১৪ ইটভাটার রাজস্ব গিলছে অসাধু চক্র!

চট্টগ্রাম, ২৬ ফেব্রুয়ারি (সিটিজি টাইমস) :   জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গড়ে ওঠা ৩১৪ ইটভাটা থেকে কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না সরকার। লাইসেন্স ছাড়াই বছরের পর বছর চলছে এসব ইটভাটা। তবে সরকার রাজস্ব না পেলেও নানা ভয়-ভীতি দেখিয়ে ইটভাটার মালিকদের কাছ থেকে কয়েক গুণ বেশি অর্থ তুলে নিচ্ছে অসাধু চক্র।

এই চক্রে রয়েছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, সংবাদপত্রের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সন্ত্রাসীরা।

ইটভাটা থেকে তোলা অর্থের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে চক্রগুলোর মধ্যে রয়েছে দলাদলি, খুনোখুনির ঘটনাও। আর নিজেদের আড়াল করতে পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন জড়িয়ে রয়েছে মিথ্যা মামলা-বাণিজ্যে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজস্ব আদায়ে সরকারি তোড়জোড় শুরু হলে এ নিয়ে পরস্পর দোষারূপ শুরু করে পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন। তবে সেদিক থেকে নজর সরিয়ে জেলা প্রশাসন এখন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) আদায়ে মাঠে নেমেছে।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, পটিয়া ও বোয়ালখালী উপজেলায় ৪০৮টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে বৈধ মাত্র ৯৪টি; অবৈধ ইটভাটার সংখ্যা ৩১৪। এসব ইটভাটা থেকে সরকার কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে এ ব্যাপারে হালনাগাদ কোনো তথ্যও নেই। ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী তাদের তথ্য, চট্টগ্রামে ইটভাটা আছে ৩৪৯টি। এর মধ্যে উন্নত প্রযুক্তির কিলনের সংখ্যা ৪৩। আর ফিক্সড চিমনি কিলন ৩০৬টি।

পরিবেশ আইনে বলা হয়েছে, ইটভাটাকে পরিবেশ উপযোগী করতে ভাটার চিমনির উচ্চতা ১২০ ফুট এবং চিমনি তৈরিতে জিগজ্যাগ কিলন, হাইব্রিড হফম্যান কিলন, ভারটিক্যাল স্যাফট কিলন, টানেল কিলন ও পরিবেশসম্মত উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপনসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ আইনের ৪ নম্বর ধারায় লাইসেন্স ছাড়া ইট তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, “আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, ইটভাটা যে জেলায় অবস্থিত সেই জেলার জেলা প্রশাসকের নিকট হইতে লাইসেন্স গ্রহণ ব্যতিরেকে কোন ব্যক্তি ইটভাটায় ইট প্রস্তুত করিতে পারিবেন না।”

এ ছাড়া ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইনের ৮ ধারায় রয়েছে, আবাসিক, জনবসতি, সংরক্ষিত, বাণিজ্যিক এলাকা, অভয়ারণ্য, বাগান বা জলাভূমি, কৃষিজমি, পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন সদরের এক কিলোমিটার ও বনভূমি, জলাভূমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দুই কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। এ আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

আইনের কোনো তোয়াক্কা না করে আবাসিক-জনবসতি এলাকা, ফসলি জমি, বনভূমি ও নদীর তীরে গড়ে উঠেছে বহু ইটভাটা। এসব এলাকায় ইটভাটা স্থাপনে কড়াকড়ি বিধিনিষেধ থাকায় জেলা প্রশাসন ইটভাটার লাইসেন্স ও পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র দিতে পারছে না। কিন্তু জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশসহ অসাধু চক্রের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে এসব অবৈধ ইটভাটা চলে আসছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর মো. রুহুল আমীন বলেন, “পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসক ইটভাটার অনুমতি বা লাইসেন্স দেন ও নবায়ন করেন। কিন্তু লাইসেন্স যেহেতু নেই, সেহেতু অবৈধ ইটভাটা থেকে সরকারের কোনো রাজস্ব আসে না। তবে জেলা প্রশাসন অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে। অবৈধ ইটভাটাগুলো বন্ধের জন্য সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনারদের নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। ইতিমধ্যেই কয়েকটি অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।”

এক প্রশ্নের জবাবে ডেপুটি কালেক্টর বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজস্ব আদায়ে সরকারি তোড়জোড় শুরু হয়েছে। ফলে জেলা প্রশাসন এসব অবৈধ ইটভাটা থেকে চলতি মৌসুমে ৫২ লাখ তিন হাজার ৮৫ টাকা ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে গত মৌসুমের সীতাকুণ্ড, রাঙ্গুনিয়া, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া উপজেলায় বকেয়া দুই লাখ ৬১ হাজার ৯০ টাকাও রয়েছে। আর চলতি মৌসুমে ধরা হয়েছে ৪৯ লাখ ৪১ হাজার ৯৯৫ টাকা। এর বিপরীতে গত মাস (জানুয়ারি) পর্যন্ত ভূমি উন্নয়ন কর আদায় হয়েছে ২৩ লাখ পাঁচ হাজার ৪১১ টাকা।

ইটভাটার মালিকদের ভাষ্য, “সরকারি আইনে এতগুলো ইটভাটা অবৈধ। যদি বৈধ করা হতো তাহলে সরকার রাজস্ব পেত। অবৈধ হওয়ার কারণে সরকারি রাজস্বের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি টাকা আমাদের গচ্চা দিতে হয়। বৈধ হলে সরকারি রাজস্ব যারা আদায় করতেন, তারাই এখন অবৈধ টাকা গিলে খাচ্ছেন।”

ইটভাটার একাধিক মালিকের অভিযোগ, ইটভাটা বন্ধ বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানের ভয়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, পত্রিকায় সংবাদের প্রকাশের ভয়ে স্থানীয় সাংবাদিক, স্থানীয় প্রশাসনের ভয় দেখিয়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা তাদের কাছ থেকে টাকা নেন। গত ৮-১০ বছর ধরে সমিতির নামে এসব টাকা আদায় করে ভাগ-বাটোয়ারা চলছে। এ ছাড়া অবৈধ হওয়ার কারণে আইনি সহায়তার ঝামেলার ভয়ে সন্ত্রাসীদেরও মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়।

অভিযোগে আরও বলা হয়, আইনে কড়াকড়ির কারণে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, কৃষি অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না দিলেও ইটভাটা পরিচালনায় কোনো রকম বাধা দেন না। যখন কোনো পত্রিকায় রিপোর্ট হয়, বা কেউ কোনো অভিযোগ করে তখন ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান বা মামলার ভয় দেখিয়ে জরিমানা আদায়ের পাশাপাশি নিজেদের অর্থের অঙ্কটা বাড়িয়ে নেয়। সেই ভয়ে সংবাদপত্রের স্থানীয় প্রতিনিধিদেরও মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে হয়।

এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, লাইসেন্স না থাকায় ইটভাটা থেকে সরকার প্রতিবছর বড় ধরনের রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। লাইসেন্স থাকলে প্রতিবছর নবায়ন হতো। নবায়ন না হলে তো আর রাজস্ব আদায় হবে না। এ সুযোগে অসাধু চক্র লাভবান হচ্ছে বলে স্বীকার করেন তিনি।

পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মো. মকবুল হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ইটভাটা নিয়ে অনেক মামলা রয়েছে। এ ছাড়া সংশোধিত আইনে চলতি বছরের জুনের মধ্যে অবৈধ ইটভাটা সরিয়ে নেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এরপর অবৈধভাবে ইট পোড়ার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। তখন অসাধু চক্রও সরকারি রাজস্ব গিলে খাওয়ার সুযোগ পাবে না বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত