টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মিরসরাইয়ে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ এগিয়ে চলছে : ১৫ বছরে ৩০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান

গড়ে তোলা হবে বিমানবন্দর, মিনি নৌবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র জাহাজনির্মাণ শিল্প, অটোমোবাইলসহ ভারী শিল্প-কারখানা

এম মাঈন উদ্দিন
ইছাখালী চর থেকে ফিরে

Mirsarai-Arthoniti-Jone-Phoচট্টগ্রাম, ১৩ ফেব্রুয়ারি (সিটিজি টাইমস) : কর্মযজ্ঞে এখন মহা ব্যস্ত মিরসরাইয়ের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ইছাখালী চর। একসময়কার নিরব ধু ধু চর এখন কর্মচাঞ্চল্য হয়ে উঠেছে। কিছুদিন আগেও মানুষ শূন্য ছিলো এই জেগে উঠা চর। ছিলো গরু মহিষ আর ভেড়া বিচরণের অভয়াশ্রম। এখনকার দৃশ্যপট একেবারে ভিন্ন। অবহেলিত উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা এখন নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন।

শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনে উপযোগী করার জন্য ইতিমধ্যে সাড়ে ৫০০ একর ভূমিতে কাজ শুরু হয়েছে। জুনের মধ্যে শেষ হবে ভূমি উন্নয়নের কাজ। অর্থনৈতিক অঞ্চলটি স্থাপিত হলে এখানে আগামী ১৫ বছরে ৩০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এর পর থেকেই গড়ে উঠবে বিমানবন্দর, মিনি নৌবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র জাহাজনির্মাণ শিল্প, অটোমোবাইলসহ ভারী শিল্প-কারখানা। খুলে যাবে অর্থনীতির নতুন দিগন্ত। বদলে যাবে এখানকার চেহারা। এখানে স্থাপিত হবে ২০০টি কারখানা। প্রাথমিক পর্যায়ে এর নির্মাণব্যয় ধরা হয়েছে ৮৬ হাজার কোটি টাকা। জেগে উঠা চর দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকার পর পরিণত হতে চলেছে কর্মমুখর এক জনপদে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সেই চরে নির্মিতব্য মিরসরাই স্পেশাল ইকনোমিক জোনে এখন দিন-রাত চলছে শত শত এক্সকাভেটর, ডাম্পিংট্রাক। কর্মব্যস্ত সময় যাচ্ছে শ্রমিকদের। জোরে শোরে চলছে প্রধান সড়ক নির্মানের কাজ। শীঘ্রই বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের কাজ শুরু হচ্ছে। উপকূলের বাসিন্দারা এখন দিন বদলের স্বপ্নে বিভোর। ইতোমধ্যে তারা নিজেদের জমিজমার দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন।

বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে ৭০ কিলোমিটার ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে ইছাখালী ইউনিয়নের পীরের চর, সাধুর চর, শিল্পচর এবং চর মোশারফে পরিকল্পিত এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ শুরু হয়েছে। ৫৫০ একর জমিতে এখন চলছে ভূমি উন্নয়ন, সড়ক নির্মাণ, সুপেয় পানি সরবরাহ ও বাঁধ নির্মাণের কাজ। বাঁধ নির্মাণের কাজে ১৫ থেকে ২০টি এক্সকাভেটর, সড়ক নির্মাণ কাজে ২০টি এক্সকাভেটর ও বেশকিছু ড্রাম্পিং ট্রাক কাজ করছে। একই সাথে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে মঘাদিয়া ইউনিয়ন হয়ে প্রকল্প এলাকায় যাওয়ার জন্য ৬ কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণের কাজও চলছে জোরেশোরে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কর্মকর্তারা জানান, মিরসরাই ও পার্শ্ববর্তী সোনাগাজী উপজেলার উপকূলে জেগে ওঠা ৩০ হাজার একর জমিতে ইকনোমিক জোনের অধীনে পর্যায়েক্রমে ৫০টি বিশেষায়িত অর্থনৈতিক উপ-অঞ্চল (জোন) করার পরিকল্পনা নিয়েই এগুচ্ছে সরকার। এর ধারাবাহিকতায় মিরসরাইয়ের ইছাখালীতে সাড়ে ৭ হাজার একর জমিতে ইকনোমিক জোন করা হবে। বর্তমানে সেখানে বাঁধ ও ¯¬ুইস গেট কাম সেতু মাটি ভরাট এবং ৪ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের তিনটি প্রকল্পের কাজ চলছে।

বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ইছাখালীর চরে ৬৬০ মেগাওয়াট দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যু। কেন্দ্র স্থাপনে ইতিমধ্যে চীনের জিজিয়ান জিনডোন হোল্ডিং গ্রæপের সাথে চুক্তি করেছে বেজা। জিনডোন গ্রæপ গত মাসে প্রকল্প এলাকায় জরিপ করে রিপোর্ট দিয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অনুমতি ও প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পেলেই তারা কাজ শুরু করবে। প্রকল্পের অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য দরপত্র আহবান করা হয়েছে বলে জানান তারা।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী জানান, সরকারের বেঁধে দেওয়া সময় ২০১৭ সালে শেষ নাগাদ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সব শিল্প-কারখানা নির্মাণ শেষ হয়ে উৎপাদনে যাবে। এতে মিরসরাই সহ দেশের লাখ লাখ যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে এমন আশাই করছে এখানকার সাধারণ মানুষ।

সারাদেশে একশ’টি বিশেষ অর্থনৈতিক জোন তৈরির পরিকল্পনা অনুযায়ী বর্তমানে ১০টি জোনের ভূমি উন্নয়নের কাজ চলছে। আগামী ২৮ ফেব্রæয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ১০টি জোনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করবেন। ওইদিন মিরসরাই ইকনোমিক জোনেরও ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের কথা।

জানা গেছে, উপকূলের বাসিন্দাদের অনেকের কাছে বিপুল পরিমাণ জমিজমা থাকলেও সেগুলোর দাম কম ছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকায় অনেকে এসব এলাকায় আত্মীয়তা করতেও আগ্রহী হতেন না। অনেকে আবার কিছুটা স্বাবলম্বী হলেই উপকূল ছেড়ে পূর্বদিকে এসে নতুন বাড়ি তৈরি করতেন। অবহেলিত মিরসরাই উপকূলীয় এলাকায় ইকনোমিক জোনকে ঘিরে নতুন প্রত্যাশার সঞ্চার হয়েছে। ৫ ইউনিয়নের লক্ষাধিক বাসিন্দা কোনো না কোনোভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
মিরসরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ আতাউর রহমান জানান, ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কারণে দেশের অর্থনীতিতে মিরসরাই অঞ্চল অবদান রাখবে পাশাপাশি এখানকার মানুষের জীবন মানের উন্নয়ন ঘটবে।’

উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক ও ইছাখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল মোস্তফা বলেন, ইকনোমিক জোন তৈরি হওয়ার খবরে উপকূলের দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। সেখানকার ভূমির দাম ইতিমধ্যে কয়েকগুণ বেড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা পাল্টে যাচ্ছে। উপজেলার ও উপজেলার বাইরের বাসিন্দারাও ভূমি মালিকদের কাছে জমি কিনতে ধর্ণা দিচ্ছেন। কেউ কেউ সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের পথ তৈরি করতেও ভিড় করছেন।

অর্থনৈতিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে টেকসই হবে চট্টগ্রামের সাথে সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা। উন্নয়ন ঘটবে মানুষের জীবন মানের। বেজা কর্মকর্তারা আরো জানিয়েছে এখানে সব ধরণের স্থাপনা নির্মাণের ব্যাপারে প্রাধান্য পাবে পরিবেশের সুরক্ষা।

জানা গেছে, ফেনী নদী থেকে জেগে ওঠার কারণে সেখানকার জমি অনেক নিচু। তাই ভূমি উঁচু করতে এখন সেখানে ফেলা হচ্ছে মাটি। ২২ কোটি ৫ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ব্যয়ে ওই মাটি ফেলা হচ্ছে। ভবিষ্যতে যাতে পানির কারণে চর ডুবে না যায়, তার সুরক্ষার জন্য চলছে বাঁধ নির্মাণের কাজ। বাঁধে থাকছে ¯øুইস গেট কাম সেতু। এই কাজের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২২ কোটি ৬৬ লাখ ৯৪ হাজার ৩শ ১টাকা। বিশ্বব্যাংক, ডিএফআইডি ও সরকারি অর্থায়নে এসব কাজ করছে মেসার্স আতাউর রহমান খান নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এই কাজের জন্য সর্বমোট ৭মাস সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। এছাড়া মঘাদিয়া থেকে ইছাখালী সিডিএসপি বাঁধ পর্যন্ত সাড়ে ৪ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১২ কোটি টাকা। সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। নিয়াজ ট্রেডার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সড়ক নির্মাণের কাজ করছে।

বেজার যুগ্ম সচিব হারুনুর রশীদ বলেন, ‘মিরসরাইকে শিল্পনগরীতে রূপান্তর করতে একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান নেওয়া হচ্ছে। একজন নাগরিকের জন্য সেখানে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে। শিল্প-কারখানা, স্কুল, আবাসিক ভবন, মসজিদ, হাসপাতালসহ সব ধরনের সুবিধা রাখা হবে।’ ‘অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে (পিপিপি)। যেখানে সরকার জমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন করে দেবে। এরই মধ্যে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ভূমি উন্নয়ন আর সুরক্ষার কাজ শুরু হয়েছে।’

সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি ২০১০ সালে মহামায়া সেচ প্রকল্প উদ্বোধন করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মিরসরাইয়ে আসলে সেখানে ইছাখালী চরকে বিনিয়োগের উপযোগী করে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান। প্রধানমন্ত্রী তখন বিষয়টিকে বেশ আগ্রহের সঙ্গে দেখেছিলেন। পরবর্তীতে প্রকল্পের একটি পরিকল্পনা তিনি সরকারের কাছে তুলে ধরেন। ২০১২ সালে প্রধানমন্ত্রী নিজে ইছাখালীতে দেশের সর্ববৃহৎ শিল্পনগরী গড়ে তোলার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন।’

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত