টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চারলেন প্রকল্প কাজ অসমাপ্ত রেখেই উদ্বোধন!

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই  প্রতিনিধি 

চট্টগ্রাম, ১১ ফেব্রুয়ারি (সিটিজি টাইমস) ::  ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ের চারলেন প্রকল্পের উদ্বোধনের সর্বশেষ ডেটলাইন ঘোষিত হয়েছে চলতি বছরের মে মাসে। সম্প্রতি এই ঘোষণা দেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। চট্টগ্রামের সিটি গেট থেকে ধূমঘাট পর্যন্ত ৬৬ কিলোমিটার অংশ মে মাসে শেষ হবে বলে নিশ্চিত করেছেন ওই অংশের প্রকল্প ব্যবস্থাপক। কিন্তু ফেনী-কুমিল্লার অবশিষ্ট অংশের কাজ নিয়ে রয়েছে সংশয়। সড়ক উন্নয়ন কর্মী থেকে শুরু করে খোদ চারলেন প্রকল্প পরিচালকও এই সংশয় প্রকাশ করেন।

এদিকে পাথর সংকট এখনো কাটেনি উল্লেখ করে সড়ক উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন ব্যক্তি জানান, এই সংকটের মধ্যেই কাজ বাকি আছে ফেনী-কুমিল্লা অংশের অবশিষ্ট ১৩৪ কিলোমিটার সড়কের পাশাপাশি ৩ ওভার ব্রিজেরও। ফেনী রেল ওভার পাস, কুমিল্লা রেল ওভার পাস ও ফেনী মহিপাল ওভার পাস- এই তিনটি ওভার পাসের কাজের তদারকি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কোনোভাবেই আগামী মে এর মধ্যে তিনটি উড়াল সেতু সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। তবে এখন থেকে লোকবল, পাথর ও সরঞ্জাম সংকট নিরসন হলে সম্ভব হতে পারে।

তিনি আরো জানান, সেতুমন্ত্রীর সর্বশেষ মে মাসের ডেটলাইন ঘোষণার পর এই অবধি কোনো প্রকার সংকট নিরসন ও লোকবল বৃদ্ধি করা হয়নি।

২০১০ সালে শুরু হওয়া চারলেনের কাজ ২০১৩ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদারদের গাফিলতিতে দ্বিগুণ সময় লাগছে দেশের প্রধান মহাসড়কে। বিলম্বের কারণে ব্যয়ও বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

১০টি প্যাকেজে ভাগ করে তিন হাজার ৭৯৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৯২ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলছে। চার দফায় সময় বাড়ানোর পরও চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রকল্পের ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক আফতাব হোসাইন খান।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯২ কিলোমিটার মহাসড়কের প্রথম স্তরের কাজ পুরোপুরি শেষ। চলছে ফিনিশিংয়ের কাজ। সড়কের দু’দিক থেকে ৩৮৪ কিলোমিটার ফিনিশিংয়ের কাজ করতে হবে। এখন পর্যন্ত ৯০ কিলোমিটার কাজ হয়েছে। অবশিষ্ট ২৭৪ কিলোমিটারের কাজ আগামী মে মাসের আগেই শেষ হবে বলে জানান তিনি। প্রকল্পের ১০টি প্যাকেজের সাতটির কাজ করছে চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো। বাকি তিন প্যাকেজের কাজ করছে চারটি প্রতিষ্ঠান।

প্রকল্প পরিচালক জানান, ফেনীতে ওভারপাসের কাজ ৭৩ শতাংশ শেষ হওয়ার পর বন্ধ রয়েছে। এ বছরে পিবিএল কাজ শেষ করতে পারবে কি-না এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কাজই তো বন্ধ। শেষ করবে কীভাবে?’ প্রতিষ্ঠানটিকে দ্রুত কাজ শেষ করতে তাগাদা দিয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো, পিবিএল, শিকোর কারণে কাজে বিলম্ব হয়েছে। এ কথা অনেক দিন আগে থেকেই বলা হচ্ছে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সারাবিশ্বেই ঠিকাদার কাজে বিলম্ব করলে জরিমানা করা হয়। বাংলাদেশে তার উল্টো চিত্র।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পে বিলম্বের কারণে এক হাজার ২৪৩ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। সড়ক পরিবহন সচিব এম এ এন সিদ্দিক বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। দ্রুত কাজ শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। যারা ব্যর্থ হবে তাদের বিরুদ্ধে জরিমানা, কালো তালিকাভুক্তিসহ অন্যান্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিলম্বের কিছু কারণ যৌক্তিক বলেও মনে করেন সচিব। তিনি বলেন, পাথর সংকটের কারণে কাজের ক্ষতি হয়েছে। দুই দফায় রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেও বিলম্ব হয়েছে।

২০১৩ সালের ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সময়সীমা চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। এর আগে দু’দফায় সময় বাড়ানো হয়। ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্প অনুমোদনের সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় দুই হাজার ১৬৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্প ব্যয় প্রথম দফায় সংশোধন করা হয়। ব্যয় দাঁড়ায় দুই হাজার ৩৮২ কোটি ১৭ লাখ টাকা। ২০১২ সালে বিশেষ সংশোধনে ব্যয় দাঁড়ায় দুই হাজার ৪১০ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের মার্চে সংশোধনে ব্যয় ধরা হয় তিন হাজার ১৯০ কোটি ২৯ লাখ। চতুর্থ দফায় ব্যয় সংশোধনে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে তিন হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের অনেকাংশে এখনো পৃথক লেন অসমাপ্ত রয়ে গেছে। অনেক স্থানে ডিভাইডার আই লাইন হয়নি। আর এই বিষয়টি স্বীকার করেন প্রকল্প পরিচালক। তাই সংশয়ে সেতুমন্ত্রী ঘোষিত সর্বশেষ ডেটলাইনও। তবে ইতোমধ্যে এগিয়ে গেছে ধূমঘাট থেকে চট্টগ্রাম সিটিগেট পর্যন্ত অংশ। রবিবার সরেজমিনে চারলেনের অনেক স্থানে গিয়ে সর্বশেষ লেয়ারের পর সড়ক মার্কিংয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় সড়কে কর্মরত কর্মী ও সুপারভাইজারদের।

সড়কের মিরসরাই উপজেলার মিঠাছরা অংশে সড়ক মার্কিং কাজে সুপারভাইজেশানে ব্যস্ত কনসালট্যান্ট প্রকৌশলী মোতালেবের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সড়ক মার্কিয়ের পর আমরা ‘মিড ইয়ানে’ গাছ লাগানোর কাজ ধরবো। তবে পুরো চার লেনের পুরোটাই আগামী মে মাসের আগে সম্ভব কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোন কোন অংশে রিপেয়ারিং ও ওভার ব্রিজগুলো ঢালাইয়ের কাজে পাথর সংকট কেটেছে কিনা আমি নিশ্চিত নই।
এদিকে ফোরলেন প্রকল্প পরিচালক আফতাব হোসাইন খান বলেন, আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি যে কোন মূল্যে মন্ত্রীর ডেটলাইন বাস্তবায়ন করতে। তবে দেশে চলমান পাথর সংকটের অবসান হলে বা আমাদের কাজে পাথরের সংকট আর দেখা না দিলে এই সময়েই উদ্বোধন হবে এই চার লেন। তিনি আরো বলেন, আমাদের প্রকল্প মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত। তবুও আমরা চেষ্টা করছি মে মাসেই শেষ করতে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকৌশলী এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ধূমঘাট ব্রিজ ও ফেনী-কুমিল্লা অংশের অসমাপ্ত কাজের বর্তমান ধরন হিসেবে আগামী মে মাসের মধ্যে ৭০% কাজ অন্তত শেষ হবে বলে আশা করছি। তবে ধীর গতির অংশগুলোতে গতি বৃদ্ধি করলে যথাসময়েই উদ্বোধন সম্ভব।

চট্টগ্রাম অংশের চার লেন প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী জুলফিকার আলী বলেন, ইতোমধ্যে কয়েকটি পয়েন্টে রিপেয়ারিং ছাড়া চট্টগ্রাম অংশের ৬৬ কিলোমিটারের পুরোটাই শেষ লেয়ার প্রায় সম্পন্ন। ১০ কিলোমিটার সড়ক মার্কিংও সম্পন্ন হয়ে গেছে। বাকী সড়ক মার্কিংও আগামী ১৫ দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। মধ্যখানের ‘মিড ইয়ানে’ দৃষ্টিনন্দনের উপর গুরুত্ব দিয়ে কি গাছ লাগানো হবে তার নির্দেশনা না আসায় সেখানে গাছ লাগানো শুরু হয়নি। তবে বর্ষা আসার আগেই পুরো ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন জুড়ে সবুজের সমারোহে নতুন দৃশ্য বিরাজ করবে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত