টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

ইউপি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেতে মরিয়া মানিকছড়ির সম্ভাব্য প্রার্থীরা

আবদুল মান্নান
মানিকছড়ি প্রতিনিধি

চট্টগ্রাম, ০৫ ফেব্রুয়ারি (সিটিজি টাইমস) ::  আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপে খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি ও লক্ষীছড়ি উপজেলায় ইউপি নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনাকে ঘিরে এ জনপদে নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সরকার নির্বাচনী তফসিল ঘোষনা না করলেও আগাম প্রস্তুতি হিসেবে এ দু’ উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীরা আঞ্চলিক ও জাতীয় রাজনৈতিক দলের নিকট নিজের পক্ষে মনোনয়ন নিশ্চিত করতে দৌঁড়ঝাপ শুরু করেছে বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে।

সরজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে খাগড়াছড়ির প্রবেশদ্বার মংরাজ পরিবারের আবাসস্থল সবুজ সমারোহে ঘেরা মানিকছড়ি । আর এর পূর্বে রয়েছে লক্ষীছড়ির অবস্থান। মানিকছড়ির চারটি ইউনিয়নে অউপজাতি বাঙ্গালীর সংখ্যা বেশি। ফলে এখানে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের দাপট তেমন নেই। এখানে আওয়ামীলীগ ও বিএনপি’র ছায়াতলের প্রার্থীরাই নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে লবিং শুরু করেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা অনেক আগ থেকেই অনানুষ্ঠানিকভাবে সামাজিক আচার অনুষ্ঠান, বিয়ে-সাদী ও নানা অনুষ্ঠানে দান-খয়রাতি দিয়ে জনগণের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করছেন। বর্তমানে এখানে আ’লীগের ৩জন এবং বিএনপি’র ১ জন চেয়ারম্যান রয়েছেন। ২০১১ সালের ১১ জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সদর ১ নং মানিকছড়ি, ২ নং বাটনাতলী ও ৩ নং যোগ্যাছোলাতে আ’লীগের প্রার্থীরা বিএনপি’র প্রার্থীদেরকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছেন। একমাত্র ৪ নং তিনটহরী ইউপিতে বিএনপি’র উপজেলা সভাপতি বিজয়ী হয়েছেন।

আসন্ন ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষনার আগেই এখানকার সম্ভাব্য প্রার্থীরা আচঁ করতে পেরেছেন, দেশব্যাপি আসন্ন ইউপি নির্বাচনের প্রথম ধাপে ঘোষিত তফসিলে খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি ও ল²ীছড়ি উপজেলায় নির্বাচন হওয়ার বিষয়টি। তৃণমূলে এ সংবাদ জানাজানি হওয়ার পর নির্বাচন নিয়ে জনমনে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়েছে পুরোদমে। দোকানে-পাটে শুরু হয়েছে কে হবেন, কোন দলের প্রার্থী, কারা হবেন নতুন জনপ্রতিনিধি। গত ১৫ দিনে ভোটারদের মূখেমূখে যেমন নির্বাচনী কথাবার্তা চলছে, তেমনই সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে চষে বেড়াচ্ছেন। বর্তমান জনপ্রতিনিধিদের পাশাপাশি নতুন নতুন প্রার্থীরাও প্রতিদ্ব›িদ্বতা করতে প্রচারণা চালাচ্ছে প্রতিটি জনপদে।

বর্তমান সরকারের আমলে মানিকছড়ির চারটি ইউপির তিনটিতেই ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা জনপ্রতিনিধির চেয়ারে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ফলে এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নের চিত্র যেমন রয়েছে তেমনি যোগ্যাছোলা,বাটনাতলী ও মানিকছড়ির আন্তঃসড়কগুলোর বেহাল দশা জনদূর্ভোগ বাড়িয়েছে সীমাহীর। কারণ আন্তঃসড়কগুলো দিয়ে মাত্রাতিরিক্ত লোডে প্রতিনিয়ত বালু পাচারের কারণে এখানকার রাস্তাগুলো যৌবনেই সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে! মানিকছড়ি সদর ইউপি’র (১নং) চেয়ারম্যান জেলা আ’লীগের কৃষি বিষয়ক সম্পাদক মো. আবুল কালাম এবারও দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। তিনি গত ৫ বছরে ইউপি’র তৃণমূলসহ পাহাড়ের চ‚ড়ায় বসবাসরত গুচ্ছগ্রামবাসীদের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা ও জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে যাত্রী ছাউনি নির্মাণ এবং খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সড়কস্থ বাসস্টেশন ও হাঁট-বাজারে ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তায় বিদ্যুতের বাল্ব (লাইটিং)বসানো, বাজারে টিউবওয়েল, মাছ ব্যবসায়ীদের কল্যাণে সেড সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ করেছেন। সরকারের এসব উন্নয়নের চিত্র ভোটারদের মাঝে তুলে ধরে দলে প্রার্থী ভোটারদের কাছে চাওয়া সহজ হবে। এবার এখানে গত বছরের প্রার্থী প্রত্যাশি উদীয়মান সমাজ সংস্কারক, ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব, বিশিষ্ট সাংবাদিক পাক্ষিক মানিকছড়ি বার্তা সম্পাদক ও আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. মাঈন উদ্দীন দীর্ঘদিন ধরে জোরেশোরে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এছাড়া আ’লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বিশিষ্ঠ ঠিকাদার মো. শফিকুর রহমান ফারুক নির্বাচনে প্রার্থী হবে মর্মে নেতা-কর্মীদের মুখে শোনা গেলেও সরজমিনে এখনো তার দেখা মেলেনি। এছাড়া নতুনমুখ হিসেবে মনোনয়ন চাইতে পারেন, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এম.এ. রাজ্জাক এর শ্যালক ব্যবসায়ী ও শিক্ষানুরাগী মো. আকতার হোসেন এবং উপজেলা কার্বারী এসোসিয়েশনের সভাপতি উপজাতি নেতা উদ্রাসাই কার্বারী। তবে যেই আসুক এখানে আ’লীগের প্রার্থী বনাম বিএনপি প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে। শেষ হাসি কে হাসবে তা নির্ভর করবে মূলত ভোটারদের ওপর। মানিকছড়ি সদর ইউপিতে বিএনপি’র শক্তিশালী প্রার্থী না থাকলেও প্রার্থী হচ্ছেন সাবেক ইউপি সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত ইউপি চেয়ারম্যান এবং যুবদল সভাপতি মো. আবুল কাশেম।

২ নং বাটনাতলী ইউপিতে আ’লীগের প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান ও বাটনাতলী নিন্মমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শহিদুল ইসলাম (মোহন)। তৃণমূলে তাঁর জনপ্রিয়তার ঘাটতি নেই। গ্রামের সাধারণ মানুষজন তাকে সেবক হিসেবেই ছিনেন এবং জানেন। তবে এবার এখানে দলীয় মনোনয়ন চাইবে ডাইনছড়ির সমাজপতি ও ব্যবসায়ী এবং বর্তমান ইউপি সদস্য মো. আবদুর রহিম এবং সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আ’লীগ নেতা মো. রফিকুল ইসলাম। ফলে দল এখানে কাকে প্রার্থী দিবে সেদিকেই ভোটার ও নেতা-কর্মীরা দীক্ষè নজর রাখছে। অন্যদিকে এ এলাকায় বিএনপি’র জনসমর্থন বেশি থাকলেও দলীয় কোন্দলের কারণে কিছুটা দ্বিধাবিভক্ত। তবুও বিএনপি নেতা সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মো. আবদুল কাদের তৃণমূলে দলমত নির্বিশেষে জনসমর্থন পেতে কৌশলি ভ‚মিকায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া প্রার্থী হতে পারেন সাবেক ইউপি চেয়ারম্যাম ও বিএনপি’র সহসভাপতি মো. আরব আলী ।

উপজেলার সর্বদক্ষিণ ও পশ্চিমাংশে অবস্থিত ৩ নং যোগ্যাছোলা ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান উপজেলা আ’লীগ সভাপতি মো. জয়নাল আবেদীন। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা ওখানেই। এখানে তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বি। যে কেউ জনপ্রতিনিধি হতে হলে তাঁর আর্শিবাদের বিকল্প নেই। তবে এবার তিনি ইউপিতে নির্বাচন করছেন না। কিন্তু দলেও শক্তিশালী প্রার্থী নেই! ফলে নতুনমূখ হিসেবে আসছেন উপজেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মানিকছড়ি বাজার সেক্রেটারী মো. নুরুল ইসলাম, বর্তমান ইউপি সদস্য সাম কুমার ত্রিপুরা ও কালাপানির উদীয়মান যুবক ডা. মো. রমজান আলী। অন্যদিকে এখানে বিএনপি’র প্রার্থী অনেক। দলে দীর্ঘদিনের সক্রিয় সদস্য ডা. আলমাছ মিয়ার পাশাপাশি জেলা ছাত্রদল সভাপতি মো. কামাল উদ্দীন দিপ্ত’র ছোট ভাই মো. জামাল হোসেন, ও যুবদল নেতা মো. আমির হোসেন ও এটিএম মাসুদ এবং গতবারের পরাজিত প্রার্থী মো. এনামুল হক ওরফে এনাম মেম্বার এবারও প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছায় তৃণমূলে কাজ করছেন। এ আসনটিতে গত নির্বাচনে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভজ্ঞা করে প্রার্থী ঘোষনা করায় চরম পরাজয় ঘটেছে দলীয় প্রার্থীর। অন্যদিকে ৪ নং তিনটহরী ইউপিতে বিএনপি’র প্রার্থী কে হবে এ নিয়ে চলছে জল্পনাকল্পনা চলছে। বর্তমান চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি এম.এ. করিম নির্বাচনে লড়বে কী না তা এখনো ভোটারদের কাছে পরিস্কার নয়। বিষয়টি নির্ভর করবে দল এবং তাঁর ইচ্ছার ওপর। ফলে দলীয় ভোটাররা রয়েছে এখনো দ্বিধা-দ্ব›েদ্ব। তবে গত নির্বাচনে প্রার্থী প্রত্যাশি বিএনপি নেতা মো. আবুল হাসেম ভ‚ইঁয়া তৃণমূলে জনসমর্থন পেতে কাজ করে চলেছেন অনেক দিন ধরে। এখানে আ’লীগের ব্যানারে নির্বাচনের জন্য কাজ করছেন বিশিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার মো. রফিকুল ইসলাম বাবুল ও উদীয়মান শিক্ষানুরাগী কলেজিয়েট উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মংশেপ্রæ মারমা ও উপজেলা আ’লীগের দপ্তর সম্পাদক, বিশিষ্ঠ শিক্ষানুরাগী তিনটহরী উচ্চ বিদ্যালয় ও গিরি মৈত্রী ডিগ্রি কলেজের অভিভাবক সদস্য এম.ই. আজাদ চৌধুরী বাবুল।
অন্যদিকে ল²ীছড়ি উপজেলার তিনটি ইউপিতে স্থানীয় নির্বাচনে জাতীয় রাজনীতির চেয়ে আঞ্চলিক রাজনীতির প্রভাব বেশি। তাই গত বছরের ন্যায় এবারও এখানকার প্রত্যাশিত প্রার্থীরা ইউপিডিএফ ও জেএসএস এর সমর্থন পেতে লবিং শুরু করেছে। অনেকে আঞ্চলিক দলের হাই কমান্ডের সাথে যোগাযোগ করে মনোনয়ন নিয়ে ফেলেছেন বলে জনমনে কানাঘুষা হচ্ছে। দূর্গম বার্মাছড়ি ও দূল্যাতলী ও ল²ীছড়ি সদরে উপজাতিদের মধ্যে থেকে একক প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর প্রতিটি ইউপিতে বাঙ্গালী প্রার্থী একাধিক হবে। কিন্তু এখানে বাঙ্গালীর চেয়ে উপজাতি ভোটার অনেক বেশি। তাই বাঙ্গালী প্রার্থী একাধিক হলে সবক’টি ইউপি এবার উপজাতিদের ঘরে যাবে। এখানে আঞ্চলিক দলের মধ্যে জেএসএসের চেয়ে ইউপিডিএফের প্রভাব অনেক শক্তিশালী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক জনপ্রতিনিধি এ প্রতিবেদককে বলেছেন, ইতোমধ্যে তাঁরা সমর্থন পেতে যোগাযোগ করেছেন এবং অনেকাংশে সফল হয়েছেন। তবে শেষ পর্যন্ত কারা কারা লড়ছেন আসন্ন ইউপি নির্বাচনে সেটি জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে সরকার ঘোষিত সময় পর্যন্ত।

মানিকছড়ি ইউপি নির্বাচন সর্ম্পকে জানতে চাইলে উপজেলা বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মজিবুল হক বাহার এ প্রতিবেদককে বলেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত আসেনি। তবে তৃণমূলের সমর্থন নিয়েই প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হবে। উপজেলা আ’লীগ সাধারণ সম্পাদক মো. মাঈন উদ্দীন এ প্রসঙ্গে বলেন, আসন্ন ইউপি নির্বাচনকে ঘিরে নেতা-কর্মীরা উজ্জীবিত আছে। আর তৃণমূলের সমর্থন নিয়েই প্রার্থী দেয়া হবে, যাতে সবক’টি আসনে দলীয় প্রার্থীদের জন নিশ্চিত হয়। কেউ দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করলে সেটি দলের হাই কমান্ড দেখবে। তবে তিনি আরো বলেন, গত বছর আমি সদর ইউপিতে প্রত্যাশিত প্রার্থী ছিলাম। কিন্তু দলের সিনিয়র মুরুব্বী প্রার্থী হতে ইচ্ছা পোষন করায় এবং জেলা ও স্থানীয় নেতাদের অনরোধে পরবর্তী বছর অর্থ্যাৎ এবার আমাকে প্রার্থী দেয়া হবে মর্মে নেতারা আশ্বস্থ করায় আমি সরে এসেছিলাম। নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে তাকে বিজয়ী করেছি। আমি আশা করছি দল এবার আমাকে অবশ্যই মনোনয়ন দিবে।

মতামত