টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

স্বল্পোন্নত দেশে শিল্প সক্ষমতায় সেরা বাংলাদেশ

চট্টগ্রাম, ০৪ ফেব্রুয়ারি (সিটিজি টাইমস) ::  জাতিসংঘের শিল্প ও উন্নয়ন সংস্থার (ইউনিডো) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে শিল্প সক্ষমতায় বাংলাদেশই সেরা।

উৎপাদনমুখী শিল্প খাতের সক্ষমতাকে টেকসই প্রবৃদ্ধি নির্ধারণের অন্যতম নির্দেশক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সক্ষমতা পরিমাপে কমপিটিটিভ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পারফরম্যান্স (সিআইপি) সূচক তৈরি করে ইউনিডো।

সংস্থাটির ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০১৬-এ উঠে এসেছে স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে শিল্প সক্ষমতায় বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠত্বের তথ্য। সূচক তৈরিতে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে তিনটি বিষয়— উৎপাদন ও রপ্তানি সামর্থ্য, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক প্রভাব।

শিল্প সক্ষমতা বিবেচনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোয় শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে অবস্থানের পরিবর্তন ঘটছে। এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে উৎপাদনের মাধ্যমে মূল্য সংযোজন (এমভিএ) ও শিল্পপণ্যের রপ্তানি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বল্পোন্নত ১৮টি দেশের তালিকায় শিল্প সক্ষমতা বিবেচনায় বাংলাদেশ রয়েছে শীর্ষে। আর সামগ্রিকভাবে তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৭৭।

এক্ষেত্রে আগের তুলনায় বাংলাদেশ এগিয়েছে তিন ধাপ। ২০০৮ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৮০। বৈশ্বিক এমভিএর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রভাব শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ। আর বিশ্বের উৎপাদনমুখী বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রভাব রয়েছে শূন্য দশমিক ১৯ শতাংশ।

স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পরের অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে কম্বোডিয়া, সেনেগাল, জাম্বিয়া, মোজাম্বিক, তাঞ্জানিয়া, মাদাগাস্কার, নাইজার, ইয়েমেন, নেপাল, উগান্ডা, হাইতি, মালাউই, রুয়ান্ডা, ইথিওপিয়া, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, ইরিত্রিয়া ও গাম্বিয়া।

শিল্প সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশের শিল্প ক্রমেই উন্নতি করছে। এখন ১৬ কোটি মানুষের দেশে পরিণত হয়েছি আমরা। আর এ মানুষগুলো সবাই ভালো আছে।

এখন আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এসব অর্জনের মূল চাবিকাঠি আমাদের সহনশীলতা। সবকিছু ছাপিয়ে আমাদের রয়েছে বিশেষায়িত শিল্প বস্ত্র ও পোশাক খাত। দাঁত কামড়িয়ে হলেও আমরা সবাই সংকট মোকাবেলা করেই এগোচ্ছি।

একটা সময় ছিল, যখন একজন আয় করত আর তা দিয়ে পরিবারের পাঁচজন খেতে পারত। এখন পরিবারের পাঁচজনই আয় করে। শুধু শিল্পই নয়, পাশাপাশি এখন দক্ষ সেবা খাতও গড়ে উঠেছে। সবচেয়ে বড় সফলতা, আমরা একটি কার্যকর চাহিদা ও সরবরাহ চেইন তৈরি করতে পারছি। আর এসব অর্জনের ফলেই শিল্প সক্ষমতা ক্রমেই বাড়ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু এমভিএ ছিল ৮৪ দশমিক ২ ডলার, ২০১৩ সালে যা দাঁড়িয়েছে ১১৮ দশমিক ৩ ডলারে। এ সময় উত্পাদনমুখী শিল্পের রপ্তানিও বেড়েছে।

২০০৮ সালে বাংলাদেশের উৎপাদনমুখী শিল্প খাতের মাথাপিছু রপ্তানি ছিল ৯৯ দশমিক ১ ডলার। ২০১৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫২ দশমিক ১ ডলারে।

২০০৮ সালে মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) এমভিএর অবদান ছিল ১৭ শতাংশ। উৎপাদনের মাধ্যমে সংযোজিত মূল্যের এ অবদান ২০১৩ সালে বেড়ে হয়েছে ১৯ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে রপ্তানিতে উৎপাদনমুখী শিল্পের অবদান ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৯৫ দশমিক ৭ শতাংশ।

তবে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে প্রযুক্তিনির্ভর এমভিএর অবদান কিছুটা কমেছে। মধ্যম ও উচ্চ প্রযুক্তির উৎপাদনমুখী শিল্পের অবদান ২০০৮ সালে যেখানে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, ২০১৩ সালে তা কমে হয়েছে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ।

আর মোট রপ্তানিতে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের অবদানও কমেছে। ২০১৩ সালে এ অবদান দাঁড়িয়েছে ২ শতাংশ, যা ২০০৮ সালে ছিল ২ দশমিক ৮ শতাংশ।

দেশের শ্রমঘন শিল্পের মধ্যে অন্যতম পোশাক খাত। এ খাত থেকে আয় হয় ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা।

পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা মানসিকভাবে শক্তিশালী। তারা জানেন কীভাবে সংকট মোকাবেলা করতে হয়। আবার তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় একদল শ্রমিক একাগ্রচিত্তে দক্ষতা দেখিয়ে যাচ্ছে।

অন্যান্য দেশের ব্যবসায়ীরা মুনাফার দিকে অতিরিক্ত মনোযোগী হলেও বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা শুধু মুনাফায় মনোযোগী নন। ফলে শিল্প সক্ষমতায় বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী।

দেশের বৃহৎ শিল্প খাতের অন্যতম সিমেন্ট ও সিআর কয়েল। পাট ও তুলাজাত সুতা, চিনি, ভোজ্যতেল এবং চামড়া খাতের পরিধিও বড়। সিমেন্ট শিল্পের স্থানীয় বাজার চাহিদা প্রায় দেড় কোটি টন। এর বিপরীতে উৎপাদন সক্ষমতা ২ কোটি ৮০ লাখ টন। ফলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটি রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।

সিআর কয়েল উৎপাদকদের সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, পণ্যটি উত্পাদনকারী সব প্রতিষ্ঠানে এক মাসের উত্পাদনক্ষমতা ১৫ হাজার টন। যদিও বাজারে চাহিদা রয়েছে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টন।

সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে চিনি উত্পাদনের ক্ষমতা বার্ষিক ৩২ লাখ টন। এর বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ১৬-১৭ লাখ টন। স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদন ক্ষমতার পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারের মাধ্যমে চিনি রপ্তানির সুযোগ আছে।

পাট সুতা উৎপাদকদের সূত্রে জানা গেছে, খাতটিতে বিনিয়োগের পরিমাণ আড়াই হাজার কোটি টাকা ও উত্পাদনক্ষমতা বছরে ১০ লাখ টন। যদিও স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার মিলে বাংলাদেশে উৎপাদিত পাটের সুতার চাহিদা এখনো সাড়ে ৬ লাখ টন।

দেশের স্পিনিং খাতের উত্পাদনক্ষমতা বার্ষিক ২০ লাখ টন। এ খাতের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) দাবি, নিট ও ওভেনের প্রয়োজনীয় সুতা এবং কাপড়ের ৯০ ও ৩৫ শতাংশ জোগান দেয় খাতটি। এ শিল্পে ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ আছে।

দেশের আরেক বড় খাত ভোজ্যতেল পরিশোধন। খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠন সূত্রে জানা যায়, ৩০ লাখ টন উত্পাদনক্ষমতার বিপরীতে বর্তমানে দেশে ভোজ্যতেল পরিশোধন হচ্ছে ১৪ লাখ টনের মতো। এ হিসাবে অব্যবহৃত রয়েছে উৎপাদন সক্ষমতার ৫০ শতাংশের বেশি। ভোজ্যতেল রপ্তানি বন্ধ থাকায় সক্ষমতার পুরোপুরি কাজে লাগাতেও পারছেন না এ খাতের উদ্যোক্তারা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখ্ত বলেন, দুর্ঘটনাকবলিত পোশাক শিল্পের দিকে দৃষ্টি দিলেই দেশের শিল্প সক্ষমতা অনুধাবন খুব সহজ হয়ে যায়। তাজরীন, রানা প্লাজার মতো ঘটনার পরও দেশের রপ্তানিমুখী শিল্প প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে।

শুধু সস্তা শ্রম নয়, উদ্যোক্তা ও শ্রমিক দুই পক্ষের দক্ষতার কারণেই শিল্প এগিয়ে যাচ্ছে। উদ্যোক্তা ও শ্রমিক যে পণ্য তৈরি করছেন, তার মান প্রশ্নাতীতভাবে ভালো। তৃতীয় বিশ্বের মানুষ হয়ে দক্ষতা ও মানসম্পন্ন পণ্যের মাধ্যমে উন্নত দেশগুলোর মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারাটা বিশাল সক্ষমতা। সর্বোপরি সুযোগ পেলে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত দক্ষতা কাজে লাগাতে পারি বলেই শিল্প সক্ষমতায় আমাদের অবস্থান সেরা।

পোশাক শিল্পকেন্দ্রিক হলেও রপ্তানি খাতই দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে বলে জানান রপ্তানিকারকদের সংগঠন ইএবির সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী।

তিনি বলেন, শিল্প খাতের চ্যালেঞ্জ নানামুখী। তার পরও আমাদের সাহসী শিল্পোদ্যোক্তারা শক্ত হাতে এটি মোকাবেলা করতে পারছেন সরকারের নীতি সহায়তায়। আর ক্রেতাদের আস্থাও আমাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করছে। সব মিলিয়ে নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে।

সর্বোপরি শিল্পায়ন মানসিকতার একটি প্রজন্ম তৈরি হয়েছে। আবার এটি এগিয়ে নিতে তৈরি হয়ে গেছে দ্বিতীয় প্রজন্ম। ফলে শিল্প সক্ষমতায় উৎকর্ষ বেড়েছে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত