টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধের চেষ্টা করলেই শাস্তি

71চট্টগ্রাম, ০৪ ফেব্রুয়ারি (সিটিজি টাইমস) :: পরিসংখ্যানই সাক্ষী শহীদের সংখ্যা ৩০ লাখমুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা মিমাংসিত বিষয় এবং সেটি কোনভাবেই ৩০ লাখের কম নয়। গবেষকরা বলছেন, কেবল সম্মুখ সমরে নিহতরাই একাত্তরের শহীদ নন, যারা বাধ্য হয়ে শরনার্থী শিবিরে গিয়ে কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তাদেরকেও একাত্তরের শহীদ হিসেবেই গণ্য করতে হবে। এছাড়াও দালিলিক প্রমাণে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ পর্যন্ত শহীদের সংখ্যা উল্লেখ আছে। উল্লেখ্য মঙ্গলবার এক রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন একাত্তরের শহীদের সংখ্যা মিমাংসিত বিষয়। এটা নিয়ে কোনরকম বিভ্রান্তি তৈরির কোন সুযোগ নেই।

দুটি বই যেখানে বাংলাদেশের শহীদের সংখ্যা ৩০ লক্ষ বা তারও বেশি ও গণহত্যার বিস্তারিত বিবরণ মেলেএদিকে যারা নতুন করে মিমাংসিত বিষয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করতে চাইছে তাদের জন্য আসছে জেনোসাইড ডিনায়াল ল। এ আইনের মাধ্যমে বিরোধিতাকারীদের শাস্তি চূড়ান্ত করা হবে বলেও জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেন, এখন এধরনের বিভ্রান্তি তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বলেই আমরা এই আইন নিয়ে ভাবতে শুরু করেছি। একটা সময়কে, ইতিহাসকে সে সময়ের ব্যক্তিরা, ইতিহাসবিদরা, গ্রহণযোগ্য গণমাধ্যম ধরে রাখে। সে সময়ে ৩০ লাখ শহীদ হওয়ার জন্য ৪৪ বছর পর এসে ব্যাখ্যা হাজির করতে হচ্ছে সেটা দুর্ভাগ্যজনক।

মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা কত ছিল তা যুদ্ধকালীন সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম, যুদ্ধের অব্যবহতি পরে দেশী সংবাদমাধ্যম, গ্রহণযোগ্য ইতিহাসের বই থেকেই পরিসংখ্যান জানা যায়। রবার্ট পেন তার ম্যাসাকার বইতে লিখেছেন, একাত্তর সালেই মুক্তিযুদ্ধের প্রথম লগ্নে, অর্থাৎ মার্চে পাকিস্তানে জেনারেল ইয়াহিয়া খান প্রথম বলেছিলেন, ‘ওদের ত্রিশ লাখ হত্যা কর, বাকিরা আমাদের থাবার মধ্যে থেকেই নিঃশেষ হবে। প্রখ্যাত গণহত্যা গবেষক লিও কুপার জেনোসাইড নামে তার বইতে ব্যবহারকৃত প্রচ্ছদে লিখেছেন কোন যুদ্ধে কতজন শহীদ। সেখানে স্পষ্টভাবে লেখা ১৯১৫ : ৮০০,০০০ আর্মেনিয়ান। ১৯৩৩-৪৫ : ৬০ লাখ ইহুদি। ১৯৭১ : ৩০ লাখ বাংলাদেশি। ১৯৭২-৭৫ : ১০০,০০০ হুটু। নিচে লাল কালিতে বড় করে লেখা জেনোসাইড।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বিষয়ক ওয়েবসাইট defence.pk-এ প্রকাশিত “The Radical Truth: Teaching MPACUK the Forgotten Chapter of Pakistan’s History” শীর্ষক নিবন্ধের তৃতীয় অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭১ সালে ৯ মাস ধরে ইয়াহিয়া খান এবং তার সেনা অফিসাররা স্থানীয় সহযোগিদের সাথে নিয়ে যে গণ-হামলা চালিয়েছে তাতে অসংখ্য নাম না জানা বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন যার সংখ্যা ৩০লাখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এমনকি Encyclopedia Americana তাদের ২০০৩ সালের সংস্করণে বাংলাদেশ নামক অধ্যায়ে একাত্তরে মৃত মানুষের সংখ্যা উল্লেখ করেছে ৩০ লাখ।

দীর্ঘদিন যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা নিয়ে কাজ করা প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ ১৯৮১ সালের ইউনাইটেড ন্যাশনস হিউম্যান রাইটস কমিশন-এর রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, মানব সভ্যতার ইতিহাসে যতগুলো গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তার মধ্যে অল্প সময়ে সব থেকে বেশি সংখ্যক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে। প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার মানুষ তখন খুন হয়েছিল। উল্লেখ্য, অপারেশন সার্চলাইটের প্রথম রাতের প্রাণহানির সংখ্যাই ছিল কমপক্ষে ৩৫ হাজার। চুকনগর গণহত্যায় প্রাণহানি ঘটেছিল ১০ হাজারেরও বেশি। তিনি ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চে প্রকাশিত নিউ ইয়র্ক টাইমস -এর রিপোর্টের কথা উল্লেখ করে আরও বলেন, ২৭ মার্চে প্রাণহানির সংখ্যা ১০ হাজার। ১৯৭১ সালের সিডনিমর্নিং হেরাল্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী মার্চের ২৫ থেকে ২৯ তারিখ পর্যন্ত প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় ১ লাখ। এতে দেখা যায়, প্রতিদিন প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। সুতরাং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে প্রাণহানির দৈনিক গড় ইউএনএইচআরসি প্রতিবেদনের ঊর্ধ্বসীমার কাছাকাছি (প্রতিদিন ১২ হাজার)। দিনপ্রতি ১২ হাজার নিহত সংখ্যাকে ২৬৭ দিন দিয়ে গুণ করলে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩২ লাখ ৪ হাজার।

লাইফ ম্যাগাজিনের সাংবাদিক জন সার ১৯৭১ সালের জুনে কলকাতায় আসেন। বাংলাদেশ থেকে আসা শরনার্থীদের ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে তারা জবানবন্দি সংগ্রহের কাজ করেন। সেখানে তিনি এক নারীর সাক্ষাত পান যিনি বলেছিলেন, ‘তারা আমাদের তাড়া করে বের করেছে, পালিয়ে আসার মুহূর্তে রড দিয়ে আমাদের ওপর হামলা করায় আমার কাঁধের শিশুর মাথার খুলি চুরমার হয়ে যায়। আমার শরীর তখন রক্তাক্ত, আমার শিশু আর বেঁচে নেই’। জন সার যুক্তি দিচ্ছেন, বেশিরভাগ শরণার্থীকে তিনি কলেরায় আক্রান্ত হতে দেখেছেন। শরণার্থী শিবিরের স্বেচ্ছাসেবকরা তাকে বলেছেন, এতো বেশি মানুষ মারা গেছে যা গুনে শেষ করা সম্ভব না। কলেরায় আক্রান্ত রোগী একদিনও বেঁচে থাকেনি।

শরনার্থী শিবিরে ক্রন্দনরত নারী জবানবন্দি দিচ্ছেন তার শিশু হত্যারএতো দালিলিক ও চাক্ষুস প্রমাণের পরও যারা মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদদের নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করছেন তাদের জন্য শাস্তি নির্ধারণ করে আসছে মুক্তিযুদ্ধ অবমাননা আইন। মন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধ ও তৎকালীন সময়ের ইতিহাস বিকৃত করার প্রবণতা এখন এসে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কোনও ব্যক্তি যদি মুক্তিযুদ্ধ এবং তৎকালীন সময়ের ইতিহাস বা স্বীকৃত ঘটনাবলী সম্পর্কে অযাচিত বা অসত্য তথ্য পরিবেশন করেন, বা এ সম্পর্কে কোনও অসত্য বক্তব্য প্রদান করেন -যা বিভ্রান্তিকর, তাহলে উক্ত ব্যক্তির কর্মকাণ্ডকে অপরাধ গণ্য করে মুক্তিযুদ্ধ অবমাননা আইন প্রণয়নের কাজটি বর্তমানে বিবেচনাধীন।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, যারা মুক্তিযুদ্ধকে, এর শহীদের সংখ্যাকে নিয়ে বিকৃত বক্তব্য দেয় তাদের এদেশে থাকার অধিকার নেই। এই অবমাননা ও অস্বীকারের বিরুদ্ধে একটা আইন জরুরি ভেবে আমরা আইনমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করে জেনেছি আইনটি বিবেচনায় রয়েছে এবং দ্রত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। শাহরিয়ার কবীর বলেন, বাংলাদেশের আবিস্কার হওয়া বধ্যভূমিগুলোর হিসাব করলেই শহীদের সংখ্যা নিয়ে কথা বলার সাহস হারাবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা। আর এখনও হাজার হাজার বধ্যভূমি আমরা খুঁজেই বের করতে পারিনি। তিনি আরও বলেন, এর বাইরেও যারা বাধ্য হয়ে শরনার্থী শিবিরে গেছে এবং কলেরা আক্রান্ত হয়ে পথে ঘাটে নিহত হয়েছে সেই হিসাবও আমাদের কাছে নেই। যেসব রাজনৈতিক দল ফায়দা হাসিলের জন্য এতোদিনে এসে জঘন্য বিতর্ক তুলতে চেষ্টা করছে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা জরুরি।-বাংলা ট্রিবিউন

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত