টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

হাসান পড়তে চাই

এ.আর.বাহাদুর.বাহার

baচট্টগ্রাম, ২৮ জানুয়ারি (সিটিজি টাইমস) :   ছেলেটির নাম মোহাম্মদ হাসান, এক ভাই এক বোন, হাসান ছোট। পিতা: মৃত আব্দুল করিম, মাতা: ছেনুয়ারা বেগম। বাড়ি ছিল সাতকানিয়ার দ্বীপচরতি। সর্বনাশা নদী তাদের বাড়িকে নিজের গর্বে গ্রাস করে তাদেরকে গৃহহীন করে দেয়। ২০০০ সালে হাসানের বাবা মারা যায়। দিশেহারা হাসানের মা ছেলেমেয়েকে নিয়ে চট্টগ্রাম শহরে এসে বস্তি এলাকায় স্থান করে নেয়। তারপর শুরু হয় জীবনযুদ্ধ। বাসায় বাসায় পরিচারিকার কাজ করে হাসানের মা হাসান ও তার বড় বোন নাছিমা আক্তার কলিকে পড়াতে থাকে। মেয়ে কলি যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত তখন থেকেই টিউশন করে নিজের পড়ালেখার খরছ জোগাড় করছিল। হাসান লাজুক টাইপ হলেও বুদ্ধিমান ও কর্মট ছেলে। ছোটকালে নুরানী কোর্স শেষ করেছে, হেফজখানায় ভর্তি হয়ে ১২পারা কোরআন শরীফও মুখস্থ করেছিল কিন্তু শেষ করতে পারেনি। পড়ালেখা করার অদম্য ইচ্ছা তাকে আবার স্কুল মুখি করে।

হাসানের মা ছেনুয়ারা বিভিন্ন শুভাকাংখির সহযোগিতায় ও নিজে পরের বাড়ি কাজ করে হলেও ছেলে মেয়ের পড়ালেখার খরছ চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ভাগ্যের জোয়ারে ভাটা পড়ে ছেনুয়ারা বেগমের। এক সময় সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। মানুষের বাসায় আর কাজ করতে পারে না। ফলে হাসানদের খাওয়া পড়া ও পড়ালেখায় বাঁধা পড়ে। হাসান একসময় সংসারের হাল ধরার জন্য তরকারী বিক্রি শুরু করে। মজার ব্যাপার হল তরকারী বিক্রি করেও সে নিজের পড়ালেখা চালিয়ে যায়। এভাবেই সে গত নভেম্বরে সিএন্ডবি কলোনী স্কুল থেকে প্রাথমিক সমাপনী (পিএসসি) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ৪.৭৫ পয়েন্ট নিয়ে পাশ করে। হাসানের পিএসসি পরীক্ষার রোল নং ছিল ৩০৩৫, সাল ২০১৫ । দারিদ্রতার কারণে ভাল স্কুলে পড়ার চেষ্টা করতে পারেনি। বর্তমানে সে ঐ একই স্কুলের ৬ষ্ট শ্রেণির ছাত্র।

কিভাবে হাসানকে খুঁজে পেলাম: ডিসি রোডে মিয়ার বাপের মসজিদের পাশে মিষ্টির দোকান হানিবাইটস’র সামনে হাসান তরকারী বিক্রি করে। আমি কিছুদিন আগে হানিবাইটস এর মালিক আমার বন্ধু মনছুর আলম ভাইয়ের সাথে দেখা করতে গেলে অপর মালিক সাইফুল আজম ভাই আমার লেখালেখির ও সামাজিক কাজ নিয়ে আলোচনা করছিলেন। সাইফুল আজম ভাই জানালেন গত ১৭ই জানুয়ারী দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত আমার “ঝরে পড়া মেধা খুঁজে কলম ধরিয়ে দিন” লেখাটি তিনি পড়েছেন এবং “অক্ষর ফাউন্ডেশন” এর জন্য তিনি সাফল্য কামনা করেন। সেদিন কথা প্রসঙ্গে তিনি হাসানের কথা আমাকে বলেছিলেন।

পরবর্তীতে তরুণ সাংবাদিক মোঃ মোখতার হোসেনকে আমি হাসানের বিষয়ে খোঁজখবর নেয়ার দায়িত্ব দিই। মোখতার হোসেনের সরেজমিন তদন্তের ভিত্তিতে আমরা গত ২৬জানুয়ারী মঙ্গলবার হাসান ও তার মাকে ডেকে এনে ‘‘অক্ষর ফাউন্ডেশন’’এর পক্ষ থেকে ৬ষ্ট শ্রেণির একসেট অনুপম গাইড সেট, একটি ডিকশনারীসহ খাতা, কলম, পেন্সিল শিক্ষাসামগ্রী দিই। এসময় অক্ষর ফাউন্ডেশনের অস্থায়ী কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন, হাসানের মা, মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন, মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন মাসুদ, আকতার হোসেন রাসেল, মোহাম্মদ মোখতার হোসেন ও সালাউদ্দিন প্রমুখ। হাসানের মা জানান, ‘‘আমার মেয়ে নাছিমা আক্তার কলিও পড়ালেখায় খুবই ভাল এবং আগ্রহী ।

সে বর্তমানে চট্টগ্রাম সরকারী মহিলা কলেজে এইচ.এস.সি ২য় বর্ষে অধ্যয়নরত। আমরা গরিব বলে ছেলেমেয়েকে নিয়ে পড়ালেখা বেশী করানোর ব্যাপারে উচ্চাকাংখা করতে পারিনা। ‘’

‘‘অক্ষর ফাউন্ডেশন’’এর মাধ্যমে যারা সুবিধা বঞ্চিত ছাত্র/ছাত্রীর পড়ালেখার দায়িত্ব নেন আমরা তাদেরকে বলি ‘‘অক্ষর স্পন্সর’’ । আবার ‘‘অক্ষর ফাউন্ডেশন’’, ‘‘অক্ষর স্পন্সর’’ এর খরছে যেসব সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীকে তদারকি করে সেসব শিক্ষার্থীকে বলে ‘‘অক্ষর স্টুডেন্ট’’ । অসহায় ছেনুয়ারা বেগমের দুই ছেলে মেয়েকে ‘‘অক্ষর স্টুডেন্ট’’ হিসেবে নেয়ার মত কোন বিত্তবান কি ‘‘অক্ষর-স্পন্সর’’ হতে পারেন না ? অক্ষর ফাউন্ডেশনের মেইল আইডি: akkhornews@gmail.com

লেখক: সমাজকর্মী ও শিক্ষানুরাগী।

মতামত