টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মিরসরাইয়ে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে বিপ্লব 

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই প্রতিনিধি 

Popular-vegetables-are-beinচট্টগ্রাম, ২০  জানুয়ারি (সিটিজি টাইমস) : মিরসরাইয়ে উৎপন্ন হচ্ছে বিষমুক্ত শীতকালীন সবজী। উপজেলার প্রায় ২ হাজার ৭’শ হেক্টর জমিতে এবছর শীতকালীন সবজী চাষ করা হয়েছে। উৎপাদিত সবজি মিরসরাইয়ের চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম, ফেনী সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায়। প্রতিবছর পোকার আক্রমণ থেকে সবজী রক্ষা করার জন্য কীটনাশক ব্যবহার করা হলেও এই বছর সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারের ফলে কোন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়নি। এতে করে বিষমুক্ত সবজীর পাশাপাশি কীটনাশকের জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়নি কৃষকদের। অল্প খরচে বেশী লাভ হওয়ায় মিরসরাইয়ের কৃষকদের মাঝে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ পদ্ধতিতে সবজী চাষের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। সবজীর ফলন বেশী হলেও মধ্যসত্ত¡ভোগীদের কারণে সবজীর ভালো দাম না পাওয়ায় লোকসানের ভয়ে রয়েছে কৃষকরা।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, কৃষকরা জমিতে সবজী চারা রোপনের পর পোকার আক্রমণ থেকে চারা ও ফল রক্ষা করার জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার টাকার কীটনাশক ব্যবহার করেন। সবজী উৎপাদনে ব্যয়ের বড় একটি অংশ শুধু কীনাশকের জন্য যায়। কীটনাশক ব্যহারের ফলে পরিবেশ দূষিত হওয়া, ফসলের উপকারী পোকা মারা যাওয়া, সবজী বিষযুক্ত হওয়ার পাশাপাশি মানবদেহেরও ক্ষতি হয়। বিষমুক্ত সবজী চাষাবাদের পাশাপাশি কৃষকদের টাকা বাচাতে উপজেলার বিভিন্ন কৃষকের মাঝে এই বছর প্রায় ২৫ হাজার টাকা সেক্স ফেরোমন বিতরণ করা হয় সরকারীভাবে। জানা গেছে, প্রতি আড়াই শতাংশ জমিতে ১টি সেক্স ফেরোমন ব্যবহার করলে তার কার্যকারিতা থাকে প্রায় দেড় মাস। ১টি সেক্স ফেরোমন দিয়ে ১ হাজারেরও বেশী পোকা মারা সম্ভব। সেক্স ফেরোমন ফাঁদ দেওয়ার জন্য প্রথমে ১টি প্লাষ্টিকের কোটা নিয়ে তার ভেতরে স্ত্রী লিঙ্গ পোকার সেন্ট দেওয়া প্যাকেটটি একটি তার দিয়ে লাগিয়ে কোটার দু’পাশে কেটে দেওয়া হয় যাতে সেন্টে পুংলিঙ্গ পোকাগুলো ভেতরে আসে। এরপর কোটার মাথায় রশি দিয়ে বেধে দু’টি কাঠি মাটিতে পুঁতে তার মাঝখানে কোটাটি সোজা করে বেধে সবজি ক্ষেতে লাগাতে হবে। কোটার ভেতর পরিমাণমত সাবান মিশ্রিত পানি রাখা হয় ফলে পুংলিঙ্গ পোকাগুলো কোটার ভেতর ডুকে স্ত্রী লিঙ্গ পোকাটিকে খুঁজতে খুঁজতে যখন মাথা ঘুরিয়ে নীচে সাবান মিশ্রিত পানিতে পড়ে যাবে তখন সে মারা যাবে। পুংলিঙ্গ পোকাগুলো মারা যাওয়ার ফলে স্ত্রী লিঙ্গ পোকাগুলো আর বংশবিস্তার করতে পারেনা। ফলে গাছ ও সবজী দু’টোই পোকার আক্রমণ থেকে বিনা কীটনাশকে রক্ষা করা যায়। বাজারে একটি সেক্স ফেরোমন বিক্রি করা হয় ৩৫ টাকায়। আর একটি কোটা ১০-১৫ টাকা বিক্রি করা হয়। সব মিলিয়ে ১শত টাকা খরচ করে কৃষকরা অনায়াসে বিষমুক্ত সবজী চাষ করছে। ফুল কপি, বাধা কপি, বেগুন, লাউ, কুমড়া, সিসিঙ্গা, কাকরল, করলা চাষে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করা যায়। সবজী ভেদে পুলিঙ্গ পোকা ভীন্ন হওয়ায় সেক্স ফেরোমনও ভীন্ন স্ত্রীলিঙ্গের হরমনে পাওয়া যায়।

উপজেলার হাজীশ্বরাই এলাকার কৃষক আলী আকবর বলেন, আমি ৩৩ শতক জমিতে ৪০ হাজার টাকা ব্যয় করে বেগুন চাষ করেছি। বেগুনের চারা রোপনের সাথে সাথে কৃষি কর্মকর্তারা আমাদের সেক্স ফেরোমন সম্পর্কে ধারণা দেওয়ায় ও এটি ব্যবহারে সহায়তা করায় এই বছর জমিতে জৈব সারা ছাড়া পোকা মারা জন্য কোন কীটনাশক ব্যবহার করা লাগে নাই। প্রতি বছর পোকা গাছ ও বেগুন নষ্ট করে ফেললেও এই বছর সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করার ফলে পোকার আক্রমণ কমে গেছে।

তিনি আরো বলেন, মৌসুমের শুরুতে বেগুনের ভালো দাম পেলেও এখন দাম কমে গেছে। মধ্যসত্ত¡ভোগীদের কারণে কৃষকরা সবজীর ন্যায্য দাম পাচ্ছে না। প্রতিটি বাজারে, আড়তে যদি কৃষকদের সরাসরি সবজী বিক্রি করার সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে আমরা প্রকৃত দাম পাবো।

কৃষক আহমদ ছোবহান ও জাফর আহমদ বলেন, এবছর আমরা শীতকালীন সবজী বেগুন, বরকটি, আলু চাষ করেছি। প্রতিবছর পোকার আক্রমণ থেকে সবজী রক্ষা করার জন্য হাজার হাজার টাকা ব্যয় হলেও এই বছর সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করার ফলে শতকরা ৭৫ ভাগ পোকা এমনিতে মারা গেছে। অন্যান্য বছর ২’শ কেজি বেগুন তুললে প্রায় ৫০-৬০ কেজি বেগুন পোকা আক্রান্ত হয়ে যেতো। এবছর সেক্স ফেরোমন ফাঁদের ব্যবহারে ২’শ কেজি বেগুনে নষ্ট হচ্ছে ৫ থেকে ১০ কেজি।

কৃষক উজ্জল মজুমদার বলেন, এই বছর বৃষ্টি বেশী হওয়াতে সবজী চাষে আমাদের খরচ বেশী হয়েছে। সেক্স ফেরোমন ফাঁদ দিয়ে পোকা মারার ফলে সবজীর ফলন বেশী হলেও বাজারে দাম ভালো না থাকায় আমাদের লাভ বেশী হবে না। আমরা চাই কৃষকরা যাতে করে প্রতিটি বাজারে সরাসরি ক্রেতার কাছে সবজী, ধান বিক্রি করতে পারে সেজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা করা হয়।

রায়পুর এলাকার কৃষক অরুণ চৌধুরী বলেন, আমি ৯শতক জমিতে বাঁধাকপি চাষ করেছি। উৎপাদন খরচ হয়েছে প্রায় ৫ হাজার টাকা। আশা করি বর্তমান বাজার মূল্যে আমি বাজারে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কপি বিক্রি করতে পারবো। কৃষি অফিসের সহায়তায় সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করার ফলে কপি’র চারাতে কোন কীটনাশক ব্যবহার করা লাগেনি। বাধা কপিতে পোকা আক্রমণের ফলে কপি নষ্ট হয়ে যায় ফলে বাজারে বিক্রি করা যায় না। গত বছর আমার কীটনাশকের জন্য দেড় হাজার টাকা ব্যয় হয়েছিলো। এই বছর কোন কীটনাশকই ব্যবহার করা লাগেনি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহ আলম বলেন, সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করার ফলে শীতকালীন সবজীর ফলন ভালো হয়েছে। কৃষকদের মাঝে পদ্ধতিটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ফাঁদ ব্যবহার করার কারণে পোকা সবজীতে কোন আক্রমণ করতে পারেনি। ফলে বিষমুক্ত সবজী বিক্রি হচ্ছে উপজেলাজুড়ে। সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহারের ফলে পরিবেশের পাশাপাশি রক্ষা পাচ্ছে জীব বৈচিত্র। বিষমুক্ত সজবী চাষে কৃষকদের সাহায্য করতে মাঠ পর্যায়ে ৪০ জন কৃষি সহকারী কর্মকর্তা কাজ করেন। উপজেলার দুর্গাপুর, হাজীশ্বরাই, রায়পুর, ধুম, করেরহাট, হিঙ্গুলী, ওয়াহেদপুর, খৈয়াছড়া এলাকায় শীতকালীন সবজী চাষ বেশী করা হয়েছে।

মতামত