টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

জামায়াতের সম্পদ বাজেয়াপ্ত হবে

চট্টগ্রাম, ১৭ জানুয়ারি (সিটিজি টাইমস) :  স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি বলেছেন, জামায়াতে ইসলামীর এ দেশে থাকার কোনো অধিকার নেই। তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে আইন মন্ত্রণালয় কাজ করছে, নিষিদ্ধ হওয়ার পরেই তাদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে।

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী একটি অনলাই পত্রিকার সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন। এ সময় তিনি জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ ও তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে বলে জানান।

প্রসঙ্গত, জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ এবং তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবি দীর্ঘদিনের। এ দিকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গণজাগরণ মঞ্চ একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। ওই তালিকা ধরে গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার রায় নিয়ে ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি জোড়ালো হয়। সে সময় জামায়াতের বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করে গণজাগরণ মঞ্চ।

এ দিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সম্প্রতি বরিশালে এক অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা প্রসঙ্গে বলেছেন, খুব শিগগিরই জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হচ্ছে। এ বিষয়ে আইনের খসড়া হচ্ছে। আশা করছি জাতীয় সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে আইনটি পাশের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে।

জামায়াত প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী সরাসরি বিরোধীতা করেছে। শুধু তাই নয়, স্বাধীনতা যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত জেনে যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে তারা দেশকে মেধাহীন করার জন্য দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে।’

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়াউর রহমান এ দেশে জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করে। এরপর থেকেই তারা দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এখনও তারা দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য নানাভাবে চক্রান্ত করে চলেছে। এ দেশকে জঙ্গি রাষ্ট্রে পরিণত করার অপচেষ্টার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করছে। এ কারণে তাদের দেশে রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই।

জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কোনো তালিকা হয়েছে কিনা, আর সেগুলো কীভাবে চিহ্নিত করবেন- এ প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘জামায়াতের যে সব প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার একটি তালিকা হয়েছে বলে আমি জানি। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কে কে জড়িত, এদের অর্থায়নের উৎস এবং এসব অর্থ কোথায় কীভাবে ব্যয় হচ্ছে তা চিহ্নিত করা খুব কঠিন কিছু না। এসব বিষয় নিশ্চিত হয়েই ওইসব প্রতিষ্ঠান বাজেয়াপ্ত করা হবে।’

এ দিকে জামায়াতে ইসলামী নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে সরকার। এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশনা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

এ বিষয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ড. এম. আসলাম আলম বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই এ নিয়ে কথা হচ্ছিল। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আমাদের কাছে একটি চিঠি দেয়। তাতে জামায়াতে ইসলামীর পরিচালনাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয় দেখবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে নির্দেশনা পাঠিয়েছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘বিষয়টি অবশ্যই মন্ত্রণালয় নজরদারি করবে। সঠিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কিনা তা তদারকি করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক কী ব্যবস্থা নিচ্ছে তা প্রতিনিয়ত আমাদের অবহিত করবে। কোথাও সমস্যা হলে তা আমরা দেখবো।’

জামায়াতের রাজনীতির অর্থযোগান দাতা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারি উদ্যোগ প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়ায় গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, ‘গণজাগরণ মঞ্চ অন্দোলনের শুরু থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবির পাশাপাশি জামায়াতের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে সেগুলো বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানিয়ে আসছে। ’৭৫ পরবর্তী সময়ের সরকারগুলোর প্রত্যক্ষ মদদে দেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শুরু হয়েছে। বিগত সময়ে জামায়াত আর্থিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। আমরা তাদের আর্থিক শক্তি বন্ধ করার জন্য দাবি জানিয়ে আসছি। তাদের সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে সেগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ব্যবহার করার দাবি অনেক দিনের।’

তিনি আরো বলেন, ‘সরকার দীর্ঘদিন পরে হলেও জামায়াতের অর্থের উৎস খুঁজে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এটা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। এ উদ্যোগ আরো অনেক আগে নেওয়া উচিত ছিল। এ উদ্যোগ শুধু কাগজে-কলমে আবদ্ধ যেন না থাকে। নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে উদ্যোগ বাস্তবায়ন করতে হবে। দেশে ব্যাংক, বীমা, শিক্ষা, চিকিৎসা সেবাসহ শতাধিক প্রতিষ্ঠান এই সংগঠনটির রয়েছে।’

সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার হাতে রয়েছে জামায়াতের আর্থিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের তালিকা। ওই তালিকা ধরে তারা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর আগে গণজাগরণ মঞ্চও এ ধরনের একটি তালিকা প্রকাশ করেছিল। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি দেশে অসংখ্য কোচিং সেন্টার ও স্কুল-কলেজ জামায়াতের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বলে চিহ্নিত করে ওই তালিকা জনসম্মুখে প্রকাশ করে গণজাগরণ মঞ্চ। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, ইবনে সিনা ট্রাস্ট, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস, আল মারকাজুল হাসপাতাল, দিগন্ত টেলিভিশন, ফোকাস বিশ্ববিদ্যালয় কোচিং, রেটিনা মেডিক্যাল ভর্তি কোচিং, মানারাত ইউনিভার্সিটি, মহাখালী, ঢাকা; ফারইষ্ট লাইফ ইনস্যুরেন্স, আল-ফালাহ প্রিন্টিং প্রেস, বিডি ফুডস লিমিটেড, দৈনিক নয়া দিগন্ত, ফুয়াদ আল খতিব মেডিক্যাল ট্রাস্ট, বুয়েট ভর্তি কোচিং কনক্রিট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং ইনডেক্স, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং রেডিয়াম, ডুয়েট (গাজীপুর) ভর্তি কোচিং অপটিমাম, কেয়ারি লি., দৈনিক সংগ্রাম, কিশোরকণ্ঠ ফাউন্ডেশন, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, নর্দার্র্ন ইউনিভার্সিটি ও ইষ্টার্ন ইউনিভার্সিটি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং ‘ফোকাস’, মেডিক্যালে ভর্তির জন্য ‘রেটিনা’, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তির জন্য ‘কনক্রিট’, ‘কনসেপ্ট’ ও ‘এক্সিলেন্ট, ইয়ুথ গ্রুপ, ডেভেলপার কোরাল রীফ, মিশন ডেভেলপারস, এস.এ.এফ,এম.ডি.সি গ্রুপ, কেয়ারী, ইনটিমেট হাউজিং, সোনারগাঁ হাউজিং, লালমাটিয়া হাউজিং, সিলভার ভিলেজ হাউজিং, ওয়ান সিটি, পিংক সিটি, আবাসন সিটি।

গণজাগরণ মঞ্চের তালিকায় আরও রয়েছে বাংলাদেশে আদর্শ শিক্ষা পরিষদ, আল আমিন ট্রাস্ট, প্রিন্টিং ও প্রকাশনা বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে সিদ্দিকীয়া পাবলিকেশন্স, আধুনিক প্রকাশনী, প্রীতি প্রকাশন, কিশোরকণ্ঠ প্রকাশনী, ফুলকুঁড়ি প্রকাশনী, মিজান পাবলিকেশন্স, ইষ্টিকুটুম, আল্পনা প্রকাশনী, গণিত ফাউন্ডেশন, প্রফেসর’স, কারেন্ট নিউজ, সাজ প্রকাশন, সৌরভ, সাহিত্যকাল, নবাঙ্কুর, সাহিত্যশিল্প, শিল্প কোণ, আযান, অনুশীলন, ফুলকলি, দিগন্ত, পাঞ্জেরী, আল কোরআন প্রকাশনী, প্রফেসরস গাইড, ইয়ুথ ওয়েভ, পৃথিবী, আল মুরতাদা ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি, কৃষি কল্যাণ সমিতি, দারুস সালাম সোসাইটি ও আল হেরা একাডেমি।

তালিকায় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে সিএনসি, বাংলা সাহিত্য পরিষদ, স্বদেশ সাংস্কৃতিক পরিষদ, উত্সঙ্গ, সৃজন চিন্তন, মৃত্তিকা একাডেমি, প্রতিভা ফাউন্ডেশন, শহীদ মালেক ফাউন্ডেশন, কিশোরকণ্ঠ ফাউন্ডেশন, সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী, বিপরীত উচ্চারণ, পল্টন সাহিত্য পরিষদ, ফররুখ পরিষদ, চত্বর সাহিত্য পরিষদ, কিশোর কলম সাহিত্য পরিষদ, ফুলকুঁড়ি সাহিত্য পরিষদ, নতুন কলম সাহিত্য পরিষদ, আল হেরা সাহিত্য পরিষদ, মাস্তুল সাহিত্য সংসদ, সম্মিলিত সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংসদ, স্পন্দন সাহিত্য পরিষদ, কবি সংসদ বাংলাদেশ, কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ সাহিত্য সংসদ, কানামাছি সাহিত্য পরিষদ, অনুশীলন সাহিত্য পরিষদ, শীলন সাহিত্য একাডেমী, পারফর্মিং আর্ট সেন্টার, সংগ্রাম সাহিত্য পরিষদ, উচ্ছ্বাস সাহিত্য সংসদ, ইসলামী সাহিত্য পরিষদ, হিলফুল ফুজুল, দাবানল একাডেমী, মওদুদী রিসার্চ সংসদ, বাংলাদেশ সাহিত্য কেন্দ্র নামে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্স কো. লি., ইসলামী ইন্সুরেন্স কো. লি., তাকাফুল ইসলামী লাইফ ইন্সুরেন্স।

এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জামায়াতে ইসলামীকে ‘ক্রিমিনাল দল’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। জামায়াতের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের দাবির মধ্যে জামায়াতের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এ নির্দেশ এল। যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যুদ- কার্যকরের দিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে এ বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়। এতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ‘জামায়াত নিয়ন্ত্রিত’ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠনের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।-রাইজিংবিডি

মতামত