টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

আগামী সপ্তাহে ইউপি নির্বাচনের বিধিমালা

vot-upচট্টগ্রাম, ১৩ জানুয়ারি (সিটিজি টাইমস) : ইউপি নির্বাচন মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে ধাপে-ধাপে দেশের সবগুলো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তোড়জোড় শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মার্চের শেষ দিকে প্রথম ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে কমিশন মঙ্গলবার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ লক্ষ্যে নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ও আচরণ বিধিমালার খসড়াও নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে কমিশন। আগামী সপ্তাহের প্রথম দিকে এ বিধিমালা ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, তাড়াহুড়া করে পৌরসভা নির্বাচন করতে গিয়ে এর আচরণবিধি থেকে শুরু করে কয়েকটি ক্ষেত্রে খানিকটা জটিলতায় পড়তে হয় কমিশনকে। এছাড়া, দেশের ইতিহাসে এবার প্রথম দলীয়িভিত্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় কমিশনকে পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠানে বেশ বেগ পেতে হয়। কমিশন মনে করেছে, পৌর নির্বাচনে যেসব ভুলভ্রান্তি তাদের দেখা গেছে সেটাকে কাজে লাগিয়ে দলীয়ভিত্তিতে অনুষ্ঠেয় ইউপি নির্বাচনকে তারা সুন্দর ও সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে চায়। যার কারনে আগেভাগে প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে কমিশন।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশন সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, আইন অনুযায়ী আমাদের মার্চ মাসে অন্তত একধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করতে হবে। সেই লক্ষ্যে আমরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছি। ইউপি নির্বাচনের নির্বাচন বিধিমালা ও আচরণ বিধিমালা আগামী সপ্তাহের মধ্যে ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে ইসি সচিব জানান।

সূত্রে জানা গেছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় থেকে নির্বাচনের নির্বাচন বিধিমালা ও আচরণ বিধিমালার খসড়া মঙ্গলবার কমিশনে উত্থাপন করা হলে কয়েকটি বিষয়ে সংশোধনী সাপেক্ষে সেটা অনুমোদন দেওয়া হয়। সংশোধিত এ বিধিমলা শিগগিরই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে ভেটিংয়ের জন্য। মন্ত্রণালয়ের ভেটিং পেলে কমিশন এটা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি হবে।

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পৌরসভা নির্বাচনের বিধিমালা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর সেটা বেশ কয়েকদিন আটকে ছিল। যার কারণে যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানে একটা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছিল। গতবারের এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কমিশন হাতে কিছুটা সময় রেখেই মন্ত্রণালয়ে পাঠাচ্ছে।

আইন অনুযায়ী, পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ইউপিতে নির্বাচন করতে হবে। এই হিসেবে এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে চার হাজারের বেশি ইউপির মেয়াদ উত্তীর্ণ হবে। এ জন্য কমিশন সময় হাতে রেখে ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সমযে সপ্তাহে তফসিল ঘোষণা করে মার্চের শেষ দিকে প্রথম দফায় ভোট গ্রহণ শুরু করতে চায়।

দলীয় ভিত্তিতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় ব্যালটে প্রার্থীদের প্রতীকের পাশপাশি প্রার্থীদের নামও যুক্ত থাকবে। এ জন্য প্রত্যেক ইউপিতে ভিন্নভিন্ন ব্যালট ছাপাতে হবে ইসিকে। বিষয়টি কিছুটা সময় সাপেক্ষ হওয়ায় কমিশন তফসিল থেকে ভোটগ্রহণের সময়ের ব্যবধানটা একটু বেশি রাখতে চায়। এক্ষেত্রে অন্তত চল্লিশ দিন সময় হাতে পেতে চায় কমিশন।

ইউপি নির্বাচন প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, আইনি বাধ্যবাধকতার কারণেই প্রথম ধাপের নির্বাচন মার্চের মধ্যে শেষ করতে হবে। এরপর ধাপে-ধাপে জুনের মধ্যে বাকি ইউপিতে নির্বাচন করা হবে। সে অনুযায়ী কমিশন প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করেছে। তিনি বলেন, যেহেতু নির্বাচন দলীয়ভাবে হবে, তাই নির্বাচন পরিচালনা বিধি ও আচরণবিধি নতুন করে তৈরি করা হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যে বিধি চূড়ান্ত করে যাচাই-বাছাইয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

২০১১ সালে প্রথম ধাপে মার্চ-এপ্রিল মাসে ৫৩৮টি ইউপিতে নির্বাচন হয়েছিল। এরপর মে মাসে ১৩৪টি, জুন মাসে ৩ হাজার ১৫২টি, জুলাই মাসে ৪০৮টি এবং ১ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে ৩৪টি ইউপিতে নির্বাচন হয়েছিল। এর বাইরে ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে মেয়াদ শেষ হওয়ায় ১১২টি ইউপিতে নির্বাচন করা হয়।

কমিশস ‍সূত্র জানায়, দলীয়ভিত্তিতে অনুষ্ঠিতব্য এই ইউপি নির্বাচনের নির্বাচন পরিচালনা বিধি ও আচরণবিধিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থিতার শর্ত, প্রচারণা ও ব্যয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন আসছে বলে জানা গেছে।

সহজ হচ্ছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রার্থিতা
ইউনিয়ন পরিষদের স্বতন্ত্র প্রার্থিতার শর্ত জাতীয় সংসদ ও পৌরসভার তুলনায় অনেকটাই সহজ করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। এ নির্বাচনের খসড়া বিধিমালায় স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী হতে ভোটার স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা দেওয়ার শর্ত পুরোটাই তুলে দিতে চায় তারা।

প্রসঙ্গত, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে শতকরা ১ ভাগ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। সদ্য সমাপ্ত পৌরসভা নির্বাচনে স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থীদের ১০০ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বিধান রাখা হয়।

স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী হতে ভোটার স্বাক্ষরযুক্ত তালিকা দেওয়ার শর্ত রাখার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ইসি সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা (কমিশন সচিবালয়) কোনও শর্ত রাখিনি। বিষয়টির ওপর কমিশন সিদ্ধান্ত নেবেন।

দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়নের বিষয়ে পৌর নির্বাচনের মতোই বিধান রাখা হয়েছে ইউপির খসড়া বিধিমালায়। এতে রাজনৈতিক দলের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক বা সমপর্যায়ের পদাধিকারী বা তাদের নিকট থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি চেয়ারম্যান প্রার্থীর মনোনয়ন দিতে পারবেন। কোনও রাজনৈতিক দল ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যান পদে একাধিক ব্যক্তির মনোনয়ন দিতে পারবে না। একাধিক ব্যক্তিকে মনোনয়ন দিলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে ওই দলের সবার মনোনয়নপত্র বাতিল হবে।

উপজেলা চেয়ারম্যানের প্রচারণা নিয়ে দ্বন্দ্ব

নির্বাচনি প্রচারণায় পৌরসভার মতো ইউনিয়ন পরিষদে মন্ত্রী-এমপি, সিটি করপোরেশনের মেয়রদের ওপর বিধিনিষেধ থাকছে। তবে, এর বাইরে উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়রদের এ বিধি-নিষেধের আওতায় আনার প্রস্তাব কমিশন বিভক্ত মত দিয়েছেন। একজন কমিশন এর পক্ষে মত দিলে অন্য একজন তার বিরোধিতা করে পৌরসভার বিধানটি হুবহু রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবারের বৈঠকে কমিশন এ বিষয়ে একমত হতে পারেনি বলে জানা গেছে।

প্রতীক বরাদ্দের আগে প্রচারণা নয়

পৌরসভা নির্বাচনের ভোট গ্রহণের ২১ দিন প্রচারণার সুযোগ থাকলেও ইউপিতে তা থাকছে না। এ বিধানের কারণে সদ্য সমাপ্ত পৌর নির্বাচনে প্রচারণায় প্রতীক বরাদ্দের আগে দলীয় প্রার্থীরা তাদের নির্ধারিত প্রতীক নিয় প্রচারণায় যেতে পারবেন কি না—এ নিয়ে খোদ কমিশনই বিভক্ত মতপ্রকাশ করে। যে কারণে ইউপি নির্বাচনের বিধিমালায় প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে প্রচারণার বিধান রাখা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রার্থী বা রাজনৈতিক দল বা মনোনীত প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা তাদের পক্ষে অন্য কোনও ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান প্রতীক বরাদ্দের আগে প্রচারণা শুরু করতে পারবেন না। এছাড়া সভা-সমাবেশে পৌর নির্বাচনের মতোই বিধি-নিষেধ থাকছে।

রাজনৈতিক দলের ব্যয়

খসড়া বিধিমালায় ইউনিয়ন পরিষদে রাজনৈতিক দলের সর্বোচ্চ ব্যয় ৩০ হাজার টাকা করা হয়েছে। কোনও রাজনৈতিক দল ১০ হাজার টাকার বেশি কোনও দান চেক ব্যতীত নিতে পারবে না। রাজনৈতিক দল এ বিধি অমান্য করলে ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

নারী প্রার্থীদের বিতর্কিত প্রতীক বাদ

সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের জন্য অবমাননাকর প্রতীক নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে কমিশন। পৌর নির্বাচন ও এর আগে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের জন্য চুড়ি, ফ্রক, পুতুল, ভ্যানিটি ব্যাগ ইত্যাদি প্রতীক বরাদ্দ করা হয়েছিল। তখন নারী নেত্রীসহ সমাজের সচেতন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় এবং আপত্তি ও প্রতিবাদ জানানো হয়। তাই কমিশন ইউপি নির্বাচনের বিধিতে নতুন প্রতীক প্রস্তাব করেছে। এবার নারীদের জন্য কলম, ক্যামেরা, তালগাছ, জিরাফ, বই, বক, কলস, মাইক, হেলিকপ্টার ও সূর্যমুখী ফুল প্রতীক হিসেবে রাখা হয়েছে।

ভোট দিতে পারবেন নতুন ভোটাররা

আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন নতুন ভোটাররা। নির্বাচন কমিশন সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। আগামী ৩১ জানুয়ারি সারাদেশে হালনাগাদকৃত নতুন ভোটারদের তালিকা প্রকাশ করা হবে। গত ২ জানুয়ারি শনিবার খসড়া ভোটারের তালিকা প্রকাশ করা হয়। খসড়া তালিকা অনুযায়ী হালনাগাদে নতুন অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ৪৬ লাখ ৭২ হাজার ১৭৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২৬ লাখ ২৫ হাজার ৮০৬ জন। নারী ২০ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭০ জন। হালনাগাদ শেষে ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে নয় কোটি ৬২ লাখ তিন হাজার ৭০৬। প্রসঙ্গত, সদ্য সমাপ্ত পৌর নির্বাচনে নতুন ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি।

সুত্রঃ বাংলা ট্রিবিউন

মতামত