টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

রাউজানে গৃহবধু রহস্যজনক মৃত্যু : স্বামী শাশুরিসহ আটক ৩ জন জেল হাজতে

এস.এম. ইউসুফ উদ্দিন
রাউজান প্রতিনিধি 

Raozam-asp-charkelচট্টগ্রাম, ১২ জানুয়ারি (সিটিজি টাইমস) :  রাউজানের নোয়াপাড়ায় গৃহবধু উর্মী আকতারের (২৬) রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় মঙ্গলবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন হাটহাজারী পুলিশ সার্কেলের এএসপি মসিহুদ্দৌলাসহ পুলিশের একটি বিশেষ টিম। এসময় তারা ঘটনাস্থল কচুখাইন গ্রামের কাদের সওদাগরের বাড়ীটি পরিদর্শন করে ঘটনার বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। এছাড়াও স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে তথ্য জেনে ঘটনার আসল রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করেন পুলিশের এই উর্ধতন কর্মকর্তারা। এসময় বাড়ীটির পরিবারের বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখেন।

এসময় নিহত উর্মীর বড় বোন মমতাজ ফাতেমা পপি সার্কেল এএসপি মছিহুদ্দৌলা ও সাংবাদিকদের জানান, উর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের আমরা বিচার চাই। তিনি দাবী করেন উর্মীকে বিয়ের পর থেকে শাশুড় বাড়ীর লোকজন প্রায় সময় নানা ধরনের নির্যাতন করতো। এমনকি এক দেবর উর্মীকে ছুরিকাঘাত করে হাত কেটে দিয়েছিল। যেটি নিয়ে মামলাও হয়েছিল। পরে উভয় পক্ষের সমজোতায় এটি নিষ্পত্তি হয়েছিল।

অপরদিকে উর্মীর বোন নাজমা আকতার বলেন, উর্মীর হত্যাকাণ্ডের পেছনে স্বামী ইকবাল জড়িত। সে আমার বোনকে মেরেছে। উর্মীর মৃত্যুর পর তার সাথে কথা বলে বিষয়টি আমরা নিশ্চিত হই। কারণ স্ত্রীর মৃত্যুর পর তার কোন আপসোস দেখতে পায়নি। সে পুলিশের গাড়ীতে বসে নিজের সরকারী চাকুরী হারানোর কথা চিন্তা করে আমাদের বলেছেন আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। আমার সরকারী চাকুরীটার কি হবে? তা ছাড়া সাংসারিক জীবন বোন উর্মী সব সময় স্বামী ইকবালের কৃপনতার কথা বলতো। বোন একটু সৌখিন ছিল। কিন্তু স্বামী ইকবাল স্ত্রীকে তেমন সৌখিনভাবে চালাতে অস্বীকৃতি জানাতো। তাই তাই তাদের মধ্যে মাঝে মধ্যে জগড়া বিবাদ হতো। বোনের সুখের কথা ভেবে আমরা সব সময় সহযোগীতা করে যেতাম যেন শাশুর বাড়ীতে তার মন ছোট না থাকে।

তিনি আরো বলেন, গত বছর উর্মীকে ভাসুরেরা মিলে ব্যাপক মারধর করে। তখন উর্মীকে আমি আমার নাছিরাবাদের বাসায় এনে ১০ দিন বাসায় রেখে চিকিৎসা দিই। কোর্টে মামলা দাযের করি। তিনি আরো বলেন, বোন উর্মীর লাশ যখন আমরা শেষ গোসল দিই তখন তার সারা শরীরে বেশ কিছু ক্ষত দেখি।

মঙ্গলবার দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সার্কেল এইসপি সাংবাদিকদের বলেন, বাদীর আবেদনের প্রেক্ষিতে ঘটনার আসল রহস্য উদঘাটনের চেষ্টায় পরির্দশনে আসা। এটি হত্যাকাণ্ড কি না ময়না তদন্ত প্রতিবেদন শেষে বিস্তারিত জানাযাবে। তারপরও আমরা ঘটনাটি অধিকতর তদন্ত করে রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করছি। শীঘ্রই পালাতক আসামীদের গ্রেপ্তার করতে জোরালো অভিযান পরিচালনা করা হবে। আটককৃতদের রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাবাদ করা হবে।

রাউজান থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীর বলেন, মামলাটি অত্যান্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কেউ যাতে প্রভাবিত করতে না পারে তার জন্যে ইতিমধ্যে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নোয়াপাড়া পুলিশ ফাঁড়ীর ইনচার্জ টুটন মজুমদারকে পরির্বতন করা হয়েছে। মামলাটি এখন আমি নিজেই তদন্ত করব। লোকজনের স্বাক্ষী নিচ্ছি। আশা করছি শীঘ্রই মুল রহস্য বের হয়ে আসবে। এদিকে মামলার প্রথমে তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা টুটন মজুমদার বলেন, আমি বিস্তারিত যাচাই করে ফাঁিসতে ঝুলে আত্মহত্যা হতে পারে বলে প্রতিবেদন তৈরী করেছিলাম। এতে বাদী পক্ষের আপত্তি থাকায় আমাকে পরির্বতন করা হয়।

এদিকে ঘটনার রাতে উর্মীর পিতা হাজী এনামুল হক থানায় নয়জনকে আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের করলেও এটি হত্যা না আত্মহত্যা এ নিয়ে এলাকায় নানা রকম আলোচনা চলছে। স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার ও সাধারণ লোকজন বলছে এটি একটি আত্মহত্যার ঘটনা।

এ ঘটনায় রাউজান থানা পুলিশ গত শনিবার গভীর রাতে উর্মীর শাশুরী লায়লা বেগম (৬৫) ও তার বোন নুর বানু (৪০) ও উর্মীর স্বামী চট্টগ্রাম খাদ্য বিভাগের উপ- পরিদর্শক ইকবাল হোসেনকে আটক করে আদালতে সোপর্দ করলে আদালত তাদের জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। উলে­খ্য ৯ জানুয়ারি শনিবার সন্ধ্যার পর গৃহবধু উর্মীর ঝুলন্ত লাশ কচুখাইন গ্রামের কাদের সওদাগরের শাশুর বাড়ির রান্না ঘর থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছিল।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কচুখাইন গ্রামের কাদের সওদাগরের বিশাল বাড়ীতে গিয়ে দেখা যায় উর্মীর শাশুর বাড়ি পৃথক পৃথক ভবন গুলো খালি পড়ে আছে। বাড়িতে কোনো লোকজন নেই। ৭/৮ টি আলাদা আলাদা ঘরের সবগুলোতেই তালা দেওয়া।

সরেজমিন গিয়ে এলাকার লোকজনের সাথে কথা বললে তাদের ভাষ্যমতে আবদুল কাদের সওদাগরের পাঁচ পুত্রের মধ্যে চতুর্থ পুত্র ইকবাল হোসেন স্ত্রী উর্মী। ইকবালের সাথে তার ভাইদের মধ্যে সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল কয়েক বছর থেকে। এই বিরোধে জের ধরে স্থানীয় ভাবে বেশ কয়েক বার সালিশ নালিশ হয়েছে।

এদিকে দাম্পত্য জীবনে ইকবাল ও তার স্ত্রী উর্মীর সাথে তেমন সখ্যতা ছিল না শাশুরীসহ ভাসুর পরিবারের সাথে। পারিবারিক এই অশান্তির মাঝে ইকবালও বিভিন্ন সময স্ত্রীর উশৃংখল জীবন যাপন দেখে মারধর করতো বলে জানাগেছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল কালাম বলেছেন তিনি লোকজনের কাছে শুনে ঘটনার দিন সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলে গেছেন। সেখানে গিয়ে দেখেন উর্মী ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে দিয়ে স্বামীর ডায়রীসহ বেশকিছু বই পত্র ও আসবাব পত্রে আগুন দিয়েছে। ঘরের ভেন্টিলেটার দিয়ে দেখতে পান ঘরের পিছনের একটি কক্ষে পাখার সাথে ওড়নার সাথে ঝুলে আছে উর্মীর লাশ। তখন ঘরের উভয় দিকের দরজা জানালা ভিতর থেকে আটকানো ছিল। পরে ঘরের দরজা ভেঙ্গে তিনিসহ এলাকার লোকজন ঝুলন্ত লাশ দেখতে পান। এরপর পুলিশ এসে উর্মীর লাশ নামিয়ে নিয়ে যায়।

জানা গেছে উর্মীর স্বামী ইকবালকে মামলার আসামী করা হলেও সে পুলিশের কাছে ভিন্ন ভিন্ন জবানবন্দি দিয়েছে। প্রথমে তার ভাই ও তাদের পরিবারের সদস্যরা নির্যাতন করে স্ত্রী উর্মীকে হত্যা করেছে বলে জানালেও পরে উর্মী নিজেই আত্মহত্যা করেছে বলে জানায়। নিহতের পিতা এই হত্যা মামলায় আসামী করেছেন তাদের মধ্যে আছে মরহুম আবদুল কাদেরের স্ত্রী লায়লা বেগম, লায়লা বেগমের বোন ঝি নুর বেগম, পুত্র আকবর হোসেন, সিরাজুল ইসলাম, সৈয়দ হোসেন, মোয়াজ্জেম হোসেন, ইকবাল হোসেন, ডেজি আকতারসহ আরো কয়েকজন।

মতামত