টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

প্রয়োজনে আরও কঠোর হবো

চট্টগ্রাম, ১২ জানুয়ারি (সিটিজি টাইমস) :  কেউ বাংলাদেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেন, সরকার বিপথগামীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে প্রয়োজনে আরও কঠোর হবে। উন্নয়নের ধারা এগিয়ে নিতে দেশবাসীর সর্বাত্মক সহযোগিতাও চান শেখ হাসিনা। সরকারের দুই বছর পূর্তিতে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে তিনি এই আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ দেশকে স্বাধীনতা দিয়েছে, গণতন্ত্র দিয়েছে। যখনই সরকার গঠন করেছে তখনই উন্নয়ন করেছে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে হবে বলেও আত্মবিশ্বাসী প্রথানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সকলের মিলিত প্রচেষ্টায় দেশ যখন উন্নয়নের সোপানে এগিয়ে যাচ্ছে তখন মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তির দোসররা আবারও অস্থিতিশীলতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করছে। কিন্তু একটি গোষ্ঠী সম্প্রীতি নষ্ট করতে চাইছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কাউকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে দেওয়া হবে না। বিপথগামীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং প্রয়োজনে আরও কঠোর হবো’।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তির আসল উদ্দেশ্য হল জঙ্গিবাদ উস্কে দেওয়া, যুদ্ধাপরাধী, গণহত্যাকারী, রাজাকার-আলবদরদের রক্ষা করা। তিনি বলেন, ‘আমাদের ওয়াদা ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার। আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছি, রায় কার্যকর করা হচ্ছে, কেউই বিচার বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না’। মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কারও কোন কটাক্ষ সহ্য করা হবে না বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন যারা ইতিহাস বিকৃত করবে তারা ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কোন ধরনের কটাক্ষ সহ্য করা হবে না।

গত সপ্তাহে শান্তিপূর্ণভাবে ২২৩টি পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে দাবি করেন ভোটে জঙ্গি ও পেট্রোল বোমাবাজদের প্রত্যাখ্যান করায় দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক ঐতিহাসিক দিকসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আসুন, দল-মত ও বিভক্তির উর্ধ্বে উঠে এই উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখি। দেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করি’।

৩০ মিনিটের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচালে বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলনে নাশকতা, নির্বাচনের এক বছর পূর্তিতে বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলন, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প, যুদ্ধাপরাধের বিচার, ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ২০০৯ সালে। কিন্তু সাত বছরে ব্যাপক উন্নয়নের কারণে এখন বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল বাংলাদেশ।

বিএনপি-জামায়াত জোটের ভোটবিরোধী আন্দোলনকে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের দোসরদের নির্মমতার সঙ্গে তুলনা করেন শেখ হাসিনা। বলেন, আন্দোলনের নামে পেট্রোলবোমায় ২৩১ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আহত হয় ১ হাজার ১৮০ জন আহত হয়। ২ হাজার ৯০৩ টি গাড়ি, ১৮টি রেল গাড়ি ও ৮টি লঞ্চে আগুন দেয়। ৭০টি সরকারি অফিস ও স্থাপনা ভাঙচুর এবং ৬টি ভূমি অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৬.৫ শতাংশ। এর আগের ৫ বছরে গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.২ শতাংশ। বিশ্ব অর্থনীতিতে অধিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিক থেকে পঞ্চম স্থানে বাংলাদেশ। এই সময় মাথাপিছু আয় ছিল ৫৪৩ ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৩১৪ ডলারে। ৫ কোটি মানুষ নিম্ন-আয়ের স্তর থেকে মধ্যম আয়ের স্তরে উন্নীত হয়েছে। দারিদ্র্যের হার ৪১.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২২.৪ শতাংশ হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৬ সালে অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ২৪.২ শতাংশ। তা এখন ৭.৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এই সময় দেশে সরকারি ও বেসরকারিভাবে দেড় কোটি মানুষের চাকরি হয়েছে। আর বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে ৩৫ লাখ ৭৫ হাজার ৩৪৮ জন কর্মীর ।

২০২১ সালের মধ্যে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার ঘোষণাও দেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের উন্নয়নে সারাদেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার কথাও জানান তিনি। ঢাকায় হাতিরঝিল প্রকল্পসহ বেশ কিছু উড়াল সেতুর উদ্বোধনের কথা বলে অচিরেই মগবাজার-মালিবাগ উড়ালসেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হবে বলেও জানান তিনি।

পদ্মাসেতু দিয়ে ২০১৮ সালের মধ্যে পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল করবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, এই সেতু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ শিল্প স্থাপনা বাড়বে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। মাওয়া, শিবচর ও জাজিরাকে ঘিরে আধুনিক স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার ঘোষণাও দেন তিনি।

কৃষিখাতে উন্নয়নের বর্ণনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে বর্তমান সরকার দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশ এখন চাল রপ্তানি শুরু করেছে।

শিক্ষা বিস্তারে সরকারের ভূমিকা বর্ণনা করে শেখ হাসিনা বলেন, দেশের বর্তমানে শিক্ষার হার ৭১ শতাংশ। আওয়ামী লীগ সরকার ৭ বছরে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে ১৯২ কোটি বই বিতরণ করেছে। ২৬ হাজার ১৯৩ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ এবং ১ লাখ ২০ হাজার শিক্ষকের চাকরি সরকারি করা হয়েছে। যে সকল উপজেলায় সরকারি স্কুল ও কলেজ নাই সেখানে একটি করে স্কুল ও কলেজ জাতীয়করণ করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। প্রতিটি জেলায় একটি করে সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার আশ্বাসও দেন প্রধানমন্ত্রী। পর্যায়ক্রমে সব স্কুলে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ চালু করা হবে বলেও জানান তিনি।

স্বাস্থ্যখাতে সরকারের কর্মকা-ের বর্ণনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাড়ে ১৬ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে গ্রামের মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। মানুষ বিনামূল্যে ৩২ পদের ঔষধ পাচ্ছেন। সাড়ে ১২ হাজারের বেশি ডাক্তার ও ১৩ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আরও ১০ হাজার নার্স নিয়োগ দেওয়া হবে। নতুন ১১ টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ চালু করা হয়েছে।

দারিদ্র্যসীমার নীচে বসবাসকারী ১ লাখ পরিবারের মধ্যে স্বাস্থ্য কার্ড বিতরণ করা হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। পর্যায়ক্রমে সারাদেশে সব দরিদ্র পরিবারের মধ্যে এই কার্ড বিতরণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সরকার নিরলস কাজ করছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৫ হাজার ২৭৫ টি ডিজিটাল সেন্টার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ২০০ ধরণের ডিজিটাল সেবা দেয়া হচ্ছে। এ খাতের উদ্যোক্তাদের মাসিক আয় ২০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। ২০১৬ সালেই মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করা হবে বলেও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইন্টারনেট ব্যবহারে এখন ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ। থ্রিজি সেবা চালু করা হয়েছে। চলতি বছরই ফোর জি চালু করা হবে। এক লাখ ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২ হাজার ৪০০ মেঘাওয়াটের রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র – স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধের চেষ্টা, বতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি ৪ মাস থেকে ৬ মাস করার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন লিঙ্গ সমতায় দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষস্থানে।

সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন ও পদমর্যাদা বৃদ্ধি এবং ব্যাপক পদোন্নতির সুযোগ করে দিয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ১৯৭৪ সালের প্রতিরক্ষা নীতির আলোকে আর্মড ফোর্সেস গোল- ২০৩০ নির্ধারণ করা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীকে অত্যাধুনিক যুদ্ধসরঞ্জাম দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে। পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, বিজিবি ও সশস্ত্রবাহিনীর ঝুঁকিভাতা দেওয়া হচ্ছে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন বাড়িয়ে ৫ হাজার ৩০০ টাকা করা হয়েছে।

সামাজিক উন্নয়ন খাতে সরকারের অবদানের বর্ণনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রায় ৪৭ লাখ ১৩ হাজার মানুষ বয়স্ক, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্ত ও প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। সরকার হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি দিয়েছে।

সরকার দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করেছে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

গণমাধ্যম এখন সম্পূূর্ণ স্বাধীন দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে সরকারের সমালোচনা করতে পারছে। সরকার নতুন বেসরকারি ৩২টি টেলিভিশন, ২২টি এফএম রেডিও এবং ৩২টি কমিউনিটি রেডিও চ্যানেলের অনুমোদন দিয়েছে।

বিশ্বকাপ ক্রিকেটে প্রথমবারের মত বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে খেলাসহ ক্রীড়াখাতে নানা সাফল্যের বর্ণনা দেন প্রধানমন্ত্রী।

এমডিজি অ্যাওয়ার্ড, সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড এবং ‘ওয়ার্ল্ড সামিট অন ইনফরমেশন সোসাইটি’ পুরস্কার, জাতিসংঘ আমাকে পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ’ বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি করেছে জানিয়ে এই সম্মান দেশবাসীকে উৎসর্গ করেন প্রধানমন্ত্রী।

ভারতের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময়ে ১০ হাজার ৫০ একর জমি বাংলাদেশের ভূখ-ে যোগ হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল-ভূটান এই চার দেশের মধ্যে মোটর ভেহিক্যাল চুক্তি সই হয়েছে।

মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমার বিরোধ সমাধা হওয়ায় সমুদ্রে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় দেশের নিরঙ্কুশ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, এরফলে বিশাল সমুদ্র এলাকায় সমুদ্রসম্পদ আহরণের পথ সুগম হয়েছে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত