টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

কাল ভোট, নানা শঙ্কা

চট্টগ্রাম, ২৯ ডিসেম্বর (সিটিজি টাইমস):  পৌরসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণ আগামীকাল বুধবার। সোমবার রাত ১২টায় নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়েছে। ভোটগ্রহণের প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন।

তবে প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে দেশের ২৩৩ পৌরসভার এই নির্বাচনকে ঘিরে রয়েছে নানা শঙ্কা থাকলেও অধিকাংশ পৌরসভায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে বলে জানা গেছে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় স্থানীয় ভোটে জাতীয় নির্বাচনের আমেজ বইছে। দুই শতাধিক প্রার্থীর মধ্যে জোর লড়াই হবে বলে জানা গেছে। লড়াইটা হবে মূলত আওয়ামী লীগ আর বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে। তবে ইতোমধ্যে সাতটি পৌরসভায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন সরকারি দলের প্রার্থীরা।

প্রচার-প্রচারণার শেষ দিনেও ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা প্রার্থীদের মধ্যে দেখা গেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভোটারদের আস্বস্ত করলেও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া সোমবার বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে নানা শঙ্কার কথা জানিয়েছেন।

ভোটকেন্দ্র দখলের প্রস্তুতিসহ সন্ত্রাসী ভাড়া করার খবর মিডিয়ায় এসেছে। পুলিশের বিরুদ্ধেও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযোগে বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে এরই মধ্যে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। তবে সরকার এবং নির্বাচন কমিশন থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে; এ ব্যাপারে কোনো হস্তক্ষেপ করা হবে না।

বেশির ভাগ পৌরসভায় নৌকা ও ধানের শীষের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তবে কিছু কিছু পৌরসভায় দুই দলেরই বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবেন বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিন সোমবার দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির মেয়রপ্রার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। নড়িয়া পৌরসভায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বাড়ি ঘর ও তার সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া গত কয়েকদিন ধরেই হামলা ও প্রচারে বাধাদানের অভিযোগ করে আসছেন বিরোধী প্রার্থীরা। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই এসব অভিযোগ নাচক করা হচ্ছে।

সোমবার বিকালে পৌর ভোটকে সামনে রেখে সংবাদ সম্মেলন করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি অভিযোগ করেছেন, সরকার এই নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করতে চায়। তিনি সব বাধা ও প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে দলীয় নেতাকর্মীদের শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী মাঠে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। নির্বাচনে আবারও সেনাবাহিনী নামানোর দাবি জানান সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।

খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনের পরপরই সরকারের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি জানান, সরকার নির্বাচনে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না। নির্বাচন নিয়ে সবধরনের আশঙ্কা তিনি নাকচ করে দেন। তবে বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবে কি-না তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন শাসক দলের এই মুখপাত্র।

সোমবার সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবারও দেশবাসীকে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন নির্বাচনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। তিনি আশা করছেন, একটি উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এ ব্যাপারে তিনি দেশবাসীর সহযোগিতা চেয়েছেন।

এদিকে নির্বাচনী এলাকায় গত রবিবার মধ্যরাত থেকে আগামী ৩১ ডিসেম্বর সকাল ৬টা পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সোমবার মধ্যরাত থেকে সব পৌরসভাতে বহিরাগতদের অবস্থানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। আজ ২৯ ডিসেম্বর মধ্যরাত থেকে ৩০ ডিসেম্বর রাত ১২টা পর্যন্ত ১২ ধরনের যানবাহন চলাচলও বন্ধ থাকবে নির্বাচনী এলাকায়।

৩০ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ উপলক্ষে ওই দিন ২৩৩ পৌরসভায় ইতোমধ্যে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কমিশন। এদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীন ভোটগ্রহণ চলবে। এ নির্বাচনে মেয়র, সাধারণ কাউন্সিলর এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরসহ মোট ১২ হাজারের বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে মাঠ পর্যায়ে ভোটের সামগ্রী সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে পৌঁছে দেয়া শুরু করে কমিশন। ভোটগ্রহণের দিন সকাল থেকে সেগুলো কেন্দ্রে কেন্দ্রে বিতরণ করা হবে। বুঝিয়ে দেয়া হবে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের।

এই নির্বাচনে সারাদেশের ২৩৩টি পৌরসভার মধ্যে সাড়ে তিন হাজার কেন্দ্রের মধ্যে প্রায় এক হাজার ২০০ কেন্দ্রকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা মোট ভোটকেন্দ্রের প্রায় ৩৫ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে খুলনা বিভাগে। এই বিভাগের ৪৭১টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৯৫টিই ঝুঁকিপূর্ণ। এরপরই রংপুর বিভাগের অবস্থান। এই বিভাগের ৩০৪ কেন্দ্রে মধ্যে ১১৮টি ঝুঁকিপূর্ণ। ঢাকা বিভাগে ৯৯১টির মধ্যে ৩৪৮টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। রাজশাহী বিভাগের ৮০১টি কেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ২৪৬টি। সিলেট বিভাগের ১৮৯ কেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ৪৫টি। বরিশাল বিভাগের ১৬৭ কেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা ৬৩টি আর চট্টগ্রাম বিভাগের ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা ৪৮০টির মধ্যে ১৬৮টি।

এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১২ হাজার ৪৪ জন প্রার্থী। এর মধ্যে মেয়র পদে ৯২৩ জন ও কাউন্সিলর পদে ৮ হাজার ৫৮৯ জন এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদে দুই হাজার ৫৩৩ জন প্রার্থী। এরমধ্য থেকে মেয়র পদে ২৩৪, সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৭৩৮, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২৯৫২ জন প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন ভোটাররা। ইতোমধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মেয়র পদে ৬ জন এবং কাউন্সিলর পদে ৯৪ জন নির্বাচিত হয়েছেন।

এ নির্বাচনে ২৩৪ জন রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ তিন শতাধিক সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া ২৩৪ পৌরসভায় ৬১ হাজার ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতি কেন্দ্রে একজন করে তিন হাজার ৫৮২ জন প্রিজাইডিং অফিসার, প্রতি বুথে একজন করে ১৯ হাজার ১৮৭ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার এবং প্রতি বুথে দুইজন করে ৩৮ হাজার ৩৭৪ জন পোলিং অফিসার নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

এ নির্বাচনে তিন হাজার ৫৮২টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ করা হবে। ভোটার ৭২ লাখ ৭২ হাজার ৬০৩ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ৩৬ লাখ ৩৯ হাজার ৬৭ জন এবং নারী ভোটার ৩৬ লাখ ৩৩ হাজার ৫৩৬ জন।

পৌর নির্বাচনে মাঠে থাকবে এক হাজার ২০৩ জন ম্যাজিস্ট্রেট। এরমধ্যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ৯৬৮জন এবং বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট ২৩৫ জন। গত ১৪ ডিসেম্বর থেকে আচরণবিধি তদারকিতে মাঠে রয়েছে ২৩৪ জন ম্যাজিস্ট্রেট। আর বাকিরা ২৮ থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন।

সর্বশেষ ২০১১ সালে ৩১৯টি পৌরসভার মধ্যে ২৮৫টি পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই বছর ১২ জানুয়ারি ৭৭টি, ১৩ জানুয়ারি ৪৭টি, ১৭ জানুয়ারি ৪৫টি এবং ১৮ জানুয়ারি ৩৫টি পৌরসভায় নির্বাচন হয়। বাকিগুলো পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত হয়।

আইন অনুযায়ী মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিনের আগে নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এবার ২৩৪ পৌরসভাতে একদিনে নির্বাচন হচ্ছে। গত ২৪ নভেম্বর তফসিল অনুযায়ী ৩০ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

মতামত