টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

পাকিস্তান শব্দটিই অরুচিকর

zafar wazedচট্টগ্রাম, ২৩ ডিসেম্বর (সিটিজি টাইমস): পাকিস্তান যুগে ষাটের দশকে স্কুলের অ্যাসেম্বলিতে বাঙালি শিক্ষার্থীদের ‘পাকসার জমিন’ গাওয়ার আগে গাইতে হতো বাংলায় রচিত গান, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ, পাকিস্তান জিন্দাবাদ’, ‘খাইবার তীরে তীরে পতাকাবাহী, মেঘনার কূলে যত বীর সিপাহী, প্রাচ্য-প্রতীচ্যের মিলন গাহি, ঝা-া জাগে যে আজাদি’ নাজির আহমদের লেখা ও আবদুল আহাদের সুরারোপিত গান এটি। পূর্ব বাংলার শ্যামলিমায়, পঞ্চনদীর তীরে অরুণিমায়’ লাইনগুলো গাওয়ার সময় ‘পূর্ব বাংলা’ শব্দটিতে বেশ জোর দেওয়া হতো। কিন্তু ‘পঞ্চ নদী বা খাইবার তীরে তীরে’ শব্দগুলো ছিল অচেনা। কিন্তু মেঘনার কূলে বীর সিপাহী লাইনটি বেশ সাহস যোগাত। পূর্ববঙ্গবাসীর কাছে পঞ্চনদ, খাইবার, বিলাম নদীর কোনো আবেদন ছিল না। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধকালে আরেকটি গানও গাইতে হতো। সেটি কবি নজরুলের। ‘ধর্মের নামে শহীদ যাহারা আমরা সেই সেই জাতি’ গানটি সংযোজিত হয়। ১৯৬৬ সালে এসে এই গানটির পাশাপাশি পতাকা উত্তোলনের সময় গাইতে হতো কবি গোলাম মোস্তফা রচিত ও সুরারোপিত ‘উড়াও ওড়া কওমী নিশান।’

বাংলায় পাকিস্তান নিয়ে যত গান রচিত হয়েছে, খোদ পাকিস্তানে তা হয়নি। পাকিস্তানের জাতীয় সংগীতটি অনেকটা দরপত্রের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়েছিল। ভারতীয় কবি হাফিজ জলন্ধরীর লেখা ফার্সি ভাষায় ‘পাকসার জমিন সাদবাদ’ নামক জাতীয় সংগীতটির অর্থ না বুঝেই গাইতে হতো। পাকিস্তান নামক বর্তমান যে রাষ্ট্রটি মানচিত্রে বিদ্যমান, তার জাতির জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতে জন্মগ্রহণ করেন। পাকিস্তানের বর্তমান যে রাষ্ট্রভাষা উর্দু তা সে দেশের কোনো অঞ্চলেরই ভাষা নয়। ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহারের ভাষাটি পাকিস্তান আত্মস্থ করেছে। এমনকি এই ভাষাটি পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল পাকিস্তানি শাসকরা। যে মুসলিম লীগ নামক দলটি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছে এবং বর্তমানে শাসন ক্ষমতায়, সে দলটিও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা শহরে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির কোনো নিজস্ব সত্তা যেমন নেই, তেমনি নেই মর্যাদা ও সম্মান।

বর্তমান পাকিস্তানের এলাকাভিত্তিক মানুষের মধ্যে চিন্তা চেতনায় কোনো ঐক্য নেই। বরং নানা রকম ভেদ আছে। পাঞ্জাবিরা হচ্ছে সে দেশের দ-মু-ের হর্তাকর্তা। এদের ভয়ে অন্য জাতিসত্তারা মুখ বন্ধ করে রাখে। অপর জাতি সিন্ধিরা খুবই ভীতু ধরনের। পারতপক্ষে দেশের বিষয়ে কথা বলে না। বেনজির ভুট্টো নিহত হওয়ার পর সিন্ধিদের বিভক্ত মতামত পাওয়া যায়। একদল বলছে ঠিক আছে, অন্যদল চুপ ছিল। এদের ওপর পাঞ্জাবিদের নিপীড়ন-শোষণ চলছে। প্রতিবাদ আসে না কোথাও হতে। বরং বিহারিরা এই প্রদেশে শক্তিশালী হয়ে ওঠায় সিন্ধিরা পিছিয়ে গেছে। অপর জাতি বেলুচরা আরো বেশি নিপীড়িত। পাকিস্তান জন্মলগ্ন থেকেই যে নানারকম মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত তার প্রমাণ রেখেছে বেলুচিস্তান প্রদেশে।

১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ থেকেই এই অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সামরিক আগ্রাসন ও জবরদখল শুরু হয়। তারা বালুচ জাতির মেরুদ- পুরোপুরি ভেঙে দেওয়ার উদ্দেশে গণহত্যা চালিয়েছিল। পাকিস্তানিদের এই বেআইনি দখলদারি ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে প্রথম দিন থেকেই বালুচ জাতির লড়াই শুরু হয়। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সেখানে আবারো গণহত্যা চালিয়ে জেনারেল টিক্কা খান ‘কসাই’ উপাধি পেয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯৭১ সালে টিক্কা খান বাংলাদেশে গণহত্যা পারিচালনা শুরু করেছিল। দীর্ঘ ৬৮ বছর ধরে বালুচদের ওপর পাকিস্তানি হানাদারদের নির্যাতন কোনো অংশেই কমেনি, বরঞ্চ বেড়েই চলেছে। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশটি নানা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মধ্যে লড়াই, সংঘাত, হানাহানি এখনো চলছে। পাঞ্জাবিরা শাসক শ্রেণি হিসেবে সবার ওপর স্টিম রোলার চালিয়ে আসছে। বাংলাদেশেও তারা গণহত্যা চালিয়ে পার পায়নি। সশস্ত্র যুদ্ধে বাঙালিরা তাদের পরাজিত করেছিল।

মূলত দীর্ঘমেয়াদি সামরিক শাসন আর অব্যাহত সীমান্ত প্রথার কারণে পাকিস্তানে মুক্ত বুদ্ধিচর্চার পথ বন্ধ হয়ে আছে। একদল মানুষ অর্থবিত্তে-ক্ষমতায় অনেক বেশি অগ্রসরমান হয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর শাসক হয়ে চেপে বসে আছে। পাকিস্তানি গবেষক আয়েশা সিদ্দিকা তার গবেষণা গ্রন্থে দেখিয়েছেন, পাকিস্তানের অর্ধেকের বেশি সম্পদ সেনাবাহিনীর দখলে। ব্যবসা-বাণিজ্য, জায়গা-জমি, কল-কারখানাসহ প্রশাসনে সামরিক বাহিনীর মালিকানায় চলে গেছে। সব কিছু মিলিয়ে বলা যায়, বর্তমানে পাকিস্তান মূলত কর্কট রোগে আক্রান্ত। পাকিস্তান নামক নাপাক ব্যর্থ রাষ্ট্রকে ঘৃণা করার জন্য ১৯৭১ সালই যথেষ্ট। বাংলাদেশে যে গণহত্যা, ধর্ষণ, তারা চালিয়েছিল, তার অভিশাপে জর্জরিত হয়ে এখন নিজেরাই হানাহানি করছে। সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে নেই কোনো সম্প্রীতি। ধর্মের নামে যত অধর্ম রয়েছে, সবই তাদের করায়ত্ত। তাই পাকিস্তানকে ইসলামী বা মুসলিম দেশ বলার কোনো কারণ নেই। সব অনৈসলামিক কার্যকলাপকে তারা ইসলামের নামে চালু রেখেছে। তাই সে দেশে মসজিদে, গির্জায় বোমা হামলা নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ঈদের জামাতেও যে দেশে বোমা মারা হয়, মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করার জন্য মালালা নামক স্কুলছাত্রীকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করা হয়, সে দেশ কোনো স্বাভাবিক দেশ নয়।

এসব ঘটনায় সেদেশের সংবাদমাধ্যম, নিরাপত্তা বাহিনী এমনকি জনসাধারণ থাকে নিরুত্তাপ। এসব হিংস্র ঘটনা তাদের মনে কোনো রেখাপাত করে না। বরং হামলাকারীদের পক্ষেই তাদের অবস্থান। তাই আজ বিশ্বের এক নম্বর সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে পরিণত এখন পাকিস্তান। তারা শুধু তালেবানই পুষছে না, আফগানে যুদ্ধরত তালেবান জঙ্গিদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রও এ দেশটি। সারা বিশ্ব যখন আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজছে, তখন পাকিস্তান তাকে নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী পাকিস্তানের অনুমতি ছাড়াই অতর্কিতে হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করেছিল। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই সারা বিশ্বে তাদের এজেন্টদের দিয়ে সন্ত্রাসের বিস্তার ঘটিয়ে আসছে। বাংলাদেশ তার অন্যতম উদাহরণ। পাকিস্তান সন্ত্রাসী তৈরি ও বহির্বিশ্বে তা রপ্তানি করে আসছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ জঙ্গি ও তালেবানের মূল ঘাঁটি হচ্ছে পাকিস্তান। তাদের বাংলাদেশে এজেন্ট জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগসহ অন্যান্য ধর্মীয় নামধারী সংগঠন। যে কারণে তাদের হাই প্রোফাইল এজেন্ট সাকা চৌধুরী, মুজাহিদসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তিতে তারা ক্ষুব্ধ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ওই দেশটি নানাভাবে বাংলাদেশের যত ক্ষতি করে চলেছে, তেমনটি আর কেউ করছে কি না সন্দেহ। যদিও পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই আর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ হরিহর আত্মা হিসেবে প্রতিভাত। পাকিস্তানি সেনারা চায় সে দেশটিতে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করুক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিকাশ ঘটুক। তা হলে তা দমনে মার্কিনসহ ইউরোপের অর্থ সাহায্য মিলবে যা দিয়ে তারা আয়েশি জীবন যাপন করতে পারবে। এই দুই গোয়েন্দা সংস্থা মিলে দেশটিকে অকার্যকর ও ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। অনেকদিন ধরেই তারা জঙ্গিবাদে মদদ দিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট করে আসছে। মানবাধিকারসহ নানা ইস্যুতে পাকিস্তান নিজেই যেখানে ব্যর্থ রাষ্ট্রের অভিধা নিয়ে সমালোচনার সম্মুখীন, সেখানে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে প্রতিক্রিয়া প্রদানের দুঃসাহসও তারা দেখাচ্ছে।

ইংরেজ সাহিত্যিক এইচ জি ওয়েলস ছিলেন মানব দরদি। রবীন্দ্রনাথ যেমনি বলেছিলেন আমাদের একটি মাত্র দেশ আছে, সে দেশের নাম বসুন্ধরা, একটি মাত্র জাতি আছে, সে জাতির নাম মনুষ্য জাতি; ওয়েলসও তেমনি বলতেন, পৃথিবীর সব মানুষ একই মানব পরিবারভুক্ত। ইউরোপের জেনেভা শহরে দুজনের সাক্ষাৎ ঘটে। ওয়েলস তিক্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, কোনো কোনো জাতি সাহিত্য-সংস্কৃতি-সভ্যতার কৌলীন্য নিয়ে অন্যের থেকে দূরে থাকতে চায়, অথচ সে কৌলীন্য অলীক। ভাষায়-চিন্তায়-ধর্মে মানুষ যদি এক পথের পথিক হতো, তাহলে সভ্যতার একটি সর্বজনীন চরিত্র গড়ে উঠতে পারত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ব্যক্তিবিশেষের ইচ্ছায় বা স্বল্পসংখ্যকের চেষ্টায় সভ্যতার হেরফের হয় না। প্রতিটি জাতির একটি বিশেষ জীবন ধারা আছে, সে ধারা অনুযায়ী তার সভ্যতার চরিত্র নির্ধারিত হয়। বিভিন্ন দেশের সভ্যতা বিভিন্ন মূর্তি পরিগ্রহ করে। ওসব পার্থক্য সত্ত্বেও সব মানুষ যদি মিলেমিশে থাকতে পারে, তাহলেই প্রমাণিত হবে যে, মানুষ সুসভ্য হয়েছে। এই ছিল রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ প্রদত্ত সভ্যতার সংজ্ঞাতে নিজেদের ঠিক সভ্য বলে দাবি করা যায় যে, তা নয়। ধর্মের নামে গোড়াতেই উপমহাদেশটি ভেঙে প্রথমে দুইখানা, পরে তিনখানা হয়েছে। পাকিস্তান নামক অদ্ভুতুড়ে দেশটি বর্বরতাকে প্রাধান্য দিয়ে গত ছয় দশকের বেশি সময় ধরে বর্বর দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এদের সেনারা হানাদার রূপে পঁয়তাল্লিশ বছর আগে বাঙালি নিধনে মত্ত হয়েছিল। পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে তারা এখনো গর্ত হতে মাথা উঁচু করে ইতিউতি দিতে চায়। ধর্মের নামে হানাহানি পাকিস্তানে স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত আজও। মসজিদে বোমা হামলা চালিয়ে স্বধর্মের মানুষকে হত্যা করে তারা। ধর্ম নিয়ে নানা মতভেদ তৈরি করে পরস্পরকে কুপোকাত করতে নানাবিধ অস্ত্রের ব্যবহার করে আসছে। কে যে কাকে বধ করে সে দেশে তার হুঁশজ্ঞান নেই ওদের। আর সেখানে জাতিতে জাতিতে বৈষম্য তীব্র। অশিক্ষিত ও নিরক্ষরের সংখ্যা বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। এদের বশংবদ রাখার জন্য শাসকরাও ধর্মান্ধতাকে বেছে নিয়েছে। ধর্মান্ধতা, অধর্মাচরণ বাড়ছে ব্যাপকভাবে পাকিস্তান নামক দেশটিতে। সেই ১৯৫৮ সালে সেনাপতি আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের পর থেকে সামরিক জান্তা শাসিত দেশটি সভ্যভব্য হওয়ার পথে আর এগুতে পারেনি। গণতন্ত্র আর আইনের শাসনের লেশমাত্র নেই দেশটিতে।

পাকিস্তানের বয়স ৬৮ বছর পার হয়েছে। এর মধ্যে চার দশকের বেশি কেটেছে সামরিক স্বৈরাচারী শাসনাধীনে। অর্থাৎ সে দেশটি গণতন্ত্রের চেহারা দেখা দূরে থাক, প্রকৃতপক্ষে কোনো স্বাধীনতা পায়নি সে দেশের জনগণ। ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতবর্ষের অন্তর্গত থেকে যেটুকু স্বাধীনতা ভোগ করেছে, দেশভাগের পর এখনো পাকিস্তানবাসীর মধ্যে সেটুকুও নেই। আরও বিপদের কথা যে, যুক্তরাষ্ট্র ময়াল সাপের মতো দেশটিকে গিলে ফেলেছে। সে কারণে মুজাহেদীন, তালেবান সৃষ্টি করে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়েছে। সেই তালেবান থেকে সৃষ্ট আল-কায়েদাই হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শত্রু। এদের নিধনের নামে পাকিস্তানে জঙ্গি গোষ্ঠীর তৎপরতা যেমন বেড়েছে, তেমনি পাকিস্তান জঙ্গিবাদকবলিত দেশে পরিণত হয়েছে। এটা বাস্তব যে, পাকিস্তানের মানুষ ঢের বেশি অশান্তি ভোগ করছে, বিশেষ করে সে দেশে মানবাধিকার ভূলুন্ঠিত হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব অতি পুরনো। তাই মসজিদে বোমা হামলা, গুলি-হত্যা অব্যাহত রয়েছে। মালালার ঘটনা প্রমাণ করে দেশটি কোন নিম্নস্তরে অবস্থান করছে। পাকিস্তানের জনগণ একান্ত নিরুপায়, সব অধিকার থেকে বঞ্চিত।

এককালে বাংলাদেশ ছিল বারো ভুঁইয়াদের দেশ। এখন পুরো পাকিস্তানই বারো ভূঁইয়াদের দেশ। অর্থাৎ এখনো তারা ফিউডাল বা সামন্ত যুগে রয়েছে। পাকিস্তানে ফিউডাল লর্ডদের একটি প্রাইভেট আর্মি রয়েছে। এমনকি রাজনৈতিক নেতা হিসেবে যারা পরিচিত, আচারে ব্যবহারে, কর্মকা-ে তারা প্রত্যেকেই একেকটি সামন্ত নৃপতি। দলীয় ক্যাডাররাই হলো তাদের সেই আর্মি এবং সে আর্মির একমাত্র কাজ হলো মারামারি-খুনোখুনি। ফলে দেশটি পরিণত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় বারো ভুঁইয়াদের দেশে। এই ফিউডাল অবস্থা উপমহাদেশীয় যুগের কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য গৌরবের না হলেও পাকিস্তানের জন্য তা শক্তিমত্তা প্রদর্শনের গৌরবে পরিণত হয়েছে।

পাকিস্তানে ধর্মীয় মৌলবাদের জিগির পুরনো, যা অতি দুর্লক্ষণ। পাকিরা যখনই কথায় কথায় ধর্মের দোহাই দেয়, তখনই স্পষ্ট হয় যে, অধর্মের যুগ এসেছে। অথচ সভ্য মানুষের ধর্ম হবে বাক্যে-চিন্তায়-কর্মে যুক্তির অনুশাসন মেনে চলা। পাকিস্তানিদের ব্যাধি এমন যে, সুবুদ্ধির কাজ দুর্বুত্তিতে নষ্ট করা। সে দেশটি পারমাণবিক অস্ত্রসাজে সজ্জিত। অথচ দেশটিতে মানুষের মৌলিক অধিকার নেই। কিন্তু শাসকগোষ্ঠী ওঠেপড়ে লেগেছে পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণে। ব্রহ্মাস্ত্রটি হাতে থাকায় সে বাংলাদেশকে শাসিয়ে বেড়াচ্ছে বলে ধারণা করা যায়। এ সবই সভ্য মানুষের লক্ষণ নয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান দানবে পরিণত হয়েছিল। মনুষ্যোচিত ব্যবহার ভুলে গিয়েছিল। দেখেশুনে পরিষ্কার যে, পাকিস্তান নামক দেশটি প্রকৃতিস্থ অবস্থায় নেই।

রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৭ সালে সভ্যতার সংকট সম্পর্কে সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলেন, আজ সেই সংকট অনেক বেশি গুরুতর আকার ধারণ করেছে। পাকিস্তানে যারা সমাজপতি হয়ে দীর্ঘদিন বিরাজ করছে, তারাই সমাজবিরোধী। যারা শাসন ক্ষমতার অধিকারী তারা নিজেরাই দুঃশাসক। আচার আচরণ ঠিক সভ্যজনোচিত নয়। পাকিস্তানে যাকে সভ্যতা বলা হচ্ছে সেটা বিজ্ঞানের তৈরি একটা চকচকে মোড়কে ঢাকা। ভেতরে পচন ধরেছে। মানুষই সভ্যতার বাহন। কিন্তু পাকিস্তান নামক দেশটির শাসকরা আজও উচ্চশিক্ষিত। বিদ্বান বিদগ্ধ মানুষের অভাব ঘটেছে সেদেশে এমন নয়। সামরিক জান্তা নিয়ন্ত্রিত দেশটি সুসভ্য সমাজে প্রবেশ করতে পারছে না। যে রাজনীতি সেখানে বিদ্যমান, তা আবার সীমাহীন দুর্নীতিগ্রস্ত।

‘ভারত স্বাধীন হলো’ গ্রন্থে মওলানা আবুল কালাম আজাদ পাকিস্তান ধারণা সম্পর্কে বলেছিলেন, এ কথা স্বীকার না করে পারছি না যে, পাকিস্তান শব্দটাই আমার কাছে অরুচিকর। এ থেকে মনে হয় পৃথিবীর কতকাংশ শুদ্ধ আর বাকি সব অশুদ্ধ। শুদ্ধ আর অশুদ্ধ বলে এলাকা ভাগ করা ইসলামবহির্ভূত। এর সঙ্গে বরং সেই গোঁড়া ব্রাহ্মণের মিল বেশি যা মানুষ আর দেশকে শুচি আর ম্লেচ্ছ ভাগ করে, এই ভাগাভাগি ইসলামের আদত ভাবকেই নস্যাৎ করে। ইসলামে এ ধরনের ভাগাভাগির কোনো স্থান নেই। মানবতাবিরোধী ও গণহত্যাকারীদের পক্ষে প্রকাশ্য কথা বলে পাকিস্তান প্রমাণ করল তারা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এসব ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিল। বিচারিক কার্যক্রম শুধু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়েছে। তাদের রাজনৈতিক পরিচয় নয়। তারা দেশের দুই বিরোধী দলের নেতা এই বিষয়টি নেহাত কাকতালীয়।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত