টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

প্রতারণার নতুন কৌশল: মোবাইল ফোন নম্বর স্পুফিং ও ক্লোনিং

Spoofing-specialচট্টগ্রাম, ২০ ডিসেম্বর (সিটিজি টাইমস):মোবাইলের সিম নম্বর গোপন বা নকলের মাধ্যমে অন্যের ফোন নম্বর ব্যবহার করে সাধারণ গ্রাহকদের ফাঁদে ফেলছে এক শ্রেণির প্রতারক। তারা বিশিষ্ট ব্যক্তি বা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সিম নম্বর ব্যবহার করছে। আবার কাউকে ফাঁদে ফেলতে সিম নম্বর নকল করে কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তিকে হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির ভাষায় একে স্পুফিং বা ধোঁকা বলা হয়।

প্রতারণার ক্ষেত্রে তারা ক্লোনিং নামে আরেকটি পদ্ধতিও ব্যবহার করছে। ক্লোনিং হলো— মোবাইল সিম নম্বর অপরিবর্তিত রেখে অপারেটর পরিবর্তন করে কাউকে কল দেওয়া। এক্ষেত্রে অপারেটর পরিবর্তন করা হলেও কলগ্রহীতার মোবাইল সেটে সেভ করা ব্যক্তির নাম দেখাবে। তবে যদি নম্বরটি সেভ না থাকে তাহলে কলগ্রহীতার কাছে অপরিচিত নম্বর হিসেবে দেখাবে।

তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে এ ধরনের প্রতারণার কৌশল প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তারা জানাচ্ছেন, মোবাইল ফোন নম্বর স্পুফিংয়ের জন্য অনেকগুলো পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। ইন্টারনেটে এক ধরনের সফটওয়্যার বা এ্যাপস্ আছে যেটি ব্যবহার করে যে কেউ অন্যের মোবাইল নম্বর দিয়ে আরেকজনকে কল করতে পারে।

এ পদ্ধতিতে যে কারও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে কল করা যায়। কল স্পুফিং করার জন্য অনেক এ্যাপস ও সাইট আছে। এগুলো মজা করার জন্য বিদেশের ক্রিয়েটররা (উদ্ভাবক) নির্মাণ করেছিলেন, বিশেষ করে বন্ধুদের সঙ্গে মজা করার জন্য। কিন্তু এক শ্রেণির প্রতারক এটি ব্যবহার করে অপরাধ সংঘটিত করছে। কারণ এ ধরনের সফটওয়্যার বা এ্যাপস্ দিয়ে কল করার পর কারও বোঝার সাধ্য নেই যে এটি আসল না নকল।

অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, এ ধরনের কল সাধারণ মোবাইল পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার পরিবর্তে ইন্টারনেটে বিদেশী সার্ভারের মাধ্যমে ঘুরে আসে। তাই এ ধরনের কলে কোনো অপরাধ হলে তা বের করতে অনেক প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজন হয়। বিশ্বের ৬০টি দেশে এর মাধ্যমে কল করা যায়। এ ছাড়া মেইলের মাধ্যমে স্পুফিং করা হয়। এটি হ্যাকিংয়ের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। একে ফেইক মেইলিং বা স্পুফিংসহ অনেকে অনেক নামে ডাকেন। ই-মেইল স্পুফিং (Spoofing) পদ্ধতিতেও ভুয়া ই-মেইল এ্যাড্রেস থেকে ই-মেইল পাঠিয়ে অন্য ব্যবহারকারীকে বোকা বানানো হয়।

স্পুফ (Spoof) অর্থ প্রতারণা করা বা ধোঁকা দেওয়া। আইটি জগতেও স্পুফিং (Spoofing) অর্থ- কোনো সিস্টেম বা ইউজারকে ধোঁকা দেওয়া। সাধারণত কোনো ইউজারের আইডি গোপন করে অথবা নকল করে স্পুফিং করা হয়। বিভিন্ন পদ্ধতিতে স্পুফিং করা যায়। আরেকটি স্পুফিং পদ্ধতি হচ্ছে- আইপি স্পুফিং (ip Spoofing)। এ পদ্ধতিতে কোনো কম্পিউটার সিস্টেমের আইপি এ্যাড্রেস গোপন বা নকল করা হয়। ইন্টারনেটে যখন কেউ তথ্য পাঠাবেন তখন আইপি এ্যাড্রেসের মাধ্যমে ওই তথ্যের উৎস শনাক্ত করা সম্ভব। কিন্তু যখন আইপি স্পুফিং করা হয় অর্থাৎ ভুয়া আইপি এ্যাড্রেস ব্যবহার করা হয়, তখন সহজে ওই তথ্যের সঠিক উৎস শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। কিছু কিছু সিকিউরিটি সফটওয়্যার রয়েছে যেগুলো এ ধরনের আক্রমণ শনাক্ত করে তা প্রতিহত করতে পারে। তবে বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের কল স্পুফিংয়ের নজির পাওয়া গেলেও অন্যকোনো স্পুফিংয়ের কথা তেমন জানা যায়নি।

অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মিনহাজুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের অস্বাভাবিক ফোনকল এলে বিচলিত না হয়ে স্বাভাবিক থাকতে হবে। কথা শেষ হওয়ার পর ওই নম্বরে কল করে বিষয়টি যাচাই করতে হবে। কারণ স্পুফিংয়ের মাধ্যমে কল করা যাবে, কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওই নম্বরে কল ব্যাক করলে সেটি আসল ইউজারের কাছেই যাবে। তখন আসল ইউজারের কাছে ব্যাপারটি জানতে চাইলে সন্দেহ দূর হয়ে যাবে। সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদেরও অবহিত করা প্রয়োজন।’

গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিব, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের কর্মকর্তা ও পুলিশ প্রধানসহ রাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মোবাইল নম্বর স্পুফিং করে হুমকি, চাঁদাবাজি, চাকরি ও বদলির তদবির, টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতি করা হয়েছে। হুমকি, চাকরির বদলি বা নিয়োগের ক্ষেত্রে এ কাজ বেশি করা হচ্ছে। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের নম্বর ‘স্পুফিং’ করে কয়েকদিন আগে এক জায়গায় কল করে তদবির করা হয়। শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু ও তার এপিএস এর মোবাইল নম্বর ‘স্পুফিং’ করে করিমগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে কল করে বিভিন্ন তদবির করে একটি চক্র। রেল সচিব ফিরোজ সালাউদ্দিনের নম্বর স্পুফিং করে চট্টগ্রামের একজন রেল কর্মকর্তার কাছে তদবির করা হয়।

স্পুফিং কল প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাইবার নিরাপত্তা বিভাগ। মোবাইল পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর এখনও এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি।

আইসিটি সূত্রে জানা যায়, স্পুফিং কল বন্ধে যে গেটওয়ে পর্যায়ে মনিটরিং করা হচ্ছে তা ম্যানুয়ালি। ফলে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সিস্টেম ডেভেলপ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজধানীর তেজগাঁও এলাকা থেকে ২৪ নভেম্বর আব্দুল হক নামে একজনকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেফতারের পর আব্দুল হকের দুটি ল্যাপটপ ও একটি স্মার্ট ফোন থেকে স্পুফিংয়ের মাধ্যমে হুমকি দেওয়ার প্রমাণ পায় পুলিশ।

পুলিশের তদন্তে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক মিজানুর রহমান খাঁন, ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির শাহরিয়ার কবির, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং সাবেক আইন মন্ত্রী শফিক আহম্মেদসহ গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক ও রাজনীতিবিদদের হত্যার হুমকি দিয়েছেন আব্দুল হক। তিনি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক ও রাজনীতিবিদসহ ১৫৩ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে ইসলামিক স্টেটস (আইএস) ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) নামে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন।

জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বিষয়ে পুলিশ আরও জানায়, আসামি আব্দুল হক দীর্ঘদিন নিজ পরিচয় গোপন করে ফাইজুর রহমান, সালেহ আহম্মেদ ফোয়াদ ও মাওলানা সাদ নামে ফেসবুক আইডি খুলে তাদের মোবাইল ফোন নম্বর স্পুফিংয়ের মাধ্যমে ব্যবহার করেন। পরে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে তাদের মোবাইলে বিভিন্ন ধরনের অশ্লীল এবং প্রাণনাশের হুমকিমূলক বার্তা পাঠিয়ে আসছিলেন।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা ও অপরাধতথ্য বিভাগের (ডিবি) যুগ্ম-কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘স্পুফিং প্রতিরোধে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। টেকনোলজির ব্যাপার, তাই টেকনোলজি দিয়েই এটি প্রতিরোধ করতে হবে। সফটওয়্যারটি যেহেতু বহির্বিশ্বের ক্রিয়েটররা (উদ্ভাবক) নির্মাণ করেছেন সেহেতু এটি প্রতিরোধে নিশ্চয়ই এন্টি এ্যাপস্ বা সফটওয়্যার রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি সেসব সফটওয়্যার দিয়েই এই প্রতিরোধ করতে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলছে।’-দ্য রিপোর্ট

মতামত