টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চট্টগ্রামের ৭০ ভাগ ভবন ভূমিকম্প ঝুঁকিতে

চট্টগ্রাম, ২০ ডিসেম্বর (সিটিজি টাইমস): রাজধানী ঢাকা এবং চট্টগ্রাম শহরের ৭০ শতাংশ ভবন উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এসব ভবন নির্মাণে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) মানা হয়নি। ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে এ দুই শহরের ৬৫ শতাংশ ভবন ধসে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। সম্ভাব্য এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে এসব ভবনে বসবাসকারী ৯৫ শতাংশ বাসিন্দার প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। এমন দুর্যোগে পড়লে অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ৫ শতাংশ।

ভূমিকম্পসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ঢাকা এবং চট্টগ্রাম শহরের ভবন নিরাপত্তা সংক্রান্ত পৃথক দুটি প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা শনিবার এসব তথ্য তুলে ধরেন।

তারা বলেন, ভবন নির্র্মাণে বিএনবিসির বিধান মানা সঠিকভাবে তদারকি করা হয় না। এ ছাড়া বহু ক্ষেত্রে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করায় পরিস্থিতি এতটা খারাপ হয়েছে। ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত তদারকি জোরদার করতে প্রয়োজনীয় পেশাদার বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, প্রতিষ্ঠানিক গবেষণা ও ফায়ার সার্ভিসকে শক্তিশালী করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নীতিনির্ধারক এবং জনগণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি এবং উন্নয়ন অংশীদারদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলেছেন তারা।

উন্নয়ন সহযোগীদের সহযোগিতার অংশ হিসেবে আরবান রিজিলিয়েন্স প্রজেক্ট (ইউআরপি) এবং বিল্ডিং সেফটি প্রজেক্ট (ইউবিএসপি) শীর্ষক দুটি প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল অনুষ্ঠিত হয়। পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিনের সভাপতিত্বে এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরী। বক্তব্য রাখেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দিন আবদুল্লাহ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিব মো. শাহ কামাল, জাপান ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশনের (জাইকা) সিনিয়র প্রতিনিধি হিরুউকি তমিতা, বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মারু এস ফর্নি ও জাইকার চিফ রিপ্রেজেন্টেটিভ মিকিও হাতাইডা।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বিধিবদ্ধ আইন যথাযথ অনুসরণ না করেই এতদিন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই এ দুটি নগরে ভবন উঠছে। এ কারণে বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটছে। তবে এসব বিষয়ে সরকার এখন কঠোর হচ্ছে। ঝুঁকি প্রতিরোধে দক্ষিণ কোরিয়ার মডেল অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মন্ত্রী জানান। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে উন্নয়ন সহযোগীদের নিয়ে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মানবসৃষ্ট দুর্যোগ রোধে জনগণের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়োজন রয়েছে। ভবন নির্মাণে যথানিয়মে মানসম্মত উপকরণ ব্যবহার করতে হবে। এতে দুর্যোগ কিছুটা এড়ানো সম্ভব। রানা প্লাজার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, মানবসৃষ্ট কোনো দুর্যোগ আর মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
প্রবন্ধে জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, এ দেশ বিশ্বের সবচেয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। মোট ১৩টি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ভূমিকম্প অন্যতম। বাস্তবতা হচ্ছে, অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবেলায় কিছুট সফলতা এলেও ভূমিকম্পের বিষয়ে কোনো ধরনের প্রস্তুতি নেই। এমনকি সাধারণ জনগণ থেকে নীতিনির্ধারক পর্যন্ত কারও মাঝেই এ বিষয়ে কোনো সচেতনতা নেই। বিভিন্ন সময়ের ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০০৫ সালে স্পেকট্রাম পোশাক কারখানা ভবন ধসে ৬৪ শ্রমিক নিহত হন। ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনস কারখানায় আগুন লেগে মারা যান ১১৭ শ্রমিক। পরের বছর রানা প্লাজা ধসে নিহত হন এক হাজার ১৩৫ শ্রমিক। সম্প্রতি নেপালে ভূমিকম্পে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় সারাবিশ্বকে নাড়া দিয়েছে । এসব সত্ত্বেও ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এমনকি এখনও বিল্ডিং কোড না মেনেই অননুমোদিত নকশা, কংক্রিটসহ নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে নতুন নতুন ভবন নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ভবন নির্মাণকালে তদারকি জোরদার করতে প্রয়োজনীয় পেশাদার লোক নিয়োগসহ বেশ কিছু পরামর্শ দেন তিনি।

জাইকার সিনিয়র প্রতিনিধি হিরুউকি তমিতা জানান, বিএনবিসির তথ্যমতে কমপ্লায়েন্ট নয় ঢাকা ও চট্টগামের ৬৫ শতাংশ ভবন। এর পরই ভবন নির্মাণে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে সিলেট শহর। রানা প্লাজা ধসের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ভূমিকম্প ছাড়াই যেখানে ভবন ধসে পড়ছে, সেখানে ভূমিকম্প হলে অবস্থা কী দাঁড়াবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

ইউআরপি এবং ইউবিএসপি প্রকল্প উদ্বোধন : অনুষ্ঠানে শহর এলাকায় ভবন নির্মাণের নিরাপত্তা উন্নয়নে সরকার, বিশ্বব্যাংক এবং জাইকার সহযোগিতায় দুটি প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়। আরবান রিজিলিয়েন্স প্রজেক্ট (ইউআরপি) প্রকল্পের মাধ্যমে শহর এলাকার ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং সরকারি ভবন নির্মাণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। এ সংক্রান্ত ১১ কোটি ৬০ লাখ ডলার প্রকল্পের ১০ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা দিচ্ছে জাইকা। বাকি ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার দেবে সরকার।

অন্যদিকে জরুরি অবস্থায় সরকারের সংশ্লিস্ট বিভিন্ন বিভাগ এবং প্রতিষ্ঠানের সামর্থ্য জোরদার এবং ঢাকা ও সিলেট শহরের নির্মিতব্য ভবন বিএনবিসি অনুসরণ করছে কি-না সে লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে ইউবিএসপি। এ প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ কোটি ৯৫ লাখ ডলার। এর মধ্যে ১৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার ঋণ দেবে বিশ্বব্যাংক। বাকি ৬৫ লাখ ডলারের জোগান দেবে সরকার। নগরের ভবন নির্মাণ নিরাপত্তায় নেওয়া প্রকল্প দুটি এ বিষয়ে প্রথম উদ্যোগ।

মতামত