টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

সিএনএনের প্রচ্ছদে শাহাদাতের নির্যাতিত গৃহকর্মীর গল্প

sচট্টগ্রাম, ১১ ডিসেম্বর (সিটিজি টাইমস): ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেনের গৃহকর্মীকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী টিভি সিএনএন। সিএনএনের ফ্রিডম প্রজেক্টের আওতায় করা ওই প্রতিবেদন এখনো চ্যানেলটির ওয়েবসাইটের প্রচ্ছদের শীর্ষে অবস্থান করছে।

মাহফুজা আকতার হ্যাপি নামে ওই ১১ বছর বয়সী গৃহকর্মীর ওপর নিষ্ঠুর কায়দায় নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে ক্রিকেটার শাহাদাত ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে। এসব নিয়েই প্রতিবেদন বানিয়েছে সিএনএন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাকে সবাই হ্যাপি নামে চেনে। কিন্তু মাহফুজা আকতার যখন থেঁতলে যাওয়া মুখে ঢাকার সড়কে কাঁদছিল, তখন সে আর যা-ই হোক, ‘হ্যাপি’ বা সুখী ছিল না।

বাংলাদেশের এক ক্রিকেট তারকার ঘরে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতো ১১ বছর বয়সী মাহফুজা। বাংলাদেশে কোন সেলিব্রেটির বিচারের সবচেয়ে বড় এ নজির আবর্তিত হচ্ছে মাহফুজাকে ঘিরেই।

তার দাবি, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেন ও তার স্ত্রী নৃত্য শাহাদাত তাকে নির্যাতন করেছে। নিজের মুখের ক্ষতচিহ্নের দিকে আঙুল দেখিয়ে মাহফুজা বলে, ‘তারা আমাকে লাঠি বা রান্নাঘরের আসবাবপত্র দিয়ে মারতো। আমাকে ঘুষি মারতো, আঁচড়ে দিতো। আমাকে প্রচুর থাপ্পড় মারা হতো।’

শাহাদাত হোসেন ও তার স্ত্রী উভয়েই পুলিশি হেফাজতে রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতন ও শিশুকে দিয়ে কাজ করানোর অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।

তবে শাহাদাতের আইনজীবীর দাবি, তিনি নির্দোষ। যেদিন হ্যাপি পালিয়ে যায়, তখন শাহাদাত বাসায় ছিলেন না। শাহাদাতের স্ত্রীর পক্ষে অবশ্য কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ওই আইনজীবী। তবে ১ ডিসেম্বর নৃত্য শাহাতাদকে মানবিক কারণে সাময়িক জামিন দেয়া হয়েছে; কেননা তার ছোট এক শিশু রয়েছে।

মাহফুজা জানায়, তার দাদি শাহাদাত হোসেনের বাসায় তাকে কাজ করতে পাঠায়। সে জানে না, তার পিতা-মাতা কোথায়। কিন্তু তার পরিবারের তখন টাকার দরকার ছিল।

সিএনএনকে মাহফুজা বলে, আমার চাচার কোনো চাকরি ছিল না। আমার দাদি ছিল অসুস্থ। আমাদের কোনো টাকা ছিল না। এ জন্যই আমাকে গৃহকর্মীর কাজে পাঠানো ছাড়া আর উপায় ছিল না।

সে জানায়, তাকে ঘরে তালাবদ্ধ করে যেত শাহাদাত দমপতি। এমনকি তাকে গোসলখানার মেঝেতে ঘুমাতে হতো। তার ভাষায়, তারা আমাকে ঠিকমতো খাবার দিতো না। সাধারণত, উচ্ছিষ্ট বা নষ্ট হয়ে যাওয়া খাবার দিতো আমাকে।

এ কারণেই পালানোর উপায় খুঁজছিল মাহফুজা। মনে মনে ঠিক করে রাখে সে, প্রয়োজনে রাস্তায় ভিক্ষা করবে, তবুও এ ঘরে আর নয়। একদিন অপর এক গৃহকর্মী দরজা খুললে, সুযোগটি ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয় সে।

সে বলে, যখন ওই কাজের ছেলে ঘরে ঢুকলো, তখন দরজা খুলেছিলাম আমি। দরজা খোলা ছিল, আমি দৌড়ে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাই। কিন্তু তার পক্ষে তখন জোরে দৌড়ানো সম্ভব ছিল না। বরং সে হাঁফাচ্ছিল।

সে জানায়, আমি খুব কষ্টে ছিলাম। আমি যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলাম, মানুষ তখন আমার দিকে তাকাচ্ছিল। আমি আমার চোখ ঢেকে রেখেছিলাম, কারণ এটা একেবারে থেঁতলে গেছে, আমি ব্যথাও পাচ্ছিলাম। একপর্যায়ে আমি ক্লান্ত হয়ে রাস্তার পাশে বসে যাই।

সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন তাকে খুঁজে পান। তিনি মাহফুজাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে পুলিশকে বিষয়টি জানান।

বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক নজরুল ইসলাম বলেন, মেয়েটির ক্ষত ছিল মারাত্মক। তার শরীরের কিছু অংশ নড়ে গেছে। চোখ ফুলে গিয়ে, বড় আকারে কালশিরে পড়ে যায়।

ঢাকার বাড়ি ছেড়ে পালিয়া যাওয়ার পর শাহাদাত ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে পুলিশ। এমনকি শাহাদাতের গ্রামের বাড়ি ও তার শ্বশুর বাড়িতেও হানা দেয়া হয়। চার সপ্তাহ পর ঢাকায় নিজের পিতার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয় শাহাদাতের স্ত্রীকে। পর দিন শাহাদাত আত্মসমর্পন করেন। শিগগিরই আদালতে উপস্থিত করা হলেও তাদের জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

শাহাদাত ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ বাংলাদেশের অনেককে স্তব্ধ করে দিয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে, যাদের অনেকে তাকে নায়ক ভাবতো।

২৯ বছর বয়সী ফাস্ট বোলারের জাতীয় দলে অভিষেক ঘটে ২০০৫ সালে। ৩৬টি টেস্ট ও ৫১টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন তিনি। ক্রিকেটের উভয় সংস্করণেই তিনি শতাধিক উইকেট পেয়েছেন। লর্ডসের অনার্স বোর্ডে তালিকাভুক্ত থাকা বাংলাদেশের একমাত্র বোলার তিনি। তবে ওই ঘটনার পর থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত সব ধরনের ক্রিকেট থেকে শাহাদাতকে বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত