টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে সাইবার ক্রাইম,

অপরাধ রোধে প্রয়োজন কঠোর আইন

সাইবার ক্রাইমচট্টগ্রাম, ৩০ নভেম্বর (সিটিজি টাইমস):: দিনে দিনে বেড়েই চলছে সাইবার ক্রাইম। এর শিকার হচ্ছেন মূলত নারীরা। ইমেইল, ফেসবুক, টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বনামে-বেনামে আইডি খুলে যৌন হয়রানি করে চলেছেন অপরাধীরা। তারা ভুয়া এফবি-টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে নারীদের কাছে আপত্তিকর ছবি পাঠাচ্ছেন। এছাড়া, অ্যাডাল্ট ছবির সঙ্গে আরেকজনের ছবি জোড়া দিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছেন এসব সোশ্যাল মিডিয়ায়। একইসঙ্গে নানা রকম এডাল্ট মুভির ভিডিও ক্লিপ এডিট করে নারীদের ছবি জুড়ে দিয়ে তাদের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের চেষ্টা চলছে। এতে ব্যর্থ হলে ছড়িয়ে দিচ্ছে ফেসবুক-ইউটিউবে। কেবল তাই নয়, এসব আপত্তিকর ছবি-মুভি টার্গেটকৃত নারীদের আত্মীয়-স্বজনের কাছেও পৌঁছে দিচ্ছে তারা। অথচ এ ধরনের অপরাধ রোধে কার্যকর কোনও আইন না থাকায় এসব অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছেন বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী, সাইবার অপরাধ বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী, নারীনেত্রী ও আইনজীবীরা।

আমেরিকায় থাকেন বাংলাদেশি দম্পতি রুমকি-জিয়া (ছদ্মনাম)। রুমকি-জিয়ার সুখের সংসারে হানা দিয়েছে মেয়েটির ফেসবুক ফ্রেন্ড। ফেসবুকেই পরিচয় হয় বাংলাদেশে থাকা এক তরুণের সঙ্গে। একসময় রুমকির ভার্চুয়াল বন্ধু থেকে ছেলেটি হয়ে ওঠে মেয়েটির আতঙ্ক। রুমকির বিদেশি নম্বরেই ম্যাসেজ পাঠায় বাংলাদেশ থেকে। ফেসবুকে অশ্লীল মেসেজ-ছবি পাঠানো এখন ছেলেটির রুটিন ওয়ার্ক হয়ে গেছে। রুমকি এখন ভয়ে ফেসবুকই খোলেন না। তিনি সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকেন, এই বুঝি ফেসবুক, মেইল খুললেই ছেলেটির অশ্লীল লেখা-ছবি পাবেন। শুধু নিজের নয়, নানা ফেক আইডি ও ইমেইল আইডি থেকেও এসব পাঠানো হচ্ছে রুমকিকে।

এ প্রসঙ্গে কথা হয়, চিফ স্ট্রাটেজিক অফিসার ফাইবার অ্যাট হোম সুমন আহমেদ সাবিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, এ ধরনের প্রচুর ঘটনা ঘটছে। দুটো জিনিস, কিছু ঘটনা ঘটছে ব্যবহারকারীর দুর্বলতা বা জ্ঞানের সুযোগ নিয়ে, পাসওয়ার্ড চুরি করে নিয়ে নানা রকম তথ্য দিচ্ছে, ছবি দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারী অসহায় অবস্থায় পরছে যে তার আইডি আরেকজন ব্যবহার করছে, যেটা তার নিয়ন্ত্রণে নেই। তিনি বলেন, আমরা এখনও লোকালি চিন্তা করছি, এসব ঠেকানোর।কিন্তু প্রতিবছর বিভিন্ন দেশে তিন থেকে ছয়টা ইভেন্ট হয়। যেখানে পৃথিবীর অনেক দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যায়, ফেসবুক, গুগল, ইয়াহু, এমারগনের প্রতিনিধিরা যান। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণ করা হয় না। ওখানে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কিভাবে এসব সমস্যার সমাধান করা যায় তা নিয়ে। অথচ, সরকারিভাবে এ ব্যাপারে আমাদের কোনও উদ্যোগ নেই।

এ ধরনের ক্রাইম সম্পর্কে কথা হয় মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোর্তিময় বড়ুয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, সাইবার ক্রাইম বিষয়টি একদমই আলাদা। গত কয়েকদিনে আমাদের কাছে বেশ কিছু সাইবার ক্রাইমের ঘটনা এসেছে। যাদের মূল টার্গেটই হচ্ছেন নারীরা। এটা ডিজিটাল ফর্মেটে হচ্ছে বলে ক্রিমিনালদের বিরুদ্ধে কিভাবে কী করবে, এটা অনেকের কাছেই ঝাপসা। এ ধরনের অপরাধ বিষয়ে কাজ করে পুলিশের কয়েকটা টিম। যাদের কাছে রিপোর্ট করলেই তারা তদন্ত করে। তবে এ বিষয়ে আমাদের দেশে সুস্পষ্ট কোনও আইন নেই। এমনকি আইসিটি অ্যাক্টেও এই অপরাধগুলোকে কিভাবে সামলানো যাবে, সে বিষয়ে কিছু বলা নেই। অশ্লীল কিছু প্রকাশিত হলে ৫৭ ধারায় বলা আছে, কিন্তু ৫৭ ধারা নিজেই ডিফেকটিভ। ৫৭ ধারা আসলে সত্যিকারের ভিকটিমকে প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে কোনও ভূমিকা রাখেনি।

জ্যোর্তিময় বড়ুয়া বলেন, সাইবার অ্যাক্টেই নতুন ধারা সংযোজন করে নারীদের প্রতি সুরক্ষা দেওয়া যেত। ২০১৫ তে সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট ড্রাফট যেটা প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে প্রথম ড্রাফটে বেশ কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও দ্বিতীয় বা তৃতীয় ড্রাফটে সেগুলো নেই। কিন্তু প্রথম ড্রাফটে বেশ কিছু ধারা ছিল, যেগুলোর বাস্তবায়ন করা গেলে ভালো প্রটেকশন পাওয়া যেত। তিনি সাংবাদিক সু্প্রীতি ধরের ঘটনা তুলে ধরে বলেন, দিনে তাকে ১৯৮ বার ফোন করা হয় একেক নম্বর থেকে। এ ক্ষেত্রে কোনও লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক নেই। তাই বাইপাস করে পারসোনাল সিকিউরিটি ও ডিজিটাল সিকিউরিটির কিছু পদ্ধতি তাকে দেওয়া হয়েছে। তবে এটা চূড়ান্ত সমাধান নয়। যতই ফেক আইডি হোক, কোন আইপি অ্যাড্রেস থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে, সেগুলো ডিটেক্ট করার মতো যথেষ্ট স্মার্ট সফটওয়্যার আমাদের সিকিউরিটি এজেন্সিগুলোর কাছে আছে। আইপি অ্যাড্রেস থেকে ট্র্যাক করা সম্ভব। যদি মোবাইল থেকে করা হয় মোবাইলের আইএমইআই ধরা সম্ভব। ভাইবারের মাধ্যমে অপরাধ ঘটলেও সেটা ধরা সম্ভব। এগুলোর যদি দু-একটা কঠোর শাস্তি দিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করা যেত, তাহলে কিছুটা হলেও অপরাধ কমত। নতুন যারা এ অপরাধ করার কথা ভাবছেন, তারাও দশবার চিন্তা করতেন। আমাদের প্রতিবাদের আওয়াজটা আরও জোরালো হওয়া উচিত। আমি মনে করি, সোশ্যাল মিডিয়া নয়, মেইনস্ট্রিম মিডিয়া থেকেই প্রতিবাদটা জোরালো হওয়া উচিত।

এদিকে, দেশে সাইবার অপরাধ ও সাইবার হয়রানি বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইসিটি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। তিনি চলতি বছরের মাঝামাঝিতে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। ওই পোস্টে তিনি সাইবার হয়রানি থেকে রক্ষা পেতে একটি ‘হেল্পলাইন’ প্রকাশ করেন। তার ০১৭৬৬৬৭৮৮৮৮ নম্বরের এই হেল্প লাইনটি সপ্তাহের সাতদিন, ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে। বাংলাদেশের যেকোনও জায়গা থেকে যে কেউ হেল্পলাইনে সরাসরি ফোন করে অথবা এসএমএসের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারবেন। এই হেল্প লাইনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইনসাইট বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক তানভীর চৌধুরী বলেন, গত দেড় বছরে হেল্পডেস্কে মোবাইলফোনের মাধ্যমে ১২ হাজারের বেশি অভিযোগ গ্রহণ করা হয়। যার অধিকাংশই ভুয়া ফেসবুক আইডি, হ্যাকড ফেসবুক, ই-মেইল আইডি হ্যাকড, বিভিন্ন ধরনের পর্নোসাইট বা ব্যক্তিগত ছবি পর্নোসাইট ছেড়ে দেওয়া সংক্রান্ত। এর মধ্যে ৭৫ শতাংশ ফেসবুককেন্দ্রিক। আর এই ফেসবুককেন্দ্রিক অভিযোগগুলো এসেছে নারীদের কাছ থেকে। একদল নিজের অজান্তেই সাইবার ক্রাইম করছে। প্রতিহিংসা বা একান্ত কৌতূহলের কারণেই তারা এ ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। আরেক দল জেনেশুনেই অন্যের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে সাইবার ক্রাইম করছে।

এদিকে, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সংস্থার সদস্য অ্যাডভোকেট দিলরুবা শারমিন  বলেন, সাইবার ক্রাইম আইন থাকলেও সেটা বাস্তবায়ন নেই। আইনটা সম্পর্কে আমরা জানি না, ব্যাপক কোনও প্রচার নেই। আমাদের লিগ্যাল এইড সংগঠন—ব্লাস্ট, আইনও শালিস কেন্দ্র, বিএনডব্লিইউএলএ, মানবাধিকার সংস্থা রয়েছে। এছাড়া রয়েছে আইন মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রজেক্ট। যেখানে এই আইন নিয়ে কাজ করা যায়। শুধু ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটস-অ্যাপ বন্ধ করলে কিছুই হবে না। এটিকে পাঠ্যপুস্তকের অর্ন্তভুক্তও করা যায়। এ সম্পর্কে এমনভাবে সচেতন হতে হবে। যেন সরকার বাধ্য হয় জেলা, উপজেলা, থানা পর্যায়ে এই বিষয়টাকে জানিয়ে দিতে। সরকারের সংশ্লিষ্টদেরও এ বিষয়ে সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে হবে। তাহলেই সাইবার ক্রাইম বন্ধ হবে।-বাংলা ট্রিবিউন

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

One comment

  1. আন্দোলন, প্রতিবাদ, অভিযোগ করতে হবে কেন ? সরকারের কি চোখ, কান খোলা নেই । সাইবার ক্রাইম নিয়ে অনেক দিন ধরে হই চই শুনছি , তবুও সরকারের টনক নড়েনা কেন ? পাবলিকের পিট দেয়ালে ঠেকে গেলেে এবং প্রতিবাদ জালাও-পোড়াও পর্য্যন্ত গেলে সরকারের হুশ হয় ।

মতামত