টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

রাজনীতিতে আসছেন হুম্মাম?

চট্টগ্রাম, ২৪  নভেম্বর (সিটিজি টাইমস): রাজনৈতিক জীবনে তিনি অনেক রসাল বক্তব্য, কটূক্তি আর হুংকারের কারণে আলোচিত-সমালোচিত দুই-ই ছিলেন। এসব দম্ভ আর হুংকার কারও কারও মাথাব্যথার কারণ হলেও তার ভক্তদের জন্য ছিল বিনোদনের খোরাক। প্রিয় নেতার এসব কথা গর্ব করে বলে বেড়াতেন অনেকে।

কিন্তু একাত্তরের মানবতাবিরোধী মামলায় ফাঁসির দণ্ড হওয়ার পর তারা মনে করছেন,এ সবই কাল হয়েছে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জন্য। এখন তার অনুসারীরা শঙ্কিত ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে নিয়ে। বাবার ফাঁসি কার্যকর ঘিরে তার মধ্যে যে বাকপ্রবণতা দেখা গেছে, তাতে বাবা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছায়া দেখছেন অনেকে।

অবশ্য হুম্মামের দেহে এমনিতেই বইছে রাজনৈতিক পরিবারের রক্ত। দাদা ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন পাকিস্তান গণপরিষদের স্পিকার। এক দিনের জন্য পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টও হয়েছিলেন তিনি। দাদার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বাবা টেনেছেন। এখন বাবার উত্তরাধিকার কি হুম্মাম ধারণ করবেন?

সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর তিন সন্তানের মধ্যে সবার বড় ফজলুল কাদের চৌধুরী। মেয়ে ফারদিন কাদের চৌধুরী। সাকার বিচার ও ফাঁসি কার‌্যকর ঘিরে আদালত, সংবাদমাধ্যম- সব জায়গায় সরব দেখা গেছে অন্য ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে। এ থেকে অনেকে ধারণা করছেন, হুম্মাম কাদের চৌধুরী হয়তো বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারে আসীন হবেন।

বাবার বাগাড়ম্বর হুম্মামে

সাকার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হুম্মাম নেবেন-এ ধারণা যারা করছেন, তাদের যুক্তি হিসেবে ঘুরেফিরে আসে হুম্মামের সেই বাকপ্রবণতা আর বাগাড়ম্বর, যা তার বাবারও ছিল। ফাঁসি কার্যকরের আগে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাবার সঙ্গে শেষ সাক্ষাৎ করে বেরিয়ে আসার সময় বাবার প্রাণভিক্ষার আবেদনের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হুম্মাম অগ্নিঝড়া কণ্ঠে বলেন, “সব বাজে কথা। কে বলেছে আপনাদের এসব কথা। বাবা তো আমাকে বলেছেন, ‘৬ ফুট ২ ইঞ্চি লম্বা তোমার বাবা, কারও কাছে মাথা নত করতে পারে না। প্রাণভিক্ষা বা ক্ষমা চাইলে আল্লাহর কাছে চাইব, কোনো মানুষের কাছে নয়’।”

চট্টগ্রামের রাউজানে পারিবারিক কবরস্থানে সাকা চৌধুরীর লাশ দাফনের পর নিজ বাড়ি বাইতুল বিল্লাহতে সংবাদ সম্মেলনে হুম্মাম বলেন, “মানুষ বাবাকে বাংলার বাঘ হিসেবে চিনে। তিনি কখনো প্রাণভিক্ষা চাইতে পারেন না।”

বাবার প্রাণভিক্ষা না চাওয়ার যুক্তি হিসেবে হুম্মাম বলেন, “বাবা তো জানতেন প্রাণভিক্ষা চাইলেও তিনি পাবেন না। কারণ যার কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন তাদের সাথে তো বাবার ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যা রয়েছে। এরপরও কি বাবা প্রাণভিক্ষা চাইতে পারেন?”

হুম্মাম কাদের চৌধুরীর এই উক্তি বোঝা কঠিন বিষয় নয়। প্রথমত, সাকার ছিল বিপরীত রাজনৈতিক অবস্থান; দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিনির্বিশেষে বাছবিচারহীন কটূক্তি আর ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের কারণে পক্ষে-বিপক্ষের বেশির ভাগ রাজনীতিকের সঙ্গে বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্ক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলাকালেও তার এই প্রবণতা অব্যাহত ছিল। এমনকি ট্রাইব্যুনালে রায় দেয়ার সময় বিচারকের উদ্দেশে ব্যঙ্গ করে সাকা বলেন, “তোমার বোনকে বিয়ে করার কথা ছিল, সেটা বলো না।”

সেই বাবা সালাউদ্দিনকে চট্টগ্রামের সিংহপুরুষ বলে অভিহিত করে সংবাদ সম্মেলনে হুম্মাম বলেন, “বাবাকে হত্যার বিচার একদিন হবেই। শেখ হাসিনা যদি ৪০ বছর পর তার বাবা হত্যার বিচার করতে পারে, তাহলে আমরাও পারব।”

১০ মিনিটের সংবাদ সম্মেলনে হুম্মাম বাবার ফাঁসির মাহাত্ম্যও তুলে ধরতে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি বলেন, “অবৈধ রায়ে বাবাকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। তবু আমরা নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছি। দেশে এখন এমন এক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যেখানে অনেক খুন-গুম হচ্ছে। অনেকে আপনজনের মরদেহ খুঁজে পাচ্ছে না। আমরা ভাগ্যবান যে সম্মানের সঙ্গে বাবাকে দাফন করতে পেরেছি।”

সালাউদ্দিনকে নির্দোষ দাবি করে হুম্মাম বলেন, “একজন বেকসুর মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। দেশের মানুষ অবশ্যই একদিন ন্যায়বিচারের ডাক দেবে। ইংরেজিতে লিগেসি বলে যা আছে তা টিকে থাকবে। চট্টগ্রামের মানুষ এ রায় কোনোদিন মেনে নেবে না।”

বাবার পথে হাঁটছেন হুম্মাম?

ছেলের এ ধরনের কথাবার্তায় রাজনৈতিক মহল বাবা সালাউদ্দিনের প্রতিধ্বনি খুঁজে পাচ্ছেন। তাতে শঙ্কিত সাকা চৌধুরীর অনুসারীরা। কারণ দম্ভোক্তি ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ কটূক্তির জন্য ব্যক্তি ও রাজনৈতিক জীবনে ব্যাপকভাবে আলোচিত-সমালোচিত ছিলেন সাকা চৌধুরী, যা সর্বশেষ রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ার পর খোদ আদালতে উপস্থিত মানুষের মুখেও শোনা গেছে।

হুম্মাম কি সেই পথেই হাঁটছেন?

রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শফিকুল ইসলাম বেবি বলেন, দেশের মানুষের কাছে সাকা চৌধুরী হিসেবে পরিচিত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ব্যক্তিচরিত্রের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে ছিল তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের মুখচ্ছবি, বাঁকা হাসি, রসাল বক্তব্য আর ঔদ্ধত্যপূর্ণ বাক্যবাণ।

শফিকুল ইসলাম বলেন, “ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী বাবার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে একই কাজ করে চলেছেন। ইতিমধ্যে তিনি ঔদ্ধত্যপূর্ণ অনেক বাক্যবাণ ছুড়েছেন, যা একদম তার বাবার মতো।”

সাকার বড় ছেলে ফজলুল কাদের চৌধুরী ও মেয়ে ফারদিন কাদের চৌধুরীর কথা উল্লেখ করে শফিকুল ইসলাম বলেন, “তারা কিন্তু এ ধরনের কোনো কার্যকলাপ এখনো করেননি। হুম্মাম কাদের চৌধুরীর কার্যকলাপ দেখে মনে হচ্ছে তিনিই বাবার স্থান দখল করবেন।”

এক প্রশ্নের জবাবে শফিকুল ইসলাম বলেন, “হুম্মাম কাদের চৌধুরী রাজনীতিতে আসবেন কি না এ ধরনের কোনো ঘোষণার কথা আমি শুনিনি। আবার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই তিনি রাজনীতিতে আসতে পারবেন না, তা তো নয়। পরিস্থিতি বুঝে হয়তো তিনি সেটা না করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজনীতি শুরুই করে দিয়েছেন।”

এ প্রসঙ্গে জানার জন্য মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও হুম্মাম কাদের চৌধুরীর ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। রাউজানের বাড়িতে দেখা করতে গেলে বাড়ির কেয়ারটেকার জানান, হুম্মাম কাদের পরিবারের সঙ্গে চট্টগ্রামে অবস্থান করছেন। তবে কোথায় আছেন সে ব্যাপারে কোনো তথ্য দেননি তিনি।

সাকার যত রাজনৈতিক কটূক্তি

এদিকে সাকা চৌধুরীর ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও রসাল আচরণের আলোচনা-সমালোচনা যেন থামতেই চাইছে না চট্টগ্রামের রাজনৈতিক মহলে। সরকার বন্ধ করে রাখলেও বিকল্প পথে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতেও এসব নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।

বিশেষ করে সাকা চৌধুরী ফাঁসি নিয়ে বিএনপির দায়সারা প্রতিক্রিয়া, খালেদা জিয়ার নীরবতার প্রসঙ্গটি আসছে বেশি।

সাকা চৌধুরী বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং তার ছেলে তারেক রহমানকে নিয়েও কটূক্তি করতে ছাড়েননি। এ জন্য নিজ দলেও সমালোচিত ছিলেন তিনি।

বিএনপির চেয়ারপারসনকে নিয়ে সাকা চৌধুরী বলেছিলেন, “তালাকপ্রাপ্ত বউয়ের ঘর করি না আমি।” তারেক রহমানের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে খালেদা জিয়া নীরব থাকার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেছিলেন, “আগে কুকুর লেজ নাড়ত, এখন লেজ কুকুরকে নাড়ায়।”

২০০৪ সালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা নিয়ে তির্যক মন্তব্য করেন সাকা চৌধুরী। তিনি বলেছিলেন, “আমি গ্রেনেড ছুড়লে সেটা তো মিস হতো না।”

সাকা আরও বলেছিলেন, “ছাত্রজীবনে শেখ মুজিব আমার বাবার শিষ্য ছিলেন।” বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সঙ্গে তার পরিবারের ভালো যোগাযোগ ছিল- এমন দাবি করে তিনি বলেন, “শেখ হাসিনাকে তার বিরুদ্ধে উসকে দিচ্ছে কেউ কেউ। ওই মহলটি জানে না, তারা যে বিলের মাছ, আমি সালাউদ্দিন ওই বিলের বক।”

তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট ওআইসির মহাসচিব পদে সাকা চৌধুরীর নাম প্রস্তাব করলে এর সমালোচনা করেন আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। এর জবাবে সাকা চৌধুরী বলেছিলেন, “ওআইসি নিয়ে বাবু কথা বলার কে? ওআইসি নিয়ে কথা বলতে হলে ওনাকে আমি ছোটবেলায় যে জিনিসটা কেটে ফেলে দিয়েছি, আগে ওই জিনিসটা কেটে ফেলতে হবে।”

নারী নির্যাতন সম্পর্কে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলামের একটি বক্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে সাকা চৌধুরী বলেছিলেন, “তিনি কেরানীগঞ্জের একজন প্রমোদবালক- এটা কি আমি কখনো বলেছি?”

২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে সাকা চৌধুরী বলেছিলেন, “আমার না হলে, ফাঁসি কারো হবে না।” নিজের পক্ষে সাফাই সাক্ষীর বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষক হলে আমিও মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক।”

সাকার অনুসারীরা যা বলেন

সাকা চৌধুরীর এসব দম্ভোক্তি ও বর্তমানে তার ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরীর বাকপ্রবণতা নিয়ে কথা হয় তাদের অনুসারী কয়েকজনের সঙ্গে। তাদের মধ্যে রাউজান উপজেলা বিএনপির কর্মী দিদারুল আলম বলেন, “সাকা চৌধুরী একজন সৎ রাজনীতিক ছিলেন। ফলে তিনি মানসিকভাবে বলীয়ান ছিলেন। এ জন্য সত্যের পক্ষে কথা বলতে ছাড়তেন না তিনি।”

দিদারুল আলম বলেন, “ব্যক্তিজীবনে তিনি (সাকা) শুধু বাক্যবাণই ছুড়ে গেছেন, কারও ক্ষতি করেননি। তার কথায় স্বার্থান্বেষী মহল ক্ষুব্ধ হলেও আনন্দ ও সাহস পেতেন সাধারণ মানুষ। শেষ পর্যন্ত তার খেসারত দিতে হলো তাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলে।”

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপি নেতা মো. ইলিয়াছ বলেন, “সাকা চৌধুরীর হাল ধরার জন্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী রাজনীতিতে আসতে পারেন- এমন গুঞ্জন চলছে দলের মধ্যে। তবে এখনো পর্যন্ত এ রকম কোনো ঘোষণা দেননি তিনি। আমরাও চাই বাবার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে হুমাম কাদের চৌধুরী রাজনীতিতে আসুক ।”

মতামত