টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

লুণ্ঠন অব্যাহত, অধরা সাগরের ৪১ দস্যু

jolodosso pic_1ইমাম খাইর, কক্সবাজার ব্যুরো:
এখনো অধরা রয়ে গেছে সাগরের ৪১ দস্যু। তাদের হাতে প্রতিনিয়তই লুণ্ঠনের শিকার হচ্ছে ফিশিংবোট। অপহৃত হচ্ছে মাঝিমাল্লারা। প্রতিদিন বিভিন্নভাবে হুমকি ধমকি দিয়ে যাচ্ছে জেলেদের। পুরো সগরজুড়ে চলছে দস্যুদের তান্ডবলিলা।
গত বুধবার রাতে এফভি আল্লাহর দান নামে একটি মাছধরার ট্রলার লুণ্ঠন করে জলদস্যুচক্র। এরপর এটি ডাকাতির কাজে ব্যবহারের জন্য তাদের আস্তায় নিয়ে যায়।
১২ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ভোরে ট্রলারটি মহেশখালী সোনাদিয়া দ্বীপের দূর্গম প্যারাবন থেকে উদ্ধার করে  কোস্টগার্ড।
এর দুই সপ্তাহ আগে সাগর থেকে অপহৃত ৯ মাঝিমাল্লাসহ ৩ ফিশিংবোট এখনো ফেরত দেয়নি জলদস্যুরা। এ নিয়ে অপহৃতদের পরিবারে বিরাজ করছে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। তাদের ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে স্বজনেরা।
জেলেরা জানায়, গত ৫ নভেম্বর সাগরে মাছধরার ট্রলার ডাকাতিকালে মোহাম্মদ জামাল ও জাহাঙ্গীর নামে দুই জলদস্যু সম্রাট আটকের পর থেকে হুমকি ধমকির পরিমাণ বেড়েছে। বোট মালিকদের সাগরে পেলে দেখে নেয়ার হুমকি দিচ্ছে। যে কারণে ভর মৌসুমেও সাগরে মাছ শিকারে যেতে ভয় পাচ্ছে জেলেরা।
এ দিকে এফভি আল্লাহর দান নামের ফিশিংবোট ডাকাতিতে জড়িত কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে।
তারা হলো- সোনাদিয়া পূর্বপাড়া এলাকার বদি আলমের ছেলে আনজু, মো. হোসেন, আব্দুর রহমানের ছেলে মোনাফ, মোজাফ্ফরের ছেলে ফারুক, মোবারক, আব্দুর রহমানের ছেলে আব্দুল জব্বার, মোহাম্মদ করিম, রহমত আলীর ছেলে আবুল কালাম, আবুল কাসিমের ছেলে জয়নাল, আব্দুল করিমের ছেলে ছৈয়দ মাঝি, কুতুবদিয়া এলাকার জসিম উদ্দিন ও কালু।
ওই ফিশিংবোট থেকে লুণ্ঠিত মালামাল শহরের নাজিরারটেক এলাকায় ডাকাতদের নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি ফিশিংবোটে রয়েছে বলে জেলেদের একটি সুত্র জানায়।
জেলা ফিশিংবোট মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আহমদ জানান, বুধবার গভীর রাত থেকে সাগরে অভিযানে নামে কোস্টগার্ড। প্রয়োজনীয় সামগ্রী না থাকলেও তাদের দুঃসাহসিক অভিযানে ডাকাতদলের লুণ্ঠনের শিকার একটি ফিশিংবোট উদ্ধার হয়। তবে অভিযানের টের পেয়ে দস্যুরা নিরাপদে সটকে পড়ে।
তিনি বলেন, জলদস্যুরা খুবই সংগঠিত। একজনকে ধরার খবর পেলে পুরো সাগরে নৈরাজ্য আরো তীব্র হয়ে ওঠে। দস্যুদের নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ভূমিকা সন্তুষজনক নয়। কোস্টগার্ডকে আরো বেশী শক্তিশালী করা দরকার।
ফিশিংবোট মালিক সমিতির নেতা শফি আলম বাশি জানান, কোস্টগার্ড ঢাল তলোয়ারবিহীন একটি বাহিনী। জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে তারা সঠিক সময়ে অভিযানে নামতে পারেনা। এ কারণে দস্যুথা থামছেনা।
এরপরও জলদস্যু নির্মুলে কোস্টগার্ডের তৎপরতা শুরু হয়েছে বলে তিনি দাবী করেন।
নুর মোহাম্মদ ও শামসুল আলামসহ বেশ কয়েকজন মৎস্যজীবি জানান, সাগরে অব্যাহত দসূতায় মাছ শিকারে যেতে ভয় করছে জেলেরা। জলদস্যু দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
জেলেদের সাথে কথা হলে তারা জানায়, সাগরে তাদের নিরাপত্তা বলতেই নেই। মাছ ধরতে গিয়ে প্রতিদিন ডাকাতির শিকার হচ্ছে ট্রলারগুলো। অপহরণ ও লুটের শিকার হচ্ছে মাঝিমাল্লারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সোনাদিয়ার দুর্ধর্ষ জলদস্যু জাম্বু বাহিনী, সরওয়ার বতইল্যা বাহিনী ও জলদস্যু সম্রাট নাগু মেম্বারের ছেলে রাকিব ও নকিব বাহিনী এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। তাদের নেতৃত্বে বাঁশখালী, কুতুবদিয়া, হাটখালী, চকরিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতির ঘটনা ঘটছে বলে বিভিন্ন সুত্র নিশ্চিত করেছে।
দস্যুতায় জড়িত লোকদের ব্যাপারে ব্যাপক অনুসন্ধান করতে গিয়ে ওঠে আসে অনেকের নাম। সেখানে রয়েছে ৪১ জনের শক্তিশালী ডাকাতদলের সিন্ডিকেট। এরাই সাগরের রাজা হিসাবে পরিচিত বলে বোট মালিক ও জেলেরা জানায়।
তারা হলো- চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাসিন্না ডাকাত, রবি বাহিনীর প্রধান রবি, কর্ণফুলির ইয়াছিনের ছেলে আহমদ নবী, মহেশখালীর সোনাদিয়ার নাগু মেম্বারের ছেলে রাকিব, নকিব, বাহাদুর মিয়ার ছেলে সরওয়ার বতইল্যা, মো. ছমদের ছেলে জাহাঙ্গীর, বদি আলমের ছেলে আঞ্জু মিয়া, নুরুল ইসলামের ছেলে বক্কর, শহরের নুনিয়ারছরার নজরুল ইসলামের ছেলে ফারুক, সোনাদিয়ার ফরুখ আহমদের ছেলে রুহুল আমিন, এখলাছ মিয়ার ছেলে মোর্কারম জাম্বু, কালা মিয়ার ছেলে শফি, একে ফজলুল হকের ছেলে সাইফুল, মোজাফ্ফর আহমদের ছেলে মোস্তফা আলীর ছেলে সুমন, বদি আলমের ছেলে (আঞ্জুর ভাই) নাগু-২, শফিক (অজ্ঞাত পিতা), মৃত কাসিম আলীর ছেলে সিরাজ (বর্তমানে শহরের চরপাড়ার বাসিন্দা), মহেশখালীর ঘটিভাঙার আব্দুর রহমানের ছেলে আব্দুল মোনাফ, কালারমারছড়ারা শীর্ষ সন্ত্রাসী জাহাঙ্গীর, পূর্ব ঘোনারপাড়ার মোজাহের মিয়ার ছেলে আব্দুস সবুর ও আব্দুল গফুর, পুটিবিলার ইউসুফ আলীর ছেলে সামশুল মাঝি, মাতারবাড়ীর শিমুল বাহিনীর প্রশান শিমুল, রাহঘাটের জয়নাল প্রকাশ জয়নাল ডাকাত, কুতুবদিয়ার রমিজ ডাকাতের ভাই ইউনুছ, সহযোগি কাউছার, দিদার প্রকাশ কানান দিদার (পিতা অজ্ঞাত), এখলাস মিয়ার ছেলে মকসুদ, আনোয়ার পাশার ছেলে সাদ্দাম, রহমত আলীর ছেলে আবুল কালাম, দক্ষিণ ধুরুং এর সর্দার বাদল, উত্তর ধুরুং এর সাহেদ, আকবর, বলীঘাটের বাদশা, লেমসীখালীর রুহুল কাদের, ছালেহ আহমদ, দরবারঘাটের রুবেল বাহিনীর রুবেল, চুলাপাড়ার আবুল কাসেম আবুইয়া, পেকুয়ার রাজাখালীর সেলিম বাহিনীর প্রধান সেলিম।
কোস্টগার্ডের কক্সবাজার কন্টিনজেন্ট কমান্ডার নান্নু মিয়ার দাবী, স্থলভাগ থেকে ৭ কিলোর বাইরে তারা যেতে পারেননা। নেই পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জামাদি। আছে একটি মাত্র কাঠের বোট, যেটি দিয়ে সাগরে অভিযানে নামা অনেকটা দুরুহ ব্যাপার। এরপরও কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, বুধবার গভীর রাত থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত আমরা সাগরে দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়েছি। গভীর প্যরাবন থেকে ডাকাতির শিকার একটি ফিশিংবোট উদ্ধার করি। তবে পালিয়ে যাওয়ায় কোন জলদস্যু আটক করা যায়নি বলে তার দাবী।
জেলা ফিশিংবোট মালিক সমিতির সভাপতি মুজিবুর রহমান জানান, ডাকাতির কারণে জেলেরা সাগরে মাছ শিকারে যেতে ভয় করছে। সংঘবদ্ধ দস্যুরা প্রতিনিয়তই ডাকাতি, লুট ও অপহরণ অব্যাহত রেখেছে। গত এক বছরে ৬৩ মাঝিমাল্লাসহ ২১ ফিশিংবোট অপহরণহয়েছে। ১৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ফিরেছে ৬৩ মাঝিমাল্লা। এছাড়া গত ৫ বছরে জলদস্যুদের হাতে ২০০’শ জনের অধিক লোক প্রাণ হারিয়েছে।
তিনি বলেন, ডাকাতি বন্ধে আমরা প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছি। চিহ্নিত ডাকাতদলের তালিকা ইতিমধ্যে প্রশাসনের কাছে জমা দেয়া হয়েছে। তালিকা ধরে প্রশাসন অভিযানে নামবে।
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, মহেশখালী, সোনাদিয়া, কুতুবদিয়াসহ সব পয়েন্ট ঝুকিমুক্ত করতে সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও বোট মালিকদের সমন্বয়ে করণীয় ঠিক করা হবে শীঘ্রই।
তাছাড়া এলাকা ভিক্তিক জলদস্যুদের তালিকা করে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।

মতামত