টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

জামায়াত কোথায়?

চট্টগ্রাম, ০৯ নভেম্বর (সিটিজি টাইমস):  দু-চারটে বইয়ের দোকান, তাও বন্ধ থাকে বেশিরভাগ সময়। মুদিখানা, ফলের দোকান খোলা থাকে নিয়মিত। তবে রাত ৯টার আগেই শেষ হয় বেচাকেনা। আশপাশের বাসাবাড়িতেও মানুষের আনাগোনা সীমিত। ডাকলে কথা বলতেও অনীহা দেখান প্রায় সবাই। রাজধানীর বড় মগবাজার, জামায়াতে ইসলামীর কার্যালয় এলাকায় সব কিছু নিয়ে সংশয়-সন্দেহ। বছরের বেশি সময় হতে চলল সংগঠনটির কোনো নেতাকে দেখা যায়নি কার্যালয়ে যেতে। তালা ঝুলছে ঢাউস। জানতে চাইলে স্থানীয় একজন বললেন, ‘এখানে কী কাজে আসবে নেতারা? সাদা পোশাকের পুলিশ ঘোরাফেরা করে। কাউকে পেলেই ধরে সোজা কারাগারে।’

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরা জামায়াতে ইসলামী ’৭৫-এর পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়েছে বেশ ভালোভাবেই। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের বদান্যতায় যে দেশের স্বাধীনতা রুখতে চেষ্টা করেছে, সে দেশেই রাজনীতিতে ফিরেছে তারা। আলেম-ওলামারা জামায়াতকে আদৌ ইসলামী সংগঠন মানতে নারাজ হলেও ইসলামের কথা বলেই মানুষের মন জয়ের চেষ্টা করেছে। প্রকাশ্য রাজনীতিতে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা করার কথা বললেও ভেতরে ভেতরে শুরু থেকেই সশস্ত্র বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছে দলটি, নানা সময় এর তথ্য-প্রমাণও পাওয়া গেছে।

কালের পরিক্রমায় কখনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সমঝোতা, কখনো বা জোট করে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে জামায়াত। ২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে জোট বাঁধার পর ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয় জামায়াতের। আর তারা ক্ষমতায় থাকাকালেই সারাদেশে জামাআতুল মুজাহিদিন-জেএমবির উদ্ভব হয়। জঙ্গি সংগঠনটি যখন উত্তরাঞ্চলে কাজ শুরু করে তখন সে সময়ের সরকার তাদের পৃষ্ঠপোষকতাও দেয় বলে অভিযোগ আছে। এও অভিযোগ আছে যে, জামায়াতের চাপাচাপিতেই বিএনপি শুরুর দিকে জেএমবির প্রতি অনেকটাই নমনীয় ছিল। শুরু থেকেই জেএমবি নানা নৃশংসতা ও আইন অমান্য করে সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। কিন্তু সে সময়ের মন্ত্রী ও জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী সংসদে বলে বসেন, জেএমবি বলতে কিছু নেই, সব মিডিয়ার সৃষ্টি। পরে এই বক্তব্য জামায়াত অস্বীকার করলেও সংবাদ মাধ্যমকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেনি।

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর জামায়াত নানা সময় হম্বিতম্বি করলেও কখনো আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা আর পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগের চেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয় দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন কার্যকলাপ। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে আওয়ামী লীগ আর তাদের ভূমিধস জয়ের পেছনে এটাও একটি কারণ বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এই বিচারকে কেন্দ্র করে জামায়াতের রাজনীতি এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে ফাঁসি হয়েছে দলের দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের। ফাঁসির চূড়ান্ত রায় হয়েছে সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের, দুটি মামলায় ট্রাইব্যুনাল ও বিচারিক আদালতে প্রাণদ- পেয়েছেন আমির মতিউর রহমান নিজামী। একই রায় হয়েছে নির্বাহী কমিটির সদস্য মীর কাসেম আলী, জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির আবদুস সুবহান, এ টি এম আজহারের। আমৃত্যু কারাদ- হয়েছে নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর।

দলের নেতাদের বিচার ঠেকাতে নানা সময় হুমকি-ধামকি দিয়েও কিছুই করতে পারেনি জামায়াত। আদালত এবং রাজপথে মোকাবেলা এই ঘোষণা এসেছে বারবার। কিন্তু আদালতে জামায়াতের আইনজীবীরা বেকায়দায়, দলের প্রধান আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন বিদেশে। এখন প্রধান আইনজীবী হিসেবে ভাড়া করতে হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেনকে। জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব নেতাই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার। বাকি নেতারা সবাই আত্মগোপনে। এই পরিস্থিতি হবে তা কল্পনাতেও ছিল না জামায়াত-শিবিরের কর্মী-সমর্থকদের। ট্রাইব্যুনালে ফাঁসির রায়ের পর সারা দেশে তারা যে নজিরবিহীন সহিংসতা করেছিল এই প্রক্রিয়াতেই দেশে অরাজকতা তৈরি করে নেতাদের বাঁচিয়ে দেওয়া যাবে, এমন বিশ্বাস ছিল তাদের মধ্যে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থান, গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিতে শেষ পর্যন্ত জামায়াতের আশার বেলুন চুপসে গেছে পুরোপুরি।

অবশ্য বছরখানেক আগেও হরতাল-অবরোধে জামায়াত-শিবিরকর্মীদের রাজপথে জ্বালাও-পোড়াও করতে দেখা যেত। মাঝেমধ্যে ঝটিকা মিছিল নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা, যানবাহন ভাঙচুরও চলত রাজপথে। ফাটানো হতো হাতবোমা, ককটেল। এখন প্রকাশ্য কোনো কর্মসূচিতে মিলছে না জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের দেখা। এমনকি দলটির সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মৃত্যু দ-াদেশ প্রায় কার্যকরের পথে থাকলেও সরব হচ্ছে না জামায়াত। আত্মগোপনে থেকে দু-একটি ‘সংবাদ বিজ্ঞপ্তির’ মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে দলীয় কার্যক্রম। প্রশ্ন, এখন কোথায় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা?

তবে তাই বলে দলটি বসে আছে এমন নয়, আপিল বিভাগে মুজাহিদের ফাঁসির রায়ের পর থেকে দেশে নানা নাশকতার ঘটনা ঘটছে। সরকারের দৃঢ় বিশ্বাস এর সবকটির সঙ্গেই জামায়াত জড়িত। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য বলছে, প্রকাশ্যে কর্মসূচি চালাতে না পারলেও ভেতরে ভেতরে ঠিকই সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে জামায়াতে ইসলামী। এমনকি উগ্রবাদী জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গেও তাদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে একাধিকবার। সম্প্রতি দেশে মুক্তচিন্তাশীলদের ওপর যে আঘাত আসছে তার পেছনেও জামায়াত-শিবিরের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টিও সামনে আসছে বারবার। কারণ অতীতেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ও মুক্তমনাদের হত্যার জন্য ‘হিটলিস্ট’ তৈরি করেছিল তারা, যা গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে। এখন হঠাৎ করে লেখক, ব্লগার, প্রকাশক, বিদেশি নাগরিক ও পুলিশের ওপর যে হামলা হচ্ছে তা অতীতের ধারাবাহিকতার অংশ বলেই মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন সদস্যরা বলছেন, আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষণার আগে-পরে হরতাল ডেকে রাজপথে সরব হতো জামায়াত-শিবিরের নেতারা। কিন্তু এখন তাদের শীর্ষ এক নেতার ফাঁসির রায় প্রায় কার্যকরের অপেক্ষায় থাকার পরও কোনো কর্মসূচি তো দূরে থাক টু-শব্দটি করছে না সংগঠনটি। তাদের এই মৌনতা দেখে মনে করা যাবে না যে, তাদের শক্তি ফুরিয়ে এসেছে। বরং এই মৌনতার পেছনে বড় ধরনের কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে। একাত্তরে যখন ঘাতক চক্র প্রায় নিশ্চিত যে, তারা পরাজিত হচ্ছে তখন যেভাবে বুদ্ধিজীবী নিধন করা হলেছিল, হতে পারে একই কায়দায় এখন মুক্তমনাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গোটা দেশের নিরাপত্তাকে বিশ্ব দরবারে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়ে সরকারকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। এসব আশঙ্কা মোটেও উড়িয়ে দিচ্ছেন না মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, জামায়াত-শিবিরের ব্যাপারে সরকারকে আগেই তারা সতর্ক থাকতে বলেছিলেন। কারণ তারা অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ভেতরে ভেতরে শক্তি সঞ্চয় করছে।

জানতে চাইলে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নির্বাহী সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘যেভাবে একের পর এক মুক্তমনাদের হত্যা করা হচ্ছে তা মোটেও ভালো কোনো সংকেত নয়। ঘাতকরা বেশ সংগঠিত মনে হচ্ছে। তা না হলে এভাবে হুমকি দিয়ে মানুষ হত্যার সাহস তারা করত না।’ তিনি বলেন, ‘জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা তো নতুন কিছু নয়। জঙ্গি সংগঠনগুলোর সদস্যরা একসময় শিবির তা না হলে জামায়াত করত, এ ধরনের নজিরও আছে। তাছাড়া জামায়াত আর জঙ্গিদের উদ্দেশ্যও তো ভিন্ন কিছু নয়।’

কদিন আগে রাজধানীর গাবতলীর দারুসসালামে চেকপোস্টে পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক ইব্রাহিম মোল্লার হত্যার সঙ্গেও জামায়াত-শিবিরের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে পুলিশ। এছাড়া গত ৪ নভেম্বর ভোরে সাভারের আশুলিয়ায় পুলিশ সদস্য মুকুল হোসেনকে কুপিয়ে খুন করা হয়েছে, আহত হয়েছেন আরও একজন। এএসআই ইব্রাহিমকে যেভাবে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছিল মুকুলকেও হত্যা করা হয়েছে একই কায়দায়। অতীতেও পুলিশের ওপর হামলা করেছে জামায়াত। হরতাল চলাকালে রাজশাহীতে এক পুলিশ সদস্যকে দিনের আলোতে ইট দিয়ে মাথা থেঁতলে দিয়েছিল তারা। এছাড়া রাজধানীতে বাঁশের লাঠি নিয়ে পুলিশের ওপর হামলে পড়ার ছবিও পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। প্রকাশ্যে কর্মসূচির ঘোষণা না দিলেও একের পর এক পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় অনেকটা স্পষ্ট যে, জামায়াত-শিবির অতীতে যেভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর আঘাত এনে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিল এখনও সেই চেষ্টা চলছে। তবে এবার তারা বেছে নিয়েছে গুপ্তহত্যার পথ।

জানতে চাইলে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘পুলিশের ওপর হামলা করে এই বাহিনীকে দুর্বল করে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। অতীতেও জঙ্গিবাদীগোষ্ঠী এভাবে গুপ্তহত্যা চালিয়েছে। তাদের উদ্দেশ্য সবার কাছেই স্পষ্ট।’ তিনি বলেন, ‘অপরাধীদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। এরই মধ্যে প্রকাশক হত্যা, পুলিশ হত্যাসহ সাম্প্রতিক হত্যাগুলোর সঙ্গে জড়িতদের ব্যাপারে বেশ কিছু তথ্য আমাদের হাতে এসেছে। এর ভিত্তিতে আসামিদের গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার উপ-কমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘পুলিশ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। তবে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ এসব ঘটনায় অপরাধীদের গ্রেপ্তারও করেছে।’

ঢাকার বাইরেও গোপনে জামায়াত

ঢাকার বাইরে কয়েকটি জেলায় বেশ সক্রিয় জামায়াত। এর মধ্যে সাতক্ষীরা, রংপুর, গাইবান্ধা, ঝিনাইদহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুমিল্লা, চট্টগ্রামের সীতাকু-, কক্সবাজার অঞ্চলে জামায়াত-শিবিরের সহিংসতার কথা কারো অজানা নয়। বিগত সময়ে হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিতে সংগঠনটির চালানো ধ্বংসযজ্ঞের ছবি ভুলে যাননি কেউ। গাইবান্ধার পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা, থানায় আগুন দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটিয়েছে জামায়াত। অথচ হঠাৎ করেই পর্দার অন্তরালে চলে গেছে সংগঠনটি। এখন আর এ জেলাগুলোতে জামায়াতের তৎপরতা চোখে পড়ে না। প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচিও নেই তাদের।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াত এখন ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ সংগঠনের মতো আচরণ করছে। তাদের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে ভেবে প্রশান্তিতে ভোগার কিছু নেই। কারণ তারা যে ভেতরে ভেতরে শক্তি সঞ্চয়ের চেষ্টা করছে না, তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দাদের অতি সতর্কতার কারণেই জামায়াত-শিবির মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারছে না। নাশকতার পরিকল্পনা করেও সফল হচ্ছে না। তারা পরিকল্পনা করে এগোনোর আগেই পুলিশ তাদের ধরে ফেলছে।

জামায়াতের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা

জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নতুন কিছু নয়। দেশের আলোচিত দুই জঙ্গি শায়েখ আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাইও জামায়াতের সাবেক সদস্য ছিলেন। ছাত্র অবস্থাতেও তারা ইসলামী ছাত্রসংঘ এবং ছাত্রশিবিরের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তারা জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) সঙ্গে জড়িয়ে সারা দেশে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব জানান দেন। কেবল দুই শীর্ষ নেতারা নন, জামায়াত-শিবিরের সাবেক কর্মীদেরকে ব্যবহার করেই সারা দেশে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল জেএমবি। গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ হওয়ার আগে এ নিয়ে কখনো টু-শব্দটি করেনি স্বাধীনতাবিরোধী এই দলটি। তবে একের পর এক প্রতিবেদন আসার পর সে সময় জামায়াত বিবৃতি দিয়ে জানায়, তাদের আদর্শ ও কর্মপন্থাবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত হওয়ার কারণে জেএমবিতে যোগ দেওয়া এই কর্মীদেরকে আগেই তারা বহিষ্কার করেছিল। তবে কেন এ বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের আগে কিছু বলা হয়নি, সে বিষয়ে সব সময় নীরব ছিলেন দলটির নেতারা।

চট্টগ্রামে জঙ্গি সংগঠন হামজা ব্রিগেডের আস্তানার সন্ধান পাওয়ার পর এর সঙ্গেও শিবিরের সাবেক কর্মীদের যোগসাজশের প্রমাণ মিলেছে। এরই মধ্যে এই সংগঠনের ৪১ জন কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ। সম্প্রতি রাজধানীতে এএসআই ইব্রাহিম হত্যার সঙ্গেও জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মিলেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় মাসুদ রানা নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আইজিপি শহীদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে জানা গেছে হামলাকারীরা দেশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে না এবং উন্নয়নে বিশ্বাস করে না এমন একটি সংগঠনের সদস্য। এ ঘটনায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মাসুদকে জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য এসেছে। তারপরও বিষয়টি তদন্ত করছি। যখন যাচাই-বাছাই হবে তখন পূর্ণাঙ্গভাবে বলা যাবে কারা জড়িত।’

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘মাসুদের তথ্য মতে আমরা কামরাঙ্গীরচরে বিস্ফোরক ও বোমা উদ্ধার করেছি। গাজীপুর থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারের ডিসি মুনতাসিরুল ইসলাম জানান, আটক মাসুদ জামায়াত-শিবিরের সক্রিয় কর্মী বলে জানা গেছে। পলাতক অপরজনও জামায়াতের সক্রিয় কর্মী। তাকে শনাক্তের পর মাসুদকে নিয়ে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত পলাতককে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তদন্তের স্বার্থে এখনই তার নাম প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। ঘটনার সঙ্গে জামায়াত জড়িত বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তি এমনকি নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বরাবর বলে আসছেন, জামায়াতের দুটি ধারা। একটি প্রকাশ্য, যেটি রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে সভা-সমাবেশ, নির্বাচনে অংশ নেয়। আরেকটি গোপন ধারা যারা মূলত দেশে অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা তৈরি করে ঘুরপথে ক্ষমতায় আসতে চায়। এরাই নানা সময় নানা নামে সক্রিয় হয়েছে।

জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেন, ‘জঙ্গিবাদ আর জামায়াত-শিবির আলাদা কিছু নয়। জঙ্গিদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আর জামায়াতের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের মধ্যে তফাত নেই। সবাই আল্লাহর আইন বা হুকুমত চায়। উভয়েই জিহাদের বিশ্বাস করে।’ তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতাবিরোধী চক্র এখনও সক্রিয়। তাদের ভেতর থেকে এখনও পাকিস্তানপ্রীতি যায়নি। যে কারণে তারা বাংলাদেশকেও পাকিস্তানের মতো জঙ্গি রাষ্ট্র বানাতে চাইছে।’

কূলকিনারা হয় না জঙ্গি হামলার

রাজধানীর উত্তরায় ব্লগার আসিফ মহিউদ্দীনের ওপর হামলা হয় ২০১৩ সালের ১৪ জানুয়ারি রাতে। শুরু ওখান থেকে। চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয় আসিফকে। এর এক মাস পর ১৫ ফেব্রুয়ারি মিরপুরে বাসার সামনে একই কায়দায় কুপিয়ে খুন করা হয় ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকে। এ বছর কুপিয়ে খুন করা হয়েছে পাঁচজন ব্লগার, লেখক ও প্রকাশককে। এর মধ্যে আছেন অভিজিৎ রায়, অন্তত বিজয় দাস, ওয়াশিকুর রহমান, নিলাদ্রী নীলয় এবং সর্বশেষ প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আসামিদের শাস্তির মুখোমুখি করা সম্ভব হয়নি একটি ঘটনাতেও। এমনকি আসামি শনাক্তও করা যায়নি। অন্যান্য হত্যার ব্যাপারে পুলিশ ঘটনার কাছেধারে যেতে পারলেও জঙ্গি তথা উগ্রবাদী হামলার পেছনের রহস্য খুঁজে বের করতে পারছে না। এসব হত্যা নিয়ে আঁধারেই থেকে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। জঙ্গিদের অবস্থান শনাক্ত এবং তাদের দমনের জন্য পুলিশের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও বলছেন একই কথা। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেন, জঙ্গিবাদ দমনে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সেল থাকলেও বিশেষায়িত কোনো ইউনিট এখনও গড়ে তুলতে পারেনি পুলিশ। মূলত গোয়েন্দা পুলিশই জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করে। সাধারণ পুলিশ সদস্যদের এ বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ নেই। যে কারণে জঙ্গিদের সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। র‌্যাবের তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠার পরের ১১ বছরে র‌্যাব ১ হাজার ১৬৫ জন জঙ্গিনেতা ও সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে, যার মধ্যে ৬০৩ জনই জেএমবির সদস্য। তবে বিশেষায়িত এই বাহিনী বলছে, মন ও মগজ থেকে জঙ্গিবাদ দূর করতে না পারলে জঙ্গি দমন কঠিন হয়ে পড়বে। তারা এখন এই দিকটায় গুরুত্ব বেশি দিচ্ছেন।

মুজাহিদের ফাঁসির চূড়ান্ত রায় ঘিরে নাশকতার ছক

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এখন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর দুজন কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামানের ফাঁসি হয়েছে। ফাঁসির আদেশ হয়েছে দলটির আমির মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধেও। এর মধ্যে আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসির চূড়ান্ত রায়ের বিপরীতে আসামিপক্ষের পুনর্বিবেচনার আবেদন শুনানির অপেক্ষায় আছে। আগে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের রায় ঘোষণার আগে-পরে হরতাল কর্মসূচিসহ রাজপথে জ্বালাও-পোড়াও করতে দেখা যেত জামায়াতকে। কিন্তু এখন কেবল একদিনের ‘বিক্ষোভের’ মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাজনৈতিক কর্মসূচি।

তবে দলের শীর্ষ নেতার ফাঁসির রায় ঘিরে ব্যাপক নাশকতার ছক এঁকেছে জামায়াত। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, নাশকতার ছক নিয়ে তলে তলে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে জামায়াত। নভেম্বর মাস ঘিরে নাশকতার ছক কষছে জামায়াত-শিবির। রাজধানীকেন্দ্রিক বেশ কয়েকটি নাশকতামূলক ঘটনার পরিকল্পনার খবর পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। শিবির নেতাকর্মীরা ঢাকা, ঢাকার উপকণ্ঠ এবং বগুড়ায় বসে এ পরিকল্পনা করে।

গাবতলীতে তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) ইব্রাহিম মোল্লাকে হত্যার পর হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা মাসুদ রানা পুলিশকে জানিয়েছেন, বগুড়ার আদমদীঘি জামায়াতের আমিরের নেতৃত্বে একটি পরিকল্পনা হয়েছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য উপজেলা শিবিরের সভাপতি এনামুল হকের নেতৃত্বে কিছু বিস্ফোরক ও অস্ত্র নিয়ে তারা ঢাকায় আসে। গাবতলীতে এসে তল্লাশি চৌকিতে ধরা পড়ার কারণেই খুন করা হয় এএসআই ইব্রাহিমকে। এনামুলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দুটি স্থানে অভিযান চালিয়ে পাঁচটি বোমাসহ জামায়াত-শিবিরের কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ‘ইব্রাহিম হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে আমরা জামায়াত-শিবিরের নাশকতার পরিকল্পনার ব্যাপারে তথ্য পেয়েছি। ফলে হোসেনি দালানের ঘটনার সঙ্গে এর যোগসূত্র থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। পূর্বাপর ঘটনা বিশ্লেষণ করে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি নাশকতা চালাতে পারে এমন অনেক তথ্যই আমাদের কাছে রয়েছে।’

এই ঘটনার পর ৪ নভেম্বর আশুলিয়ায় একই কায়দায় খুন হন পুলিশ সদস্য মুকুল হোসেন। হামলাকারীরা দুটি মোটরসাইকেলে করে এসে কিছু বুঝে উঠার আগেই অতর্কিত কোপায় তিনজনকে। এরপর গুলি করতে করতে পালিয়ে যায় তারা। কারা এই হামলা করেছে তা খুঁজে বের করতে শুরু হয়েছে তদন্ত। তবে ইব্রাহিম ও মুকুলের ওপর হামলার ধরন দেখে এর সঙ্গেও জামায়াত-শিবির জড়িত কি না সে প্রশ্ন উঠেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এরই মধ্যে বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় কার্যকর ঠেকাতে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র পরিকল্পিতভাবে এই হামলা করেছে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় মুজাহিদের ফাঁসির সাজা বহাল রেখে আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর ১৪ দিনের মাথায় ওই রায় পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করা হয়। আগামী ২ নভেম্বর এই আবেদনের শুনানির তারিখ ধার্য রয়েছে। রিভিউতে যদি ফাঁসির আদেশ বহাল থাকে তাহলে বাকি থাকবে কেবল রাষ্ট্রপতির ক্ষমা। সেটি হবে মুজাহিদের আইনগত প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ধাপ।

কেবল নেতারা নয়, বিচার হবে জামায়াতেরও

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের দায়ে জার্মানিতে বিচার হয়েছে হিটলারের রাজনৈতিক দল নাৎসি পার্টিরও। দলটি নিষিদ্ধের পাশাপাশি তাদের প্রতীক বা স্লোগান ব্যবহার এখনও দ-নীয় অপরাধ। বাংলাদেশেও যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে সক্রিয় সামাজিক-রাজনৈতিক কর্মীরা বলে আসছেন বাংলাদেশেও কেন এমনটা হবে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একাধিক রায়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের মানবতাবিরোধী অপরাধের নানা কর্মকা- উঠে এসেছে। ট্রাইব্যুনাল দলটিকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীও বলেছে। রায়ের পর্যবেক্ষণে এই দলটির সঙ্গে সম্পর্ক না রাখতে সামাজিক-রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে অনুরোধও করা হয়েছে।

একাধিক রায়ে একই পর্যবেক্ষণ আসার পর সরকার দল হিসেবে জামায়াতের বিচারের উদ্যোগও নেয়। এরই মধ্যে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত শেষ করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে সংগঠনের বিচারে শাস্তির কথা বলা নেই, এমন যুক্তিতে এখনও এই বিচার শুরু করেনি সরকার। এ জন্য ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। মন্ত্রী বলেন, আইনের বর্তমান বিধান অনুযায়ী অপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিরুদ্ধে মামলা করা আপাতত সম্ভব নয়। কারণ এ ক্ষেত্রে অপরাধী সংগঠনের শাস্তির বিধান নেই। আবার ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের বিরুদ্ধে মামলা হলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে জামায়াতের নিবন্ধনের মামলায় তার প্রভাব পড়তে পারে। তৃতীয়ত, অন্যান্য আইনে অপরাধী সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের শাস্তির বিধান রয়েছে। ইতিমধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত জামায়াত নেতাদের অপরাধী সংগঠন চালানোর দায়ে আবার সাজা দেওয়া হলে তা আগের সাজার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে কি না, সেটাও বিবেচনা করতে হবে।

তবে আইনমন্ত্রীর এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত নন সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ। তিনি বলেন, বর্তমান আইনেই বলা আছে, অপরাধীর যেকোনো সাজা দিতে পারবে ট্রাইব্যুনাল। তিনি বলেন, ‘জামায়াতের বিচার ও শাস্তি দেওয়া যায় কি না, এটা বলার সম্পূর্ণ এখতিয়ার ট্রাইব্যুনালের। রাষ্ট্রপক্ষ তথ্য-উপাত্ত বা প্রমাণপত্র দিলে ট্রাইব্যুনালই সিদ্ধান্ত নেবে বিচার করা যায় কি না বা করা গেলে কীভাবে করা যায়। এরপর জামায়াত অপরাধী প্রমাণিত হলে সংগঠনকে শাস্তির বিষয়েও ট্রাইব্যুনালের স্বাধীনতা দেওয়া আছে।

২০১৪ সালে জাতীয় সংসদে ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধনের মাধ্যমে ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠনেরও বিচারের বিধান যোগ করা হয়। সে সময় সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেছিলেন, এই সংশোধনীর কারণে মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার, আলবদর, আলশামস, রাজাকার বাহিনীর বিচার করা যাবে। যদি তদন্তে তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায় যে, জামায়াতে ইসলামীও হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে, তবে এই সংগঠনও শাস্তি পাবে।

ইতিহাসবিদ এবং আইনজ্ঞরা মনে করেন, জামায়াতের বিরুদ্ধে এসব তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন কোনো ব্যাপারই নয়। কারণ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর উন্মত্ত হামলার পরপর জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। আক্রমণকারী বাহিনীর সঙ্গে জামায়াতের বৈঠকের ছবি বা গণমাধ্যমে প্রকাশিক সংবাদ এ ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে দেখানো যাবে। পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের সে সময়ের আমির গোলাম আযমের বইয়েও এসব কথা উঠে এসেছে। দখলদার বাহিনীকে সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়ে সে সময় রেডিওতে তিনি ভাষণ দিয়েছিলেন জামায়াতের নেতা হিসেবেই। এর পাশাপাশি শান্তি কমিটি, রাজাকার বাহিনী গঠনেও জামায়াতের পরামর্শ বা সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল সর্বজনবিদিত।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষে লড়াই এবং গ্রামগঞ্জে মুক্তিকামীদের দমনে জামায়াত নেতা এ কে এম ইউসুফের (মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলাকালে সম্প্রতি মারা যান তিনি) নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের মে মাসে খুলনায় প্রথম রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়। শান্তি কমিটিতেও সে সময় জামায়াত এবং মুসলিম লীগ নেতাদের একাধিপত্য ছিল। কারা পাকিস্তানি বাহিনীর বেশি কাছে যাবে এ নিয়ে দুই দলের মধ্যে দ্বন্দ্বও তৈরি হয়। কেবল জামায়াত নয়, দলটির সে সময়ের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘও একই কায়দায় মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি খুনি বাহিনী গড়ে তুলেছিল, যার নাম আলবদর। মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে বুদ্ধিজীবী হত্যায় এই বাহিনীই জড়িত ছিল বলে অভিযোগ আছে। ইসলামী ছাত্রসংঘের সে সময়ের দুই শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন। আর বুদ্ধিজীবী হত্যায় ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’র দায়েই মুজাহিদের ফাঁসির দ- দিয়েছে আপিল বিভাগ।

জানতে চাইলে ইতিহাসবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন এই সময়কে বলেন, ‘তথ্য-প্রমাণের অভাবে সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিচার আটকে থাকবে না। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নথিপত্রে তো এসব প্রমাণ আছেই। ওই সময় পত্র-পত্রিকায় ছাপা হওয়া ছবি ও খবর তো আছে।’ তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক যে, অনেক তথ্য-প্রমাণ দুর্লভ হয়ে গেছে। তবে যেটুকু আছে, তা জামায়াতের বিচার করার জন্য যথেষ্ট।’

গোয়েন্দা নজরদারিতে জামায়াত-শিবিরের কয়েক শ প্রতিষ্ঠান

নাশকতার ছক কষা হয় জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানে বসে এমন তথ্যের ভিত্তিতে ৫৬১টি প্রতিষ্ঠান গোয়েন্দা নজরদারিতে আনা হয়েছে। এর মধ্যে আছে আর্থিক, সেবামূলক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমিতি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, সারা দেশের জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে এসব ঘটনার পরিকল্পনা ও সরকারবিরোধী বিভিন্ন অপপ্রচার ছড়ানো হয় বলে গোয়েন্দা সংস্থা থেকে পাওয়া প্রতিবেদনের আলোকে ৫৬১টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। ২৯ অক্টোবর জারি করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব ও সচিবদের কাছে পাঠানো আদেশে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

নজরদারির আওতায় আনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, ইসলামী ব্যাংক মেডিকেল কলেজ, মনোরমা, রেনেসাঁ, ইসলামী ব্যাংক ক্রাফট অ্যান্ড ফ্যাশন, ইসলামী ব্যাংক ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, ইসলামী ব্যাংক ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ইসলামী ব্যাংক ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড ডিজ্যাবল রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার, রেটিনা, ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল, ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড ইমেজিং সেন্টার, কোরাল রিফ, মিশন ডেভেলপারস, কেয়ারি, ইনটিমেট হাউজিং, সোনারগাঁও হাউজিং, কেয়ারি গ্রুপ, কেয়ারি প্লাজা, কেয়ারি ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, বিডি ফুড, ইয়ূথ গ্রুপ, মিশন গ্রুপ, আল-হামরা শপিং সেন্টার, ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, ইসলামী ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড, ইসলামী ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, তাকাফুল ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স, অনাবিল, সৌদিয়া, আবাবিল, ছালছাবিল, ফুয়াদ আল খতিব মেডিকেল ট্রাস্ট, সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী, সিএনসি, ফুলকুঁড়ি, স্পন্দন, ফোকাস, কংক্রিট, কনসেপ্ট, অ্যাক্সিলেন্ট, ওমেকা, অপটিমামসহ ৫৬১ প্রতিষ্ঠানের নাম। – সাপ্তাহিক এই সময়-এর সৌজন্যে

মতামত