টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

আত্মসমর্পনঃ স্বাভাবিক জীবনে ফিরলো এমএনডিপি

এস.এম ইসমাইল হাসান
আলীকদম (বান্দরবান) প্রতিনিধি

Alikadam-MNDP-news-pc-2চট্টগ্রাম, ০৫  নভেম্বর (সিটিজি টাইমস):: দীর্ঘ জল্পনা কল্পনা আর আলাপ আলোচানার পর অবশেষে অস্ত্রসহ আত্মসমর্পন করলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত পাহাড়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন ম্রো ন্যাশনাল ডিফেন্স পার্টি (এমএনডিপি)’র ৭৯ সদস্য।

আজ বেলা ১২ টায় বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার কুরুপ পাতা আর্মি ক্যাম্প সংলগ্ন মাতামুহুরী নদীর তীরে জমকালে এক অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আলীকদম সেনা জোন ও বান্দরবান রিজিয়নের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়।

এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের প্রতি মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ও চট্টগ্রাম এরিয়া কমান্ডার মেজন জেনারেল শফিকুর রহমান, বান্দরবান এর রিজিয়ন কমান্ডার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল নকিব আহামেদ চৌধুরী, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যাশৈহ্লা মার্মা, ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক আবু জাফর, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান, আলীকদম জোনের জোন কমান্ডার লেঃ কর্ণেল মিজানুর রহমান, আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল-আমিন, ভারপ্রাপ্ত উপজেলা চেয়ারম্যান কাইনথপ ম্রো , উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান শিরিনা আক্তার রোকসানা, আলীকদম থানার অফিসার্স ইনচার্জ অপ্পেলা নাহা রাজু প্রমূখ।

এর আগে গত ০৪ নভেম্বর ম্রো ন্যাশনাল পাটির ৭৯ সদস্য আলীকদম সেনা জোনের সাব জোন কুরুপ পাতা আর্মি ক্যাম্পে ৫৫টি দেশীয় তৈরী বিভিন্ন প্রকারের অস্ত্র গোলাবারুদ ও পোষাক সহ বিভিন্ন প্রকার নিত্য ব্যবহায্য সরঞ্জামাদি জমা দেন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই আত্মসমর্পনকারীদেরকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেয়া হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর বলেন, আজ যারা সামাজিকিবরণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে আমরা তাদেরকে জেলা পরিষদের মাধ্যমে যোগ্যতানুষারে চাকুরী এবং বিভিন্ন পেশা ও সামাজিক বনায়নের জন্য জমি ও আর্থিক সহয়তা দিয়ে তাদেরকে পূনর্বসিক করবো। যার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা এসব যুবকদের বেকারত্ব দুর হবে এবং তারা সমাজে স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন করতে পারবে। এছাড়াও পিছিয়ে পড়া ম্রো  জনগোষ্ঠীকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য সরকারে পাশাপাশি সমাজের বিত্তশালীদেরকেও সার্বিক সহযোগীত করার আহবান জানান।

১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর ১৮ বছর অতিবাহিত হতে না হতেই অনুষ্ঠিত হল আর একটি অস্ত্রসহ আত্মসমর্পনের ঘটনা। এমএনডিপি মেনরুম গ্রুপের কমান্ডার মেনরুর ম্রো  এর ভাষ্যমতে ২০০৯ সালে এমএনডিপি’র কার্যক্রম শুরু হলেও ২০১১ সালের ১৭ ডিসেম্বর বান্দরবান জেলার থানচি উপজেলা থেকে তিনজন কারবারী সহ ১৫ জন উপজাতীকের অপহরণের ঘটনার মধ্য দিয়েই এমএনডিপি’র আত্ম প্রকাশ ঘটে। এরপর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সদস্য সংগ্রহ করে তাদের সশস্ত্র তৎপরতা সম্পর্কে জানান দেয়। সেই থেকে আলীকদমের পোয়া মুহুরীতে ঘাঁটি গেড়ে খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ড শুরু করে সন্ত্রাসী গ্রুপটি। এর পাঁচ বছর অতিবাহিত হতে না হতেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আলীকদম সেনা জোন ও বান্দরবান রিজিয়নের অন্তরিক প্রচেষ্ঠায় অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলো এদলটির ৭৯ সদস্য।

অনুষ্ঠিত এমএনডিপি’র আত্মসমর্পণকে কেন্দ্র করে আলীকদম-থানচি উপজেলার ম্রো  জনগোষ্ঠী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মনে বইছে প্রশান্তির হাওয়া। এদুটি উপজলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় জুমিয় কাঁচা মাল, আদা, হলুদ, বাঁশ, বেত ছাড়াও বিভিন্ন কাঠ ব্যবসায়ীরা ফেলছে স্বস্তীর নিঃশ্বাস। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ১২ টি জাতীসত্বার মধ্যে পিচিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ম্রো  সম্প্রদায়। ২০১০ সালের শেষের দিকে ম্রো  সম্প্রদায়ের উগ্রগামী কতিপয় যুবকদের নিয়ে ম্রো  ন্যাশনাল পার্টি (এমএনডিপি) কর্মকান্ড শুরু করার পর থেকে জান মালের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে আসছে এতদাঞ্চলের বসবাসরত ব্যবসায়ী ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠী।

জানা গেছে, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সৃজিত কাপ্তাই বাঁদ নির্মানকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রামে মাথা চাঁড়াদিয়ে উঠা শান্তি বাহিনী নির্মুলের লক্ষে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ ১৯৮৪ সালের শেষের দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীকে সহযোগীতা করার জন্য ম্রো  যুবকদের সমন্ময়ে গড়ে তোলেন হিল আনচার ও হিল ভিডিপি (ম্রো  বাহিনী)। তখন থেকেই শান্তি বাহিনী তথা শান্তির পক্ষে শুরু হয় মুরুং ও সেনাবাহিনীর যৌথ কার্যক্রম। সেনাবাহিনী ও মুরুংদের সৌহার্দ্দপূর্ণ এই সম্পর্কের মাঝেও বিপথগামী কতিপয় ¤্রাে যুবক গড়ে তোলে এ দলটি। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর একের পর এক অভিযানে কোণঠাসা হয়ে পড়ে এমএনডিপির কর্মকান্ড। তাছাড়া দলীয় কোন্দলের কারণে পর পর পাল্টা অভিযানে উভয় পক্ষের বেশ কিছু সদস্য হতাহতের পর গ্রুপটির কর্মকান্ড অনেকটা নেতিয়ে পড়েছে। তাই তারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আগ্রহ প্রকাশ করলে নিরাপত্তা বাহিনী ও ম্রো  আদিবাসী জনপ্রতিনিধিরা এই উদ্দ্যোগ নেন। জেলার থানচি ও আলীকদম উপজেলার সদস্যরাই সবচেয়ে বেশি আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্র থেকে জানা যায়, ২০১২ সালের এমএনডিপি প্রধান মেনচিং ম্রো  গ্রেফতার হওয়ার পর উপজেলার ১নং আলীকদম ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার পালে ম্রো এই গ্রুপটির পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। একই বছরের ৫ এপ্রিল প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হয় এই গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মেনরুং ম্রো । অপরদিকে ওই বছরের ৭ জুন সংগঠনটিকে দমন করে অবৈধ কর্মকান্ড থেকে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে সংগঠনের উগ্রপন্থীদের রোশানলে পড়ে আলীকদমের দুর্গম পোয়ামুহুরি এলাকার পাহাড় ভাঙা গ্রামে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হয় পালে ম্রো । পরবর্তীতে গ্রুপটির ক্ষমতার লড়াইয়ে মেতে উঠে দুই নেতা লোহব ম্রো  এবং মেনরুং ম্রো । কেউই হার স্বীকার করতে রাজি না হওয়াতে গ্রুপটি বিভক্ত হয়ে যায় দুটি গ্রুপে। লোহব গ্রুপ এবং মেনরুং গ্রুপ। দীর্ঘদিন এই দুই গ্রুপের মধ্যে বিরাজমান বিবাদ নিরষণ না হওয়াতে পারষ্পারিক সংঘর্ষে হতাহত হয় অনেকেই।

আত্মসমর্পণকারী মেনরুম গ্রুপের কমান্ডার মেনরুং ম্রো  এর কাছে তা অনুভুতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা দীর্ঘদিন বনে জঙ্গলে কাটিয়েছি। আজ আমরা খুশি। আমার বিশ্বাস আমরা প্রশাসনের এটুকু সহযোগীতা পেলে আর দশ জনের মত সমাজে ভালোভাবে বাাঁচতে পারবো। অন্যদিকে লোহব গ্রুপ এর কমান্ডার লোহব ম্রো  ও বললেন একই কথা। তিনিও সমাজে ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য প্রত্যয় ব্যাক্ত করেন।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত