টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

জাহাজ ভাসা উৎসবে আনন্দের মেলা

Ramu Pic_1

ইমাম খাইর, কক্সবাজার ব্যুরো
রামুর বাঁকখালী নদীতে ঐতিহ্যবাহী প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে জাহাজ ভাসা উৎসবে নেমেছিল মানুষের ঢল। বসেছিল সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলা। উৎসবে বৌদ্ধদের মাঝে সীমাবদ্ধ না থেকে পরিণত হয়েছিল বাঙালির প্রাণের উৎসবে।
এ উপলক্ষে বৃহষ্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বাঁকখালী নদী তীরে রামু কেন্দ্রীয় জাহাজ ভাসা উৎসব উদযাপন পরিষদ আলোচনা সভার আয়োজন করে।
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন রামু-কক্সবাজার সদর আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব সাইমুম সরওয়ার কমল।
উদযাপন পরিষদের সভাপতি সুমত বড়ুয়ার সভাপতিত্বে এ অনুষ্টানে স্থানীয় এমপি সাইমুম সরওয়ার কমল প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজশাহী-৩ আসনের এমপি মোঃ আইনুদ্দিন ও প্রধান আলোচক ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক জুলফিকার আলী মানিক। অন্যান্যদের মধ্যে রামু উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম, রামু থানার ওসি আবদুল মজিদ, অর্পণ বড়ুয়া, তরুন বড়ুয়া, মুসরাত জাহান মুন্নি, দুলাল বড়ুয়া ও ফরিদুল আলম প্রমুখ।
বৌদ্ধ সম্প্রদায় সুত্রে জানা গেছে, এখন থেকে ২০০ বছর আগে মিয়ানমারে মুরহন ঘা নামক স্থানে একটি নদীতে মংরাজ ম্রাজংব্রান প্রথম এ উৎসবের আয়োজন করে। বাংলাদেশের একুশে পদক প্রাপ্ত প্রবীণ বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং রামু সীমা বিহারের অধ্যক্ষ পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের এ প্রসঙ্গে জানান, ‘রামুতে এ উৎসবের প্রচলন হয় মূলত মিয়ানমার থেকে। মিয়ানমারেই প্রথম এ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। সেখান থেকেই বৌদ্ধরা রামুতে এ উৎসবের যাত্রা শুরু করে।’ তিনি আরো জানান, বাংলাদেশের মধ্যে কক্সবাজারে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বসবাসের আধিক্য বেশী। তাই প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের বৌদ্ধদের সাথে এখানকার বৌদ্ধদের বেশী মিল রয়েছে। এমনকি মিয়ানমারের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং কৃষ্টির সাথেও এখানকার বৌদ্ধদের ব্যাপক মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
রামুর বাঁকখালী নদীতে কয়েকটি নৌকা এক সাথে করে তার উপরই বসানো হয় বাঁশ, কাঠ, বেত, ও রঙ্গিন কাগজের কারুকার্যে তৈরী জাহাজগুলো। দৃষ্টি নন্দন এবং অপূর্ব কারুকার্যের এসব জাহাজ তৈরীতে পংখীরাজ, হাঁস, ময়ূরসহ বিভিন্ন প্রাণী ও মূর্তির প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তোলা হয়। এ কারনেই মানুষের দৃষ্টি কাড়ে বেশী। নদীতে ভাসানো প্রতিটি জাহাজে মাইক লাগানো থাকে। সেই মাইকে ক্যাসেট প্লেয়ার বাজানো হয়। সেই সাথে ঢোল, কাঁসর, মন্দিরা সহ নানা বাদ্যের তালে তালে শিশু কিশোর ও যুবকরা নেচে গেয়ে মেতে উঠে বাঁকখালী নদী তীরের সে এক অন্যরকমের আনন্দ উৎসবে।
বাঁকখালী নদীর এ আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানে এ সময় নেচে গেয়ে এবং জাহাজের মাইকে চলে বৌদ্ধ কীর্তন, নাচ, গানসহ নানা আনন্দায়োজন। প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী এ আনন্দে অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকজনও মেতে উঠে । জাহাজ ভাসানো উৎসবের এ রকম চিত্র উপভোগ করতে নদীর দুই তীর জুড়ে হাজার হাজার লোক সমবেত হয়। উৎসব আয়োজন কমিটির উপদেষ্টা নিতীশ বড়ুয়া জানান-বাঁকখালী নদী ক্রমশ ভরাট হয়ে গেছে। উজানের পাহাড়ি ঢলের সাথে মাটি গড়িয়ে এসে নদী নাব্যতা হারিয়েছে। তাই এবার নদীতে পানির প্রবাহ কমে গেছে। একারণে জাহাজ ভাসানোয় কিছুটা বিঘ্ন ঘটে।
বিশিষ্ট লেখক ও রামু সীমা বিহারের সহকারি পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু জানান- ‘প্রতি বছর প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে তিন দিন ব্যাপি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বাঁকখালী নদীতে জাহাজ ভাসানোর মাধ্যমে এ অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।’
উৎসব আয়োজক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অর্পণ বড়ুয়া জানান, টানা ৩ মাস ব্যাপী বাঁশ, বেত ও কাগজের জাহাজ বানিয়ে থাকেন আয়োজকরা। এ জন্য অনেক টাকা-পয়সাও খরচ হয়। আয়োজকরাই ঘরে ঘরে গিয়ে উৎসবের টাকা তুলে আনেন। তিনি জানান, বাঁকখালী নদীতে বহু বছর ধরেই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ঐতিহ্যবাহী জাহাজ ভাসানো উৎসবটি যুগ যুগ ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উজ্জল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। সেই সাথে নানা ধর্ম ও বর্ণের লোকের কাছে এ উৎসব প্রতি বছর নিয়ে আসে নির্মল আনন্দ।

মতামত