টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

দুই কোটি টাকা নিয়ে পালিয়েছে আরডিপি

RDP-Cox_1ইমাম খাইর, কক্সবাজার ব্যুরো:
চারশতাধিক গ্রাহকের প্রায় দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে কক্সবাজার থেকে পালিয়েছে আরডিপি ফিন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট এমসিএস লি.। গত ১৮ মাস ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে কক্সবাজার শহরের কালুরদোকান এলাকার শেখ মঞ্জিলে ভাড়া নেয়া কোম্পানীর অফিস। তাদের কারণে অনেকের সংসারে আগুন ধরেছে। টাকা ফেরত না পাওয়ার চিন্তায় মারা গেছে এক দিনমজুর গ্রাহক। ইতিমধ্যে আরডিপির ঢাকা অফিসে যোগাযোগ করেও কূল কিনারা পায়নি গ্রাহকরা। মোবাইল নাম্বার বন্ধ করে আত্নগোপনে চলে গেছে কোম্পানীটির সকল পর্যায়ের কর্মকর্তারা। তবে প্রতারক কোম্পানীর সাথে শেখ মঞ্জিলের মালিক ইউনুছ হাজীর গোপন আঁতাত আছে বলে বেশ কয়েকটি সুত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এ দিকে গত ২১ অক্টোবর বুধবার রাতের আঁধারে আরডিপি অফিসের মালামাল হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। অফিসের ভেতর ছেঁড়াফাঁড়া কাগজ ছাড়া কোন মালামালই নেই। এ খবর গ্রাহকরা পেয়ে অফিস প্রাঙ্গনে ভিড় করে। গভীর রাত পর্যন্ত ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করে সেখানে। পরে ওই রাতেই কোম্পানীর চেয়ারম্যান এম. ইব্রাহিম খলিল ও ভবন মালিক ইউনুছ হাজীর বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেছে প্রতারিত গ্রাহকরা।

চিত্র-১
২১ অক্টোবর বুধবার, রাত ১১টা পার হয়েছে। পত্রিকা অফিস থেকে বের হয়ে বাসায় যাচ্ছি। ঠিক ওই সময় একটি ফোন আসে। রিসিভ করা মাত্রই ওপার থেকে আওয়াজ দেওয়া হয় ‘সাংবাদিক ভাই একটু তাড়াতাড়ি আসেন। আমরা নিঃস্ব। আমাদের সব কিছু নিয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি আসেন ভাই। একটু দেখে যান… ইত্যাদি।’

কি নিয়ে যাচ্ছে? এমন প্রশ্নের উত্তরে ওই ব্যক্তি জবাবে বলেন, আমরা আরিডিপি’র গ্রাহক। তাদের কাছে আমাদের অনেক টাকা জমা আছে। কোম্পানীর অফিস অনেক দিন তালা মারা। সংশ্লিষ্ট কারোর খোঁজ-খবর নেই। কিন্তু আজকে (২১ অক্টোবর) হঠাৎ রাতের আঁধারে ভবনের মালিক ইউনুছ হাজী অফিসের তালা খোলে সব মালামাল নিয়ে গেছে। খবর পেয়ে আমরা হাজির হয়েছি।’

চিত্র-২
বাসায় তখন আর যাওয়া হলনা। একজন সংবাদকর্মীর দায়িত্ব হিসাবে ছুটে গেলাম ঘটনাস্থলে। ঠিক সত্যতা পেলাম খবরের। কিছু ছেঁড়াফাঁড়া কাগজ ছাড়া আরডিপি’র অফিসে কোন মালামাল নেই। সব ওধাও। পরে খোঁজ করে দেখি, মালামালগুলো ভবনের মালিক ইউনুছ হাজী সরিয়ে ফেলেছেন। পাঁচতলার একটি কক্ষে সব মালামাল তালাবদ্ধ করে মালিক লাপাত্তা। ফোনও ধরেনা। ইতিমধ্যে কক্সবাজার সদর থানার একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। তারও চেষ্টা করে জমিদারের হদিস পাননি। পুলিশের ফোনও ধরেননি ইউনুছ হাজী। এখন প্রশ্ন, তাহলে কি আরডিপি’র প্রতারকদের কাতারে চলে গেলেন জমিদারও!

‘শেখ মঞ্জিলে’ ঢুকার পথ থেকে তিনতলা পর্যন্ত শত শত মানুষ। রাতের বেলায় বিক্ষোভ-প্রতিবাদে উত্তাল পুরো কালুর দোকান এলাকা। সংবাদকর্মী পরিচয় পেয়ে সবাই ক্ষোভ আর আবেগঘন ভাষায় ব্যক্ত করছে তাদের কথা।

জানতে চাইলাম কেন তারা বিক্ষোভ করছে। ফউজুল কবির নামে এক গ্রাহক বলেন, লোভ দেখিয়ে কক্সবাজারের চারশতাধিক মানুষের ২ কোটিরও বেশী টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে আরডিপি। আমি ব্যক্তিগতভাবে ৮ লাখ টাকা আমানত রেখেছি। দু’পয়সা পাওয়ার আশায় সহায় সম্বল যা ছিল সব তাদের কাছে জমা রেখেছিলাম। এখন নিঃস্ব। আমার চোখে শুধুই অন্ধকার। আমার মতো আরো অনেকে পথে বসেছে।

তিনি বলেন, আমরা প্রতরকদের ছাড় দেবনা। কোম্পানীর কোথায় কি আছে সব খোঁজে বের করব। ইতিমধ্যে আমরা কোম্পানীর অনেক তথ্য পেয়েছি। আইনের আশ্রয় নিয়ে যা যা করার সবই করব।

বিক্ষোভকারী গ্রাহকদের খোঁজ নিলাম। তাদের মধ্যে আরো কয়েকজনের সাথে কথা হয়। সেখানে জসিম উদ্দিন সাড়ে ৯ লাখ, জাফর আলম, ৩ লাখ, ডা. শামসুল আলম ৩ লাখ, আব্দুল হালিম আড়াই লাখ, জিয়াউর রহমান, ৩ লাখ, মাওলানা শহিদুল ইসলাম আড়াই লাখ, তপন বাবু ২ লাখ, ধীমান বড়ুয়া ১ লাখ, মাওলানা ইসমাঈল দেড় লাখ, আবুল কালাম ১ লাখ, মোবারক আহমদ ১৫ হজার টাকা আরডিপির কাছে জমা করেছেন। একইভাবে শফিউল আজম, আলমগীর, মহিউদ্দিন, মকসুদ, শাহজাহান হাফেজ ইমরানসহ আরো চারশতাধিক গ্রাহক প্রতারনার শিকার।

ক্ষতিগ্রস্থদের অভিযোগ, পার্শ্ববর্তি ফেমাস স্টিলের পরিচালক খলিল ও ভবনের মালিক ইউনুছ হাজীর সাথে কোম্পানীর সম্পর্ক রয়েছে। এরা দুইজন মিলে রাতের অন্ধকারে মালামাল সরিয়ে নেয়ার দুঃসাহস করেছেন।

ক্ষতিগ্রস্থ গ্রাহক জিয়াউর রহমান জানান, কষ্টে কামাই করা টাকা আমরা বিশ্বাস করে তাদের কাছে জমা করেছিলাম। তারাও আমাদের অনেক লাভের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। তারা বিশ্বাস ভঙ করেছে। আমাদের টাকা হাতিয়ে নিয়ে তারা পালিয়ে গিয়েছে। আমাদের টাকা ফেরত পেতে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা চাই।

অনুসন্ধান করে জানা গেছে, আরডিপি ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট (এমসিএস) এর নামে ইনানীতে ৩ কানি রেজিস্ট্রার্ড জমি, বায়নানামামূলে ৫ কানি জমিসহ জেলায় অন্তত ২০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। এছাড়াও কক্সবাজার শহরের কলাতলীর ‘হোটেল সী-টাস’ এর মালিক আরডিপি।

এগুলো আইনী প্রক্রিয়ায় জব্দ করা গেলে গ্রাহকরা তাদের টাকাগুলো ফেরত পাবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলের সতর্ক হওয়া দরকার বলে মনে করছেন সচেতনমহল।

মতামত