টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মিরসরাইয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটছে সিএনজি-অটোরিক্সা চালকদের

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই  প্রতিনিধি

cngচট্টগ্রাম, ১৮  অক্টোবর (সিটিজি টাইমস):  সিএনজি চালক মোহাম্মদ করিম। দীর্ঘদিন ধরে সিএনজি অটোরিক্সা চালিয়ে ৫ সদস্যের সংসার চলছে তার। নিজের কোন বাড়ি-ভিটা না থাকায় অন্যের জায়গায় বসবাস করেন। সিএনজি চালিয়ে যা আয় করেন তা দিয়ে সংসার চলার পাশাপাশি ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখাও চলছে ভালো। কিন্ত মহাসড়কে সিএনজি অটোরিক্সা বন্ধ হওয়ায় গত দুই মাস ধরে মানবেতর জীবন কাটছে তার। গত দুই মাসে বিভিন্ন জায়গায় কাজের সন্ধান করে খোঁজ না পেয়ে হতাশ তিনি। শনিবার (১৭ অক্টোবর ) রাতে কথা হয় তার সাথে। করিম বলেন, গত কয়েকদিন ধরে চুলায় আগুন জ্বলছেনা। না খেয়ে রয়েছে ছেলে-মেয়েরা। এখন কি করবো বুঝতে পারছিনা। দুচোখে শুধু অন্ধকার দেখছি।

ছোটন নাথ তার শেষ সম্বল জায়গা বিক্রি করে দুটি সিএনজি ক্রয় করেন। সিএনজি আয় দিয়ে তার সংসার ভালোই চলছিলো। বিগত দুই মাস ধরে সিএনজি বন্ধ থাকায় থাকেও অনাহারে-অর্ধহারে থাকতে হচ্ছে। সিএনজি বিক্রি করতে চাইলেও কেউ কিনছেনা। শুধু সিএনজি চালক করিম কিংবা মালিক ছোটন নয় এভাবে দিন কাটছে মিরসরাইয়ের কয়েক হাজার সিএনজি চালক ও মালিকের পরিবারের। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে সিএনজি-অটোরিক্সা চলাচল বন্ধ করে দেওয়াতে গাড়িগুলো নিয়ে বিপাকে পড়েছে মালিকরা। সিএনজি-অটোরিক্সা চালাতে না পেরে পরিবার-পরিজন নিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটছে সিএনজি চালকদের। চালকদের অধিকাংশ ছোটবেলা গাড়ি চালানোর কাজে জড়িত হওয়ার কারণে সিএনজি চালানোর বিপরীতে অন্য কোন পেশার সাথেও জড়াতে পারতেছেনা। আর মহাসড়কে সিএনজি-অটোরিক্সা না থাকাতে সঠিক সময়ে গন্তব্যস্থলে যেতে পারতেছেনা ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও চাকুরিজীবিরা।

সূত্রে জানা গেছে, মিরসরাইতে প্রায় দশ হাজার সিএনজি-অটোরিক্সা রয়েছে। যার অধিকাংশই মহাসড়কে চলাচল করতো। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে গত ১ আগষ্ট থেকে মহাসড়কে সিএনজি-অটোরিক্সা বন্ধ করে দেওয়াতে সিএনজি গাড়ি গুলো নিয়ে মহা দুশ্চিন্তায় রয়েছে গাড়ির মালিকরা। উপজেলাতে যে পরিমাণ সিএনজি-অটোরিক্সা রয়েছে তা আঞ্চলিক সড়কগুলোতে চালালে দৈনিক গ্যাসের বিলও উঠে না। কেননা যাত্রীর তুলনায় আঞ্চলিক সড়কগুলোতে গাড়ি বেশী। প্রতিদিন সকাল ৬ থেকে ৮ টা পর্যন্ত গ্যাস দেওয়ার জন্য সরকারের নির্দেশনা থাকলেও মিরসরাইতে সিএনজি-অটোরিক্সা বেশী হওয়ায় প্রশাসনের নির্দেশনায় সিএনজি পাম্পগুলো রাত ১২ টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত অটোরিক্সায় গ্যাস দেওয়া হয়। চালকরা দিনে গাড়ি চালিয়ে রাত জেগে পাম্পে বসে থাকেন গ্যাস নেওয়ার জন্য। সকাল ৮টার পর আর গাড়িতে গ্যাস নেওয়া যাবে না তাই। প্রশাসনের বাধার কারণে এমনিতে মহাসড়কে গাড়ি চালতে পারতেছেনা চালকরা তার উপর আঞ্চলিক সড়কগুলোতে ভাড়া কম আবার দিনে গাড়ি চালিয়ে রাত জেগে গ্যাস নেওয়া এতো ঝড়কি ঝামেলার কারণে অধিকাংশ চালক পেশা পরিবর্তন করে ফেলতেছেন। চালকেরা পেশা পরির্বতনের কারণে গাড়িগুলো নিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে গাড়ির মালিকদের। এক একটি সিএনজি-অটোরিক্সার দাম সাড়ে চার লাখ টাকা। কোন কোন মালিকের কাছে ৩০-৪০টি গাড়িও আছে। মহাসড়কে চলতে না পারলে গাড়িগুলো নিয়ে কি করবে মালিকেরা কিভাবে তুলবে তাদের পুঁজি। তার মধ্যে অধিকাংশ মালিক ব্যাংক বা এনজিও থেকে টাকা লোন নিয়ে গাড়ি কিনেছেন। তাছাড়াও চালকদের অধিকাংশ ছোট বেলা থেকে গাড়ি চালানোর পেশায় জড়িত হয়ে যাওয়ার কারণে গাড়ি চালানো ছাড়া অন্য কোন কাজের প্রশিক্ষণ না থাকার কারণে পরিবার পরিজন নিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। মালিক ও চালকদের দাবি যতদিন পর্যন্ত সিএনজি-অটোরিক্সা জন্য বিকল্প সড়ক সৃষ্টি না হয় ততদিন পর্যন্ত যেন মহাসড়কে সিএনজি-অটোরিক্সা চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়। মহাসড়কে সিএনজি অটোরিক্সা না থাকার কারণে পরিবার নিয়ে কোথাও বেড়াতে যাওয়া, কিংবা রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া ছাড়াও সঠিক সময়ে গন্তব্যস্থলে যাওয়ার জন্য যাত্রী সাধারণকে পোহাতে হচ্ছে নানা দুর্ভোগ। মহাসড়কে সিএনজি-অটোরিক্সা না চলার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে অবস্থিত বাজারগুলোতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে। উপজেলার বড় বাজার বিশেষ করে বারইয়ারহাট, জোরারগঞ্জ, মিঠাছরা, মিরসরাই, বড়তাকিয়া সহ ছোট বাজারগুলোর ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলেও সিএনজি-অটোরিক্সা বন্ধ হওয়ার কারণে বাজারে ক্রেতা কমে যাওয়ায় দোকানে কমে গেছে বেচা কেনা। অধিংকাশ দোকানদার তাদের দোকানে শ্রমিক ছাটাই শুরু করে দিয়েছে। কেননা ক্রেতা সাধারণ স্বাচন্ধে কেনাকাটা করে সিএনজি-অটোরিক্সা করে মালামাল নিয়ে বাড়ি ফিরে। কাপড় দোকান, কোক্রারীজ, ফোম, কসমেটিকস, জুতা এবং পর্দার দোকান দোকানের ক্রেতাদের মধ্যে অধিকাংশই মহিলা থাকে। অটোরিক্সা বন্ধ হওয়ার কারণে ক্রেতারা বিশেষ করে মহিলারা ঘর থেকে বের হচ্ছে না। মহাসড়কে গণপরিবহণ হিসেবে যে যানবাহন গুলো চলছে তাতে নিরাপদে কোথাও থেকে ঘুরে আসা সম্ভব নয় মহিলাদের জন্য। মহাসড়কে যাত্রীদের তুলনায় গণপরিবহণ একেবারে নগণ্য। কেনাকাটা করে মালামাল নিয়ে বাসে করে গন্তব্যস্থলে যাওয়া দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। সিএনজি অটোরিক্স বন্ধ করে দেওয়ার ফলে গন্তব্যস্থলে যাতায়াত করতে মানুষের কষ্ট বেড়ে যাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে সরকারের প্রতি।

নিজামপুর এলাকার সিএনজি চালক আনিস বলেন, ছোট বেলা থেকে সিএনজি চালানো ছাড়া অন্য কোন পেশা শিখিনি। আজ ১৫ বছর যাবত গাড়ি চালাচ্ছি। এই বয়সে গাড়ি চালানো বন্ধ করে পরিবার পরিজন নিয়ে কি করব ভেবে কুল পাচ্ছি না। তিনি আরো বলেন, মহাসড়কে সিএনজি চালানো নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে সবগুলো আঞ্চলিক সড়কে চালাতে হচ্ছে। এতে করে আঞ্চলিক সড়কে যাত্রীর তুলনায় বেড়ে গেছে গাড়ি। আর সারা দিন গাড়ি চালিয়ে দৈনিক গ্যাসের খরচ আর ব্যক্তিগত খরচও তুলা যাচ্ছে না। গাড়ি মালিকের জমা আর নিজের মজুরী তো বাদই দিলাম।

উত্তর চট্টগ্রামের বানিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বারইয়ারহাট পৌর বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের মধ্যে বেশির ভাগই মহিলা। সিএনজি বন্ধ হওয়ার কারণে মহিলারা ঘর থেকে বের হচ্ছে না। আমাদের অধিকাংশ ক্রেতা উপজেলা ডোমখালী, হাইতকান্দি, ঝুলনপোল, শান্তিরহাট, করেরহাট সহ দূর দুরান্ত জায়গা থেকে আসে। অন্যান্য সময়ের তুলনায় দোকানের বিক্রি কমে এসেছে অর্ধেকে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া ছাড়াও আর কোন উপায় থাকবেনা।

মিরসরাই উপজেলা সিএনজি শ্রমিক ইউনিয়ন সমন্বয় পরিষদের সভাপতি গোলাম ফারুক (ফারুক কোম্পানী) বলেন, মহাসড়কে সিএনজি অটোরিক্সা বন্ধ করে দেওয়া ফলে গাড়ি নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে মালিকরা আর গাড়ি চালাতে না পেরে পরিবার পরিজন নিয়ে অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে চালকদের। মিরসরাইয়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সকল প্রতিষ্ঠানের ক্রয় বিক্রয়, সেবা গ্রহণের সাথে সিএনজি-অটোরিক্সা অঙ্গাঅঙ্গিক ভাবে জড়িত। আমরা চাই সরকার সবার কথা চিন্তা করে সিএনজি-অটোরিক্সা চলাচলের জন্য বিকল্প সড়ক তৈরী করা পর্যন্ত মহাসড়কে সিএনজি চলাচলের অনুমতি দিবে।

গুলিস্তান ফিলিং ষ্টেশন এন্ড সিএনজি পাম্পের সত্ত্বাধিকারী আলহাজ্ব আজহারুল হক চৌধুরী (নওশা মিয়া) বলেন, মিরসরাইয়ে যে পরিমাণ সিএনজি-অটোরিক্সা রয়েছে সেগুলোকে সরকার ঘোষিত সময় অনুযায়ী (প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে ৮টা পর্যন্ত) গ্যাস দেওয়া সম্ভব নয়। তাই প্রশাসনের নির্দেশনায় রাত ১২ টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত সিএনজিতে গ্যাস দেওয়া হয়। সিএনজি চালকরা সারাদিন গাড়ি চালিয়ে আবার রাত জেগে গ্যাস নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। সারাদিন কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি রাত জাগাটা তাদের জন্য অত্যন্ত কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়ছে। তাই সারা দিন যাতে তারা মহাসড়ক পারাপার হয়ে পাম্প থেকে গ্যাস নিতে পারে সেজন্য এবং বিকল্প সড়ক তৈরী করা পর্যন্ত তাদের মহাসড়কে গাড়ি চলাচলের অনুমতি দেওয়া প্রয়োজন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়া আহমেদ সুমন বলেন, মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সরকারের নির্দেশনায় সিএনজি অটোরিক্সা বন্ধ করা হয়েছে। যাত্রীদের দুর্ভোগ কমাতে ইতোমধ্যে গণপরিবহন চালু করা হয়েছে। উপজেলাতে শীঘ্রই বিআরটিসি বাস চালু করা হবে।

মতামত