টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

টাকা বাঁচলেও বাঁচেনি জীবন

 চালকের পরিবর্তে চোখে ঘুম নিয়ে গাড়ি চালান হেলপার। মিরসরাইয়ে চাউলবোঝাই ট্রাক  খাদে পড়ে ৭ যাত্রী নিহত, আহত ৪

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই প্রতিনিধি 

Mirsarai-Accident-Photo-12.চট্টগ্রাম, ১২ অক্টোবর (সিটিজি টাইমস):  নিন্ম আয়ের শ্রমিক তারা। জীবিকার তাগিদে ছুটছেন। শ্রমিকদের কেউ রিক্সা চালক, কেউ ফেরিওয়ালা, কেউ-বা নির্মাণ শ্রমিক। পরিবারের একমাত্র উপর্জনকারী এ মানুষগুলো যা আয় করেন তা দিয়ে কোনমতে সংসার চলে তাদের। সবাই চট্টগ্রাম শহরের রাহাত্তারপুল এলাকায় থাকেন। কোরবানির ঈদ পরিবারের সাথে উদযাপন করতে তারা সবাই বাড়িতে যান। ঈদের ছুটি শেষে আবার কর্মস্থল চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে আসার জন্য রবিবার (১১ অক্টোবর) দুপুর ১টায় নওগা থেকে একটি চাউল বোঝায় ট্রাকে করে রওয়ানা দেন। নওগা থেকে চট্টগ্রামের বাস ভাড়া হলো ৮’শ টাকা। ভাড়া বাঁচাতে বাসের পরিবর্তে ২’শ টাকা দরদাম করে ট্রাকে উঠেন তারা। কিন্ত বিধিবাম কর্মস্থলে পৌঁছার আগেই তাদের বহনকারী ট্রাকটি নিয়ন্ত্রন হারিয়ে খাদে পড়ে গেলে ট্রাকটি উল্টে চাউলের বস্তার নিচে চাপা পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান ৭ শ্রমিক। এসময় আহত হয় তাদের সাথে থাকা আরো ৪ শ্রমিক। 

সোমবার (১২ অক্টোবর) ভোর সাড়ে ৫ টার সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ থানার দক্ষিণ সোনাপাহাড় নাছির হোটেলের সামনের এলাকায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলো নওগাঁ জেলার আত্রাই থানার উত্তর বিল গ্রামের অপি মন্ডলের পুত্র কালাম মিয়া (৪৫), বান্দাইখাড়ার উত্তর বিল গ্রামের রিয়াজ রহমানের পুত্র সাইদুর রহমান (৪০), বৌপাড়া জামগ্রামের আইন উদ্দিনের পুত্র মনির উদ্দিন (৪৫), বান্দাইখাড়া উত্তর বিল গ্রামের জিয়াউল হকের পুত্র রুবেল হক (২৫), বান্দাইখাড়া উত্তর বিল গ্রামের সাদেকুর রহমানের পুত্র টিপু (৪৫), বান্দাইখাড়া উত্তর বিল গ্রামের মোহাম্মদ নুরের পুত্র মোহাম্মদ আলম (৩০) এবং বগুড়া জেলার আদমদিঘী থানার কালাইগাড় গ্রামের আনসার আলীর পুত্র আজাদ আলী (২৫)। আহতরা হলো এলাহী, সাইফুল ইসলাম, ইয়াছিন ও শাহ আলম।

বেঁচে যাওয়া আহত যাত্রী ইয়াছিন জানান, ফেনী পার হবার পর ট্রাক চালক মোস্তাকিম ঘুমে ছিল। এরপর চালকের আসনে বসেন হেলপার। হেলপারও ঘুম নিয়ে ড্রাইভিং করছিল। হেলপার চলন্ত অবস্থায় যখন হঠাৎ ঘুমিয়ে যায় তখন ট্রাক উল্টে রাস্তার বাইরে চলে যায়। চালকের অবহেলায় ৭ টি তাজা প্রাণ চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে যায়।

আহত আরেক যাত্রী সাইফুল ইসলাম বলেন, ট্রাক চালকের চোখে ঘুম আসার কারণে ফেনী থেকে সে সহকারীকে ট্রাকটি চালানোর জন্য দেয়। এসময় আমরা হেলপারকে ট্রাক চালাতে না দেওয়ার জন্য বললে চালক আমাদের কথা শুনেননি। বেশ কয়েকবার সহকারী চোখে ঘুম নিয়ে এলোমেলো গতিতে গাড়ি চালিয়ে ব্রেকও দিচ্ছিল। তখনও আমাদের কথা শুনেনি। পরবর্তীতে মিরসরাইয়ের সোনাপাহাড় এলাকায় এলে কোনকিছু বুঝে উঠার পূর্বেই ট্রাকটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়।

নিহত টিপুর ভাতিজা সেন্টু জানান, ১১ জন শ্রমিক রবিবার দুপুরে নওগা থেকে চাউল বোঝায় ট্রাকে করে চট্টগ্রামের উদ্দ্যোশ্যে রওয়ানা দেন। তারা সবাই চট্টগ্রাম শহরের রাহাত্তারপুল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করেন। কোরবানের ঈদে তারা সবাই বাড়ি যায়। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আমি দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসি। এদিকে দুর্ঘটনার সাথে সাথে হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি মল্লিক ফকরুল ইসলাম, হাইওয়ে পুলিশ চট্টগ্রাম রেঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার গোলাম মোহাম্মদ, জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহিদুল কবির, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ছুটে আসেন।

জোরারগঞ্জ চৌধুরীহাট হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট ফরিদ উদ্দিন জানান, নওগাঁ খাদ্য গুদাম থেকে বাংলাদেশ খাদ্য অধিদপ্তরের একটি চাল বোঝাই একটি ট্রাক চট্টগ্রাম শহরের দেওয়ানহাট খাদ্য গুদামে যাচ্ছিল। ভোরে ট্রাকটি জোরারগঞ্জ থানার সোনাপাহাড় এলাকায় পৌঁছলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। এতে ট্রাকের ১১ যাত্রীর মধ্যে ৭ জন ঘটনাস্থলে নিহত হন। আহত হয় আরো ৪ জন। ঘটনারপর চালক ও চালকের সহকারী পালিয়ে যায়। চালকের পরিবর্তে ট্রাকটি তার সহকারী চোখে ঘুম নিয়ে চালানোর কারণে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়।

তিনি আরো বলেন, মিরসরাই ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স, জোরারগঞ্জ থানা ও জোরারগঞ্জ চৌধুরীহাট হাইওয়ে পুলিশ সদস্যের সহায়তায় ঘটনাস্থল থেকে নিহতদের লাশ ও দুর্ঘটনার শিকার ট্রাক উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। আমরা দেশের বিভিন্ন থানাকে বিষয়টি অবহিত করেছি। শীঘ্রই চালক ও হেলপারকে গ্রেপ্তার করে সক্ষম হবো। দুর্ঘটনায় আহত হওয়া ট্রাকের যাত্রী এলাহী বাদি হয়ে একটি এজাহার দিয়েছে।

হাইওয়ে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার গোলাম মোহাম্মদ বলেন, নিহতদের স্বজনদের অনুরোধে লাশ ময়নাতদন্ত না করতে অতিরক্তি জেলা ম্যাজিষ্ট্রেটের কাছে আবেদন করা হয়। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার দুপুর দুইটায় একটি ট্রাক যোগে স্বজনদের মাধ্যমে লাশগুলো নওগায় গ্রামের বাড়ি পাঠানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যতে যেন কোন মানুষ ঝুঁকি নিয়ে ট্রাকে না উঠে সেজন্য অনুরোধ জানান।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত