টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

পর্যটক মিলছে না কক্সবাজারে

চট্টগ্রাম, ১১ অক্টোবর (সিটিজি টাইমস):  সম্প্রতি ঢাকা-রংপুরে এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে দুই বিদেশি হত্যা এবং রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে পর্যটক অপহরণের ঘটনার পর ভেঙে পড়েছে কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসা। এতে করে মওসুমের শুরুতেই প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা খেল পর্যটন খাত।

পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতে এই আঘাত ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমান ৫০ ভাগ ডিসকাউন্ট দিয়েও তারা পর্যটক পাচ্ছেন না। এর মধ্যে আবারো বিদেশি মিশনগুলো থেকে নতুন করে সতর্কবার্তা জারি করায় কক্সবাজার ভ্রমণে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটকরা আতঙ্কিত। এই প্রচারণা অব্যাহত থাকলে বড় প্রভাব পড়বে পর্যটন খাতে।

এমনিতেই গত কয়েক বছর ধরে দেশব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতায় পর্যটন ব্যবসা ছিল খুবই খারাপ অবস্থায়। এর মধ্যে ঈদুল আজহার পর পর্যটন ব্যবসায় মওসুমটি ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। বিভিন্ন হোটেলে অগ্রিম বুকিংও ছিল উল্লেখ করার মতো। দেশি পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল চোখের পড়ার মতো।

সূত্র জানায়, ব্রিটিশ ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশ সম্পর্কে সর্বশেষ সতর্কবার্তায় বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদী হামলার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে বলে জানানো হয়। সম্প্রতি দুইজন বিদেশিকে হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে এতে বলা হয়, ‘ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড লেভান্ত’ এই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে। বাংলাদেশ সফরকারীদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়ে ওয়েবসাইটে বলা হয়, বিশেষ করে যেসব অনুষ্ঠানে পশ্চিমা দেশের নাগরিকরা সমবেত হন, সেগুলোতে যোগদানের সময় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও কানাডাসহ অনেক পশ্চিমা দেশই তাদের নাগরিকদের গতিবিধি সীমিত রাখার পরামর্শ দিচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার কয়েক দফায় কূটনীতিকদের সাথে বৈঠক করে নিরাপত্তার ব্যাপারে আশ্বাস দেয়ার পরও নিরাপত্তা নিয়ে এসব দেশের উদ্বেগ কাটেনি।

বিশেষ করে ঈদুল আজহা ও শীতের আগমনের সাথে সাথে পর্যটন মওসুম শুরু হয় কক্সবাজারে। প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ ও আনন্দময় সময় কাটাতে এখানে আসেন দেশি-বিদেশি পর্যটক। সমুদ্র সৈকত ছাড়াও টেকনাফের সেন্টমার্টিন, মাথিনের কূপ, পাথুরে ইনানী বিচ, হিমছড়ি, দরিয়ানগর, রামু বৌদ্ধ মন্দির, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, কুতুবদিয়ার বাতিঘর ও ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক সারা বিশ্বে পর্যটন স্পট হিসেবে পরিচিত।

এসব পর্যটন স্পট সারা বছর দেশি-বিদেশি পর্যটকে মুখরিত থাকে। কিন্তু বিদেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ও পর্যটক অপহরণের ঘটনায় নতুন করে নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে জেলার পর্যটন এলাকাগুলোতে।

কক্সবাজারে রয়েছে ৪ শতাধিক আবাসিক হোটেল এবং ৫৪০টি রেস্তোরাঁ। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী এই কক্সবাজারের ২৫ লাখেরও বেশি মানুষের বসবাস। এর মধ্যে পর্যটন ব্যবসায় জড়িত মোট জনশক্তির ১০ শতাংশ। কিন্তু হঠাৎ এই ধসে কেবল আবাসিক হোটেলগুলোতে নয়, নাজুক অবস্থা তারকা মানের হোটেলগুলোতেও।

সৈকতের লাবণী পয়েন্ট, সি ইন পয়েন্ট, কলাতলী পয়েন্ট ও সি গাল পয়েন্টে হাতে ঝুড়ি নিয়ে শামুক-ঝিনুকের ‘কসমেটিক’ সামগ্রী বিক্রি করে ৬৪ জন ভ্রাম্যমাণ হকার।

একইভাবে প্রভাব পড়েছে কক্সবাজার শহরের ঐতিহ্যবাহী বার্মিজ মার্কেটগুলোতেও। সমুদ্র সৈকতের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জানান, এ সময়টাই আমাদের ব্যবসার প্রধান সময়। কিন্তু পর্যটক না থাকায় ব্যবসা প্রায় শূন্য।

কলাতলীর সাগরপাড়ে অবস্থিত হোটেল সায়মান রিসোর্ট সূত্র জানায়, তাদের ২০০ কক্ষের বুকিং বাতিল করেছেন বিদেশিরা। কয়েকটি দেশের নাগরিক চলতি মাসের মধ্যখানে এখানে একটি সম্মেলনে মিলিত হওয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তাজনিত কারণে এই বুকিং বাতিল করা হয়েছে। এখন তারা ৫০ ভাগ ডিসকাউন্ট দিয়েও পর্যটক পাচ্ছেন না।

তারকা হোটেল সীগাল সূত্র জানায়, কক্সবাজারে পর্যটকের স্রোত কমে গেছে। একইভাবে পাঁচ তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইজ সূত্র জানায়, প্রায় দেড় শতাধিক বিদেশি পর্যটক তাদের বুকিং বাতিল করেছেন। হোটেল লংবীচের অবস্থাও একই। এতে করে শুধু অক্টোবর মাসেই কক্সবাজারের হোটেল-মোটেলগুলো লোকসান করেছে কোটি কোটি টাকা।

অন্যদিকে কক্সবাজারের মহেশখালীতে বিদ্যৎকেন্দ্রে কর্মরত বিদেশি কর্মকর্তারা ইতোমধ্যেই কক্সবাজার থেকে চলে গেছেন। কক্সবাজার পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত জার্মান ও ভারতীয় পাঁচ নাগরিক ৬ অক্টোবর কক্সবাজার ছেড়ে চলে গেছেন।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম সিকদার বলেন, ঈদের পর থেকে কক্সবাজারে কিছু পর্যটক আসতে শুরু করে। কিন্তু হঠাৎ দুই বিদেশি হত্যা ও রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে দেশীয় পর্যটক অপহরণের সংবাদে পর্যটক ব্যবসায়ীরা চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে হোটেল, মোটেল আর পর্যটন স্পটগুলোর কটেজের ভাড়া অর্ধেকেরও বেশি কমিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না। ঠিক পর্যটন মওসুমের শুরুতেই এমন ভয়াবহ হামলা, যার বড় প্রভাব পড়ল এই খাতে। পর্যটন ব্যবসার ভবিষ্যৎ এখন খুবই খারাপ।’

অবশ্য কক্সবাজার জেলা পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশ সূত্রে দাবি করা হয়েছে, দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য কক্সবাজারে কোনো ধরনের হুমকির কোনো কারণ নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পর্যটকদের নিরাপত্তায় সতর্ক রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক আলী হোসেন বলেন, দেশব্যাপী বিদেশি নাগরিক ও পর্যটকদের ব্যাপারে যে আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে, কক্সবাজারে তার কোনো প্রভাব যাতে না পড়ে সেজন্য জেলা প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে পর্যটন এলাকাগুলোতে এবং বিদেশিদের বিচরণ স্থান হোটেল-মোটেলগুলোতে তাদের নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে জেলা প্রশাসন কাজ করছে।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত