টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

দেশের সর্ব বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল হবে মিরসরাইয়ে কর্মসংস্থান হবে ৫ লক্ষাধিক

একান্ত সাক্ষাৎকারে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী

এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই  প্রতিনিধি 

Mirsarai-Silpojone-Photo-1চট্টগ্রাম, ০৫ অক্টোবর (সিটিজি টাইমস):  মিরসরাইয়ের উপকূলীয় এলাকা ইছাখালী। দুচোখ যতটুকু যায় দেখা যাবে ধু-ধু চর আর চর। কে জানত পরিত্যাক্ত ধু-ধু চরে হবে দেশের বৃহত্তম আধুনিক পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অঞ্চল শিল্প শহর। কে জানত ৮০’র দশকে ফেনী নদীতে বাঁধ দিলে নদীর বুকে জেগে উঠবে প্রায় ৫০হাজার একর চর। এরমধ্যে ৭ হাজার ৫০০ একর প্রাকৃতিক নিসর্গে জেগে উঠা চরে গড়ে তোলা হচ্ছে “অর্থনৈতিক অঞ্চল”। এখন দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ কারীদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এখন শুধু বিনিয়োগের অপেক্ষা। অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভূমি অধিগ্রহণের পর অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। জুনে দৃশ্যমান হবে ১হাজার কোটি টাকার কাজ। সম্প্রতি মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে একান্ত সাক্ষাতকারে এ প্রতিবেদককে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী অর্থনৈতিক অঞ্চলের সামগ্রিক অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন।

চট্টগ্রামের প্রবেশধার মিরসরাই হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির গেইটওয়ে। বদলে যাবে মিরসরাই, খুলে যাবে কর্মসংস্থানের দ্বার। দেশে অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ বাস্তবায়ন হলে ঘুরে দাঁড়াবে দেশের অর্থনীতির চাকা। বিশ্বের মাঝে দ্রুত অগ্রগতির মডেল হবে বাংলাদেশ। এমন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন মিরসরাইয়ের সাংসদ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন।

উপজেলায় প্রস্তাবিত দেশের সর্ব বৃহৎ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মানের কাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে । দেশে প্রস্তাবিত ৩০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে নয়টি অর্থনৈতিক অঞ্চল আগে হবে। এমনটাই আশা করছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। তাই নয়টির জন্যই আগামী ১০ বছরের গ্যাস-বিদ্যুতের চাহিদাও নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো হচ্ছে শ্রীহট্ট, শ্রীপুর, আনোয়ারা (২), মংলা এবং বেসরকারি আবদুল মোনেম, এ কে খান, মিরসরাই, মেঘনা ও বিজিএমইএ শিল্পপার্ক। এগুলোর মোট আয়তন ১০ হাজার ৬৯২ একর। এগুলোর মধ্যে দেশের সবচে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল হবে মিরসরাই। এর আয়তন ৭ হাজার ৫০০ একর। সে হিসেবে অঞ্চলটির গ্যাস-বিদ্যুতের চাহিদাও সবার থেকে বেশি হবে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এর জন্য ১এমএমসিএফটি গ্যাস ও ২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লাগলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্যাস ৩৪০ এমএমসিএফটি এবং বিদ্যুতের দরকার পড়বে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তন্ত্রণালয়ের এক সভায় অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর জন্য ১০ বছরের গ্যাস-বিদ্যুতের এ চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান । আগামী ১৫ বছরে দেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল করা হবে ১০০টি। আর এ থেকে বছরে আয় হবে চার হাজার কোটি ডলার এবং কর্মসংস্থান হবে এক কোটি মানুষের। এসব শিল্প অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে। সবচে বেশী আয়তনের বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল মিরসরাইয়ে হওয়ায় এখানে কর্মসংস্থান হবে ৫লাখেরও বেশী মানুষের। প্রধানমন্ত্রীর এ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের কাছে দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতির মডেল।

আগামী জুন মাসের মধ্যে বামুন সুন্দর সংযোগ সড়ক, প্রকল্পের ৬শএকর মাটি ভরাট ও দুটি স্লুইসগেইট নির্মান কাজ শেষ হলে দৃশ্যমান হবে ১হাজার কোটি টাকার কাজ একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধূরী।

স্পেশাল অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিনিয়োগকারী নিয়োগে দরপত্র বিজ্ঞত্তি পত্রিকায় দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য তার সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট,যুক্তরাজ্য, জাপান ও চীন সফরে বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এমন আহ্বানের পর বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ভারত, চীন, জাপান ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ। চলতি বছরের মধ্যে বড় একটি প্রতিষ্ঠানকে বিনিয়োগকারী নিয়োগের ব্যাপারে চূড়ান্ত করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে ওই প্রতিষ্ঠানই খন্ড খন্ড ভাবে দ্রুত গতিতে শিল্পজোন পৃর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করবে। চট্টগ্রাম শহর থেকেও ইছাখালীর চরে শিল্পজোন হবে সমৃদ্ধ। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বিশেষায়িত এ অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত সম্ভাবনার কথা জানিয়ে বলেন, সমুদ্র-লাগোয়া এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে কক্সবাজারের মাতারবাড়ীর মতো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে। গড়ে উঠবে মিনি শহর। শিল্পপ্লান্ট, বিদ্যুৎ প্লান্ট ও ট্যুরিজমের অনুকূল সব ধরনের স্থাপনা থাকবে এখানে।

বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করতে চট্টগ্রামের শিল্প উদ্যোক্তাদের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে মতবিনিময় এর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধূরী। শ্রীঘ্রই চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে শিল্পপতিদের নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হবে।

মিরসরাই শিল্পজোনের অগ্রগতি প্রসঙ্গে পবন চৌধুরী জানান, প্রথমবস্থায় যদিও ইছাখালীতে ইকোনমিক জোন পরিকল্পনায় ছিল বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কারনে এটি হবে স্বয়ং সম্পূর্ণ ইন্ডাষ্ট্রিয়াল শহর। এখানে অনেকগুলো ইকোনমিক জোন, আইটি পার্ক, ইপিজেট, মাল্টি প্রোডাক্টসের সিঙ্গেল ইকোনমিক জোন নির্মিত হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ৫হাজার একর জমি বন্দোবস্ত হয়েছে। ২হাজার একর জমি বন্দোবস্তির প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এতে ১০টি ইকোনমিক জোন গড়ে তোলা হবে। ভবিষ্যতে চাহিদা মোতাবেক প্রকল্প সম্প্রসারণ করা হবে। প্রথম ব্লকে ইছাখালীর পীরের চরে ৬০০ একর জমিতে বিনিয়োগে বিএসআরএম, আব্দুল মোমেন, মেঘনা গ্রুপ, চীন ও ইউরোপের সহ বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে। চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে বেজার মিটিংয়ে ইকোনমিক শহর নির্মাণে ৫০ বছরের জন্য ইজারাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে। ওই প্রতিষ্ঠানই ভেতরের ডেভোলপমেন্ট কাজগুলো বাস্তবায়ন করবে এবং ইকোনমিক শহরে শিল্প উদ্যোক্তা নিয়োগ করবে।

প্রথম ব্লকে আগামী জুন মাসের মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণে ১হাজার কোটি টাকার কাজ করবে বেজা। ইকোনমিক জোনে ৬০০০ একর জমিতে মাটি ভরাট, খাল খনন ও ২টি স্লুইস গেইট নির্মাণে ৫০ কোটি টাকা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বড়তাকিয়া থেকে বামনসুন্দর স্লুইস গেইট পর্যন্ত সড়ক নির্মাণে একশ কোটি টাকা এবং বামনসুন্দর স্লুইস গেইট থেকে ইকোনমিক জোনের প্রথম ব্লকে পীরের চরে বেড়িবাঁধ মেরামত ও নির্মাণে ১৬ কোটি টাকা বরাদ্ধ পাওয়া গেছে।

গ্যাস-বিদ্যুতের সংস্থান কীভাবে হবে জানতে চাইলে পবন চৌধুরী বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহে অগ্রধিকার দিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা রয়েছে। তাই একে কোনো সমস্যাই মনে করছেন না তিনি।

অর্থনৈতিক অঞ্চল বিল পাস হয় ২০১০ সালের আগস্ট মাসে। ২০১০ সালে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বিল পাশ হলেও কর্তৃপক্ষের পূর্ণতা পায়নি। তখন থেকে মিরসরাইয়ের চরাঞ্চলে শিল্পপার্ক অথবা বিশেষ অর্থনৈতিক জোন স্থাপনের চিন্তা-ভাবনা করে আসছে সরকার। কিন্তু ২০১০ সালের ২৯ ডিসেম্বর মিরসরাইয়ের মহামায়া সেচ প্রকল্প উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিল্পপার্ক স্থাপনের ঘোষণা দিলে তখন এই বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে চলে আসে। এর পর থেকে সরকারের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ ও বিদেশী অনেক বিনিয়োগকারী মিরসরাইয়ের চরাঞ্চল পরিদর্শন করেন। এরপর একনেক এ চুড়ান্ত অনুমোদনের পর প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহন ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য অর্থ বরাদ্ধ দেয়া হয়।

এ বিষয়ে মিরসরাইয়ের সাংসদ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, দেশে মানুষ বাড়ছে ,জমি কমছে। এখন জমিকে অপরিকল্পিত ভাবে নষ্ট করা যাবেনা। ঘর-বাড়ী-শিল্পকারখানা এখন উন্নত দেশের মত পরিকল্পিত ভাবে হবে। আর মিরসরাইতে হবে দেশের সর্ব বৃহৎ শিল্প অঞ্চল। মিরসরাইয়ের এই স্পেশাল ইকোনমিক জোন থেকে ভারতের সীমান্ত মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে। মন্ত্রী আরো বলেন, তিন মাসের মধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রাথমিক কিছু কাজ দৃশ্যমান হলে বিদেশি বিনিয়োগ কারীরা আরো আগ্রহী হবে।

নোয়াখালীর সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণার পাশাপাশি সীতাকুন্ডের ফৌজদারহাট থেকে বাড়বকুন্ড হয়ে মিরসরাইয়ের মুহুরী প্রকল্প পর্যন্ত নির্মাণ করা হবে ৬০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে একটি সড়ক।

প্রস্তাবিত এলাকায় জাহাজ নির্মাণ শিল্প, তৈরি পোশাক শিল্প, পলিমার উৎপাদন শিল্প, চামড়াও চামড়াজাত পণ্য, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, অটোমোবাইল, প্লাস্টিক শিল্প, ফার্ণিচার, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ও ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি নির্মাণ শিল্প, হিমায়িত মৎস্য শিল্প, এবং হোম টেক্সটাইল শিল্প গড়ে তোলা হবে। প্রতিটি শিল্পের জন্য আলাদা আলাদা শিল্প নগরী গড়ে তোলার আয়োজন চলছে বলে শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

মতামত