টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

রাউজানের অলিতে গলিতে লাইসেন্স বিহীন ফার্মেসির রমরমা ওষুধ বাণিজ্য

নিষিদ্ধ, ভারতীয়, নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের ঔষধের ছড়াছড়ি

এস.এম. ইউসুফ উদ্দিন
রাউজান প্রতিনিধি 

চট্টগ্রাম, ০১ অক্টোবর (সিটিজি টাইমস): চট্টগ্রামের রাউজানে অলিতে গলিতে ব্যাঙের ছাতার মত গড়ে উঠেছে সহস্রাধিক ওষুধের দোকান। ওষুধ প্রশাসনের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে শুধু ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে পাড়া-মহল্লায় অনেকেই ফার্মেসি দিয়ে বসে পড়েছেন ওষুধ বিক্রির ব্যবসায়। এসব ফার্মেসি চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই হায়ার অ্যান্টিবায়োটিক, নিষিদ্ধ, ভারতীয়, নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের নানা প্রকার ওষুধ বিক্রি করছে অবাধে। এছাড়া নেই কোন প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট। ফলে রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে আরও জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন রোগী। এতে আর্থিক, শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন অনেক রোগী ও তাদের পরিবার-পরিজন।

উপজেলার পথেরহাট, পাহাড়তলী, জলিল নগর, মুন্সিরঘাটা, ফকির হাট, গহিরা, রমজান আলীর হাটের মত বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো সহ ১৪ টি ইউনিয়ন ও ১ টি পৌরসভার প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডে মিলে রয়েছে সহস্রাধিক ঔষধের দোকান বা ফার্মেসী। রাউজানে ওষুধের দোকানের সংখ্যা নিয়ে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য না থাকলেও তাদের ওয়েব সাইটের উল্লেখিত তথ্য মতে উপজেলায় ২০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লাইসেন্স প্রাপ্ত ফার্মেসীর সংখ্যা ৩২৯ টি। এদের মধ্যে লাইসেন্স নবায়নকৃত ফার্মেসীর সংখ্যা মাত্র ৮৪ টি ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলার পাড়া গাঁয়ের এক ওষুধ ব্যবসায়ী প্রতিবেদককে জানান, লাইসেন্স পাওয়ার জন্য মোটা অংকের ঘুষ দিয়েও ওষুধ প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও দালালদের দ্বারা নানা প্রকার হয়রানির শিকার হতে হয়। তাছাড়া একটি লাইসেন্স নিতে হলে নূন্যতম ২০ থেকে ২৫ টাকা খরচ পড়ে। দোকানের সকল ব্যয় বহন করে মাসে ৬-৮ হাজার টাকা আয় হয়। তা দিয়ে পরিবারের ব্যয় মিটিয়ে কিভাবে লাইসেন্স নেওয়া সম্ভব।

ড্রাগ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ, ১৯৮২-এর ৪ নম্বরের ১৩ নম্বর ধারার ‘ফার্মাসিস্টদের নিয়োগ’ শিরোনামের ২ নম্বর ধারায় উল্লেখ আছে ‘কোনো খুচরা বিক্রেতা বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিলের কোনো রেজিস্ট্রারের রেজিস্ট্রিভুক্ত ফার্মাসিস্টদের তত্ত্বাবধান ব্যতিরেকে কোনো ড্রাগ বিক্রি করতে পারবে না।’

কিন্তু এসকল বিধি বিধানকে তোয়াক্কা না করে উপজেলার অধিকাংশ ফার্মেসি চলছে প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট ছাড়াই। অল্প পারিশ্রামিকে অদক্ষ লোক বসিয়ে বিক্রি করছে জটিল সব রোগের ওষুধ। ফলে মানহীন ভুল ওষুধ যেমন বিক্রি হয়, তেমনি এসব ওষুধ কিনে ক্ষতিগ্রস্ত হন ক্রেতারা।

সাধারণত এ, বি, সি এই তিন ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্ট রয়েছে দেশে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসি বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রিধারীরা হলেন ‘এ’ ক্যাটাগরির, চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্সধারীরা ‘বি’ ক্যাটাগরির আর তিন মাসের কোর্সধারীরা ‘সি’ ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্ট।

উপজেলার যে সকল ফার্মেসীতে ফার্মেসিস্ট রয়েছে এদের ৯৯ শতাংশ ‘সি’ ক্যাটাগরির ফার্মাসিস্ট। যাদের নুন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিক পাস।

ফার্মেসিগুলো কোনো দিক চিন্তা না করেই ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ব্যতিত সিপ্রোফ্লোক্সাসিলিন, এজিথ্রোমাইসনসহ অনেক হাই অ্যান্টিবায়োটিক, ঘুমের বড়ি, ব্যাথা নাশক ও যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট অবলীলায় বিক্রি করছে। এ ছাড়াও প্রকাশ্যে মজুদ রেখে বিক্রি করা হচ্ছে আমদানী নিষিদ্ধ ওষুধ।

কয়েকজন সচেতন ক্রেতার সাথে কথা বলে জানা যায়, এখন ফার্মেসিতে আর বিশেষজ্ঞ লোকজনের দরকার হয় না। ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভরা বলে দেন কোন ওষুধ কখন এবং কি কাজে লাগে- সেই মোতাবেক ওষুধ বিক্রি হয়। এছাড়া অনেক ওষুধের দোকানে নিম্নমানের ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভরা ওষুধ বিক্রি করে দেয়।

অভিযোগ রয়েছে, ফার্মেসী সংলগ্ন ডাক্তারের চেম্বারে নিম্নমানের ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভরা রোগী দেখার সময় ডাক্তারের চারপাশে কেঁচোর মত কিলবিল করে। ডাক্তারদের নগদ অর্থসহ নানা উপঢৌকন দিয়ে প্রলুব্ধ করে ব্যবস্থাপত্রে নিম্নমানের ওষুধ লিখতে বাধ্য করে।

উপজেলার অবৈধ ফার্মেসিগুলো সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যের ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বেশি মূল্যে বিক্রি করছে, যা রোগ নিরাময়ের পরিবর্তে উল্টো নানা উপসর্গের সৃষ্টি করছে।

স্থানীয় সংসদ রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ফজলে করিম চৌধুরী রাউজানবাসীর সুচিকিৎসা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহন করলেও ওষুধ প্রশাসনের উদাসীনতায় তা ভেস্তে যাচ্ছে।

সচেতন মহল অনুমোদনহীন নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রি বন্ধ করতে ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান জরুরী মনে করছেন।

এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. অসীম কুমার নাথ বলেন, এসকল তদারিক করা ওষুধ প্রশাসন ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব। কিন্তু রাউজানে ওষুধ প্রশাসনের কোন তৎপরতা বা কোন লোকবল নেই। আমি ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে অসাধু ওষুধ ব্যবসায়ীদের সকল অপতৎপরতা প্রতিরেধের বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনকে অবগত করব।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত