টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

নাড়ির টানে বাড়ির পানে

eid

মসরুর জুনাইদ
সম্পাদক – সিটিজি টাইমস ডটকম
https://www.facebook.com/mosrur.zunaid

চট্টগ্রাম, ২৪ সেপ্টেম্বর (সিটিজি টাইমস): পথে পথে শত বিড়ম্বনা উপেক্ষা করে তবু নাড়ির টানে বাড়ির পানে ফিরছে মানুষ। কর্মব্যস্ত নগরী, ক্লান্তিকর জীবন থেকে কিছু দিনের জন্য প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটাতে চিরচেনা নিজ নিজ বাড়িতে ছুটেছে সবাই। প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগির জন্য এই ঘরে ফেরাতেই সবার আনন্দ।

উদ্দেশ্য একটাই- পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ পালন করা।

আসলে নাড়ির টান কখনোই অস্বীকার করার নয়। সেই গ্রামে, যার ধূলোবালিতে শত মধুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে, সেখানে ফিরেযেতেই হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের মন্তব্য, “তুমি যত বড় ব্যক্তিত্বই হও না কেন, নাড়ির টানে তোমাকে ফিরে আসতেই হবে সেই শৈশবের গাঁয়ে, যেখানে তুমি গুড়ি গুড়ি পায়ে হাঁটতে শিখতে আর দপ করে পড়ে যেতে।”

ঈদযাত্রায় ভাড়ার নামে লুটপাট, বাস, ট্রেন, লঞ্চে তিলধারণের ঠাঁই মিলছে না, আছে ভাঙাচোরা সড়ক-মহাসড়কে চলাচলের ঝক্কি, ছিনতাই-অজ্ঞান পার্টিসহ নানা রকম প্রতারণামূলক কাজ-কারবার। আছে দুর্ভোগ, কষ্ট, ভোগান্তির দীর্ঘ খতিয়ান। শেষ মুহূর্তের যাত্রায় বাস ও ট্রেনের ভয়াবহ শিডিউল বিপর্যয়ের মুখে পড়ে হাজার হাজার যাত্রী। তবু যেভাবেই হোক আপনজনের কাছে পৌঁছাতেই হবে। ছুটে যেতে হবে শেকড়ের টানে চিরচেনা গ্রামে। এই ঘরে ফেরাতেই আনন্দ।

আসলে নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে সবার নিরন্তর চেষ্টা। সেজন্যই বহু কষ্টে আকাঙ্ক্ষিত বাহনের টিকিট পেতে চেষ্টার সর্বোচ্চটা করেছেন সবাই। আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে ঈদ করতে না পারলে অপূর্ণ থেকে যায় ঈদের আনন্দ। প্রিয়জনের কাছে ফিরতে তাই অধীর অপেক্ষা সবার। এ কারণে ঈদের আগে রেলস্টেশনে বা বাসস্ট্যান্ডে দেখা যায় টিকিটের জন্য যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও নির্দিষ্ট গন্তব্যের টিকিট জোগাড় করতে হয়। অনেকে চেষ্টা করেও পান না। সবাই অপেক্ষায় থাকেন, কখন রওনা দেবেন তার চিরচেনা সেই বাড়ির উদ্দেশে।

এবারের ঈদেও এর ব্যতিক্রম নয়। নাড়ির টানে ইটপাথরের নগর ছেড়ে মানুষ বাড়ি গিয়েছে। প্রিয়জনের সান্নিধ্যে উৎসবে মেতে ওঠার আনন্দে বিভোর মানুষ বাড়তি ভাড়া, পথের কষ্ট, ঝুঁকি, অনিশ্চয়তা সবকিছু উপেক্ষা করে রওনা করেছে ঘরের পথে।

নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা মানুষদের দুর্ভোগও থাকে প্রতি বছর। ঈদের কয়েকদিন আগেই শুরু হয়েছে তীব্র্র যানজট।

সড়কপথে দীর্ঘ যানজটের কারণে মানুষের প্রথম পছন্দ থাকে ট্রেনযোগে বাড়ি ফেরা কিন্তু ট্রেনের টিকেট ছিল সোনার হরিণ। একটি টিকেটের জন্য ভোররাতে এসে মানুষ লাইনে দাঁড়ায়। কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়েও যে টিকেট পাওয়া যাবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আবার টিকেট পেয়েও স্বস্তি নেই। যাত্রার সময় যাত্রা ভোগান্তিতো আছেই, এছাড়াও আছে ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়।

যাতায়াতের নানামুখী ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার আগে-ভাগেই হাজারো মানুষ ট্রেন, বাস, লঞ্চযোগে গ্রামে ছুটে গেছে।

কয়েকদিন থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন বাস টার্মিনালগুলোতে যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ দেখা গেছে। ঈদের ২-৩ দিন আগের ধকল এড়াতে গতকাল থেকে অনেকেই পরিবার-পরিজনকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন।

প্রতিটি রুটের নির্ধারিত পরিবহনগুলোর চলতি টিকেটের জন্য যাত্রীদের কাড়াকাড়ি। যাত্রীদের চাপে প্রায় প্রতিটি পরিবহন অতিরিক্ত ট্রিপের ব্যবস্থা করেছে।

মিলন মাহমুদের গানে রয়েছে- স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার,/ পথ দেব পাড়ি তোমার।/ কাছে যাব ফিরে পাহাড়ে পাহাড়।/ সাঝ বেলায় সাজ সাজ রব,/
ছুটে যাব সেই হাঁসির টানে।/চলে যাব স্মৃতির কোলে,/ আমার সব যেখানে।/ বাঁধন ভুলে, স্মৃতির টানে,/ যাচ্ছি ফিরে চেনা পথে, রঙ্গিন অনেক গল্প ভেবে,/ স্বপ্ন ভরা দু’চোখ নিয়ে।/”

‘স্বপ্ন ভরা দু’চোখ নিয়েই’ ট্রেন, বাস কিংবা নৌ পথের লঞ্চ-স্টিমারে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ছুটেছে সবাই।

হাজার হাজার যাত্রী জায়গা না পেয়ে ট্রেনের ভেতর দাঁড়িয়ে গেছে। কেউ দরজা-জানালায় ধরে, কেউবা ছাদে চড়ে। বাস, লঞ্চেও ছিল একই অবস্থা।

আসলে মা, মাটি ও মাতৃভূমির প্রতি বাঙালীর টান সব সময়ই অকৃত্রিম। আর ঈদ-পালা-পার্বণ বা যেকোনো উপলক্ষ তা যেন বাড়িয়ে দেয় আরো শতগুণ। মায়া-মমতা-আবেগ-অনুভূতিতে ভরা বাঙালি হৃদয় সর্বদাই ঘরমুখী। দুয়ারে দাঁড়িয়ে আঁচলে চোখ মুছে যে প্রিয়জনকে রেখে জীবিকার খোজে এসেছিল এই শহরে, আজ ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে চিরচেনা সেই স্বজনদের মাঝে উপস্থিত হবার আকুলতা তাই সব বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে কর্মস্থলকে পিছনে ফেলে, নাড়ির টানে সম্মুখপানে টেনে নিচ্ছে সবাইকে। নাড়ির টানে আশৈশব কাটানো স্বজন-বন্ধু, আত্মীয়-পরিজনের সাথে মিলনের জন্য গ্রামের বাড়িতে শত দুর্ভোগ সত্ত্বেও যাওয়ার জন্য মানুষ উতলা হয়ে ওঠে। বাড়ি ফেরার এই ব্যাকুলতা রুখে দেয়ার সাধ্য কার?

মতামত