টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

হঠাৎ উত্তপ্ত মিরসরাই: সপ্তাহ ব্যবধানে জোড়া খুন, বেড়েছে ছিনতাই, ইভটিজিং

 এম মাঈন উদ্দিন
মিরসরাই প্রতিনিধি

map-ctg-mirsaraiচট্টগ্রাম, ১৩  সেপ্টেম্বর  (সিটিজি টাইমস)::   চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলা। সাড়ে ৫ লক্ষাধিক লোকের বসবাস এই উপজেলায়। ১৬ টি ইউনিয়ন ও ২ টি পৌরসভার সমন্বয়ে গঠিত ৪৮২.৮৮ বর্গ কিলোমিটারের উপজেলার নিরাপত্তার স্বার্থে জোরারগঞ্জ ও মিরসরাই থানা বিভক্ত করা হয়। উপজেলায় বসবাসরতদের নিরাপত্তায় ২ টি থানা ছাড়াও রয়েছে ১ টি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র ও হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি। পর্যাপ্ত জনবলের সম্মিলন এখানে। স্বল্প জনবলের অযুহাতেরও সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এতদ অঞ্চলের মানুষের চাওয়া নিরাপত্তা। কিন্তু নিরাপত্তার জন্য এই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পর্যাপ্ত নয় কি? আর কত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ফাঁড়ি, থানা কিংবা তদন্ত কেন্দ্রের প্রয়োজন? প্রশ্ন উপজেলার সচেতন জনগণের। হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে উঠলো মিরসরাই। শান্তির এই জনপদের মানুষগুলো আজ আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে। তাদের জন্য দিন, সন্ধ্যা কিংবা রাত কোনটাই এখন নিরাপদ নয়। দিনদুপুরে ফিল্মি স্টাইলে ঘটছে ছিনতাই, সন্ধ্যায় জনসম্মুখে পিটিয়ে হত্যারপর লাশ ফেলে দেওয়া হচ্ছে পুকুরে; রাতে আপন নিবাসে ফেরার পথে হতে হচ্ছে খুন। এসবের শেষ কোথায়? সপ্তাহের ব্যবধানে ঘটলো জোড়া খুন। তবে এসব থেকে মুক্তির পথ হতে পারে পুলিশের শক্ত আইনের শাসনই। রিকসা চালক সাদ্দাম হত্যার সাথে জড়িত কাউকে আদৌ গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। মিঠাছরা বাজারে দিনদুপুরে ফিল্মি স্টাইলে ছিনতাইয়ে জড়িত ১০ জনের মধ্যে ৪ জনকে গ্রেফতার করা হলেও বাকী ৬ জনকে গ্রেফতার ও ছিনতাই হওয়া ১৪ লাখ টাকা এবং ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার হয়নি অদ্যাবধি। সর্বশেষ উপজেলার মিঠানালা ইউনিয়নের মলিয়াইশে ব্যবসায়ী মেজবা উদ্দিন ভূঁইয়া খুনের ঘটনায় শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত খুনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ৭ আসামীর মধ্যে ৩ জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় এবং বাকী ৪ আসামীকে এখনো গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়নি পুলিশ এবং খুনের ঘটনায় ব্যবহৃত পিস্তলও ছিনতাই হওয়া নগদ ৫০ হাজার টাকাও উদ্ধার হয়নি।

সাদ্দাম হোসেন বাবু। পেশায় রিকসা চালক। তাকে পিটিয়ে হত্যারপর লাশ পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। বুধবার (২৬ আগস্ট) উপজেলার মায়ানী এলাকায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনার জের ধরে বাবুকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে নিহতের স্ত্রী খালেদা আক্তার দাবী। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকালে উপজেলার ১৩ নম্বর মায়ানী ইউনিয়নের মধ্যম মায়ানী এলাকার প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের দক্ষিণ পার্শ্বের একটি পুকুর থেকে পুলিশ বাবুর লাশ উদ্ধার করে। লাশ উদ্ধারের ৩ দিনপর রবিবার (৩০ আগস্ট) ৬ জনের নাম উল্লেখপূর্বক এবং অজ্ঞাত আরো ১০-১২ জনকে আসামী করে একটি মামলা দায়ের করে নিহত সাদ্দামের স্ত্রী খালেদা আক্তার। সাদ্দাম হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত কাউকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

মিরসরাই থানার উপ-পরির্দশক (এসআই) শফিকুর রহমান জানান, নিহত সাদ্দামের স্ত্রী খালেদা আক্তার ৬ জনকে এজাহারভূক্ত এবং অজ্ঞাত আরো ১০-১২ জনকে আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেন। ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহজনক আসামীরা এলাকায় নেই। তবে তাদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

রিকসা চালক সাদ্দাম হত্যার রেশ না কাটতেই ফিল্মি স্টাইলে দিনদুপুরে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে ঐতিহ্যবাহী মিঠাছরা বাজারে। রবিবার (৩০ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১ টার সময় উপজেলার ৯ নম্বর মিরসরাই সদর ইউনিয়নের পূবালী ব্যাংক লিমিটেডের মিঠাছরা বাজার শাখার সামনে এই ঘটনা ঘটে। ছিনতাইকারীদের ছোড়া গুলিবিদ্ধ হয় উপজেলা আওয়ামীলীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক এমরান উদ্দিন, গাংচিল ফিলিং স্টেশনে কর্মরত ম্যানেজার জাহাঙ্গীর আলম ও প্রাইভেটকার চালক বরুণ চৌধুরী। এসময় ছিনতাইকারীরা ১৪ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। ওইদিন রাতেই গাংচিল ফিলিং ষ্টেশনের সহকারী ম্যানেজার আব্দুল জলিল বাদী হয়ে অজ্ঞাত ৪ জনকে আসামী করে মিরসরাই থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পরদিন সোমবার ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে উপজেলার মিরসরাই সদর ইউনিয়নের মধ্যম গড়িয়াইশ গ্রামের শাহ আলমের পুত্র মোজাম্মেল হক (২২) ও দুর্গাপুর এলাকার আলা উদ্দিনের পুত্র সাজ্জাদ হোসেন আরাফাত (২৬) ও নুর হোসেন আরিফকে আটক করে পুলিশ। এরপর মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) গ্রেফতারকৃত ছিনতাইকারী নুর হোসেন আরিফের দেয়া তথ্যমতে রাতে উপজেলার মিঠাছড়া বাজার এলাকা থেকে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত ২ টি মোটরসাইকেল উদ্ধার করে পুলিশ। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট ফারহানা ইয়াসমিনের আদালতে নুর হোসেন আরিফ ছিনতাইয়ের কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় আদালতে লোমহর্ষক কাহিনীর বর্ণনা দেয় সন্ত্রাসী আরিফ। প্রথমে কোটি টাকা বহনকারী গাড়িতে ছিনতাই কাজে অংশ নেয় ১০ জন। প্রাইভেট কারে এলোপাতাড়ি গুলি করে ছিনতাইকারী ছাত্রলীগ-যুবলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা। তাদের গুলিতে লুটিয়ে পড়ে ৩ জন। কোটি টাকার মধ্যে শেষতক ১৪ লাখ টাকার নাগাল পায় তারা। পরে ১০ ছিনতাইকারীর ৪ জন আবার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গুলিবিদ্ধ ৩ জনকে দেখতেও যান। কি সাহস! যেন ফিল্মকেও হার মানায়। গ্রেপ্তারকৃত ছিনতাইকারী নুর হোসেন আরিফের লোমহর্ষক জবানবন্দীতে উঠে আসে এসব তথ্য। মুখোশ পরে ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগ নেতা এমরান উদ্দিনের কোটি টাকা বহনকারী গাড়ি লক্ষ্য করে প্রথমে গুলি করে সন্ত্রাসী মামুন ও বেলায়েত। ৩ জনকে গুলিবিদ্ধ করে গাড়ি থেকে ১৪ লাখ টাকার একটি ব্যাগ তুলে নিয়ে যায় সন্ত্রাসী নোমান-আমজাদ। এরপর ফাঁকা গুলি ছুড়তে ছুড়তে দুটি মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থল মিঠাছড়া বাজার এলাকা ত্যাগ করে তারা। ছিনতাই সম্পন্ন হওয়ারপর এবার যে যার যার মতো চলে যাবে, ঘটনা এতদুর থাকলে কথা ছিল। টাকার ব্যাগ ছিনতাইয়ের ৩ ঘণ্টাপর গুলিবিদ্ধদের মিঠাছড়া জেনারেল হাসপাতালে দেখতেও যান ছাত্রলীগ-যুবলীগ নামধারী ‘চার’ সন্ত্রাসী। জবানবন্দিতে তিনটি গ্রুপে ভাগ হয়ে অপারেশনে অংশ নেয়া এবং যার তথ্যের ভিত্তিতে ডাকাতির এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে সেই তথ্য দাতার নাম-পরিচয়ও প্রকাশ পায়। উঠে এসেছে ভয়ংকর এই ঘটনায় জড়িত ১৯ থেকে ২৫ বছরের তরুণ-যুবকদের সিন্ডিকেটের কথা। কোটি টাকার লোভে পড়েই তারা এই কাজটি করেছে বলে গত ৩ সেপ্টেম্বর আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে স্বীকার করে আরিফ।

চট্টগ্রাম সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেয়া দীর্ঘ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ২০ বছরের উঠতি সন্ত্রাসী নুর হোসেন আরিফ জানায়, ব্যবসায়ী এমরানের গাংচিল ফিলিং স্টেশনে কর্মরত ড্রাইভার কানা জাহিদ আমাদের তথ্য দেয়। সে চট্টগ্রাম-গ-১১-৪৩০১ কারটি অনুসরণ করে। একপর্যায়ে ব্যাংকের কাছাকাছি আসলে কানা জাহিদ জানায়, কারটিতে করে এক কোটি টাকার বেশি টাকা নিয়ে যাচ্ছেন এমরান সাহেব। সকাল ১১ টার দিকে মিঠাছরা বাজারস্থ পূবালী ব্যাংক লিমিটেডের সামনে আসার সাথে সাথে মুখোশ পরে দুই দিক থেকে দুটি মোটরসাইকেলে করে আমি, আমজাদ, নোমান, রহিম বাদশা, মাসুম বেলায়েত গুলি ছুড়তে ছুড়তে কারটির গতিরোধ করি। কারের দরজা না খোলায় মামুন ও বেলায়েত চালক ও এমরানকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে। এরপর দরজা খুলে টাকার ব্যাগটি তুলে নেয় নোমান ও আমজাদ। এরপর উত্তর দিকে ঠাকুরদীঘিতে চলে যাই আমরা। সেখান থেকে আমরা দুটি মোটরসাইকেল চালিয়ে উপজেলার উপকূলীয় চর এলাকা ঝুলনপুরের দিকে চলে যাই। ঝুলনপুরে গিয়ে মামুনের এক বন্ধুর বাসায় মোটরসাইকেল দুটি রেখে সিএনজি নিয়ে পুনরায় মিঠাছড়া বাজারের (ঘটনাস্থল) দিকে আসি। এখানে এসে মামুনের বাসায় টাকার ব্যাগটি রেখে আমরা চারজন গুলিবিদ্ধ আওয়ামীলীগ নেতা এমরান ভাইকে মিঠাছড়া জেনারেল হাসপাতালে দেখতে যাই। এদিকে টাকা ছিনতাইয়ের কাজে আরো যারা অংশ নিয়েছিল বলে নাম প্রকাশিত হয়েছে তারা হচ্ছে নুর হোসেন আরিফ (২০), রহিম বাদশা (২১), মাসুম (২১), বেলায়েত (২২), আমজাদ (২১) ও নোমান (২৩)। তাদের সহযোগিতা করেছে কানা জাহিদ (১৯), মীর হোসেন বাহার (২৭), সাজ্জাদ হোসেন প্রকাশ আরাফাত ও শাহ মোজাম্মেল (২৫)।

মিরসরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইমতিয়াজ এমকে ভূঁইয়া জানান, গত রবিবার (৩০ আগস্ট) মিঠাছড়া বাজারের পেট্টোল পাম্পের মালিক এমরান উদ্দিনকে গুলি করে টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে নুর হোসেন আরিফ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে ছিনতাইয়ে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দী দিয়েছে। আরিফের দেয়া তথ্যমতে ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহৃত ২ টি মোটরসাইকেল মিঠাছড়া বাজার এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। ছিনতাইয়ে জড়িত অন্য আসামীদের গ্রেফতারে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

সর্বশেষ শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাত প্রায় ১১ টার সময় উপজেলার ১০ নম্বর মিঠানালা ইউনিয়নের মধ্যম মলিয়াইশ গ্রামে সন্ত্রাসীদের গুলি ও ছুরিকাঘাতে খুন হয় ব্যবসায়ী মেজবা উদ্দিন ভূঁইয়া। নিহত মেজবা মধ্যম মলিয়াইশ গ্রামের আজিজ উল্ল্যাহ ভূঁইয়া বাড়ির মৃত জামাল উল্ল্যাহ ভূঁইয়ার ছোট ছেলে। ৬ ভাই ১ বোনের মধ্যে মেজবা সবার ছোট। উপজেলার ৭ নম্বর কাটাছরা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের রহমতাবাদ গ্রামের মৃত মফিজুর রহমান সার্জেন্টের কন্যা ফাতেমা কানিজ সীমার সাথে ৩ বছর পূর্বে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় সে। সে ফাবিয়া সাবাহ মেহেরুন নামের দুই বছরের কন্যা সন্তানের জনক। এরপর রবিবার রাতে নিহত মেজবার স্ত্রী ফাতেমা কানিজ সীমা বাদী হয়ে আলতাফসহ চারজনের নাম উল্লেখপূর্বক অজ্ঞাতসহ মোট ৯ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা (নম্বর ৩) দায়ের করেন। মামলার সূত্র ধরে পুলিশ ওই রাতেই অভিযান চালিয়ে অন্যতম আসামী আলতাফ হোসেনকে উপজেলার মঘাদিয়া ইউনিয়নের উত্তর কচুয়া গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেফতারের পর আলতাফ ওই খুনের ঘটনায় ৭ জন প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মিরসরাই থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম জানান, ‘খুনের ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপরাপর খুনিদের পরিচয়ও জানা গেছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের না বলা যাচ্ছে না। আশা করছি খুব অল্প সময়ের মধ্যে বাকীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।’

মিরসরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইমতিয়াজ এমএকে ভূঁইয়া জানান, ‘ঘটনার সবধরণের ক্লু উদঘাটন করা গেছে। আশা করছি দু’একদিনের মধ্যে খুনি চক্রকে গ্রেপ্তার করা যাবে।’

বেপরোয়া ৬ সদস্যের ছিনতাইকারী চক্র, টার্গেট ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনকারীরা:
মিরসরাইয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ৬ সদস্যের একটি ছিনতাইকারী চক্র। উপজেলার বিভিন্ন ব্যাংক গ্রাহদের টার্গেট করে সিনেমা স্টাইলে তারা ছিনতাই করে। ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করে বাড়ি ফেরার পথে চলতি মাসে ৩ টি ছিনতাইয়ের ঘটনায় আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। আসন্ন কোরবানী ঈদকে সামনে রেখে ওই চক্র আরো বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। তবে মিরসরাই থানা পুলিশের দাবী কোরবানী ঈদের আগেই ওই চক্রের সকল সদস্যকে তারা গ্রেফতার করতে সক্ষম হবে। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাতে ছিনতাই চক্রের ২ সদস্য হাত কাটা ফারুক ও আরমানকে গ্রেফতার করে মিরসরাই থানা পুলিশ। গ্রেফতারের পর তারা পুলিশকে জানায়, তাদের ছিনতাই গ্রুপে ৬ জন সদস্য রয়েছে। আসন্ন কোরবানী ঈদের আগ পর্যন্ত ছিনতাই করার পরিকল্পনা নিয়ে তারা মাঠে নামে। বুধবার (২৬ আগস্ট) ছিনতাইয়ের বর্ণনা দিয়ে চট্টগ্রাম ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে গ্রেফতারকৃতরা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী দিয়েছে।

জানা গেছে, গত ৬ আগস্ট ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের মিরসরাই শাখা থেকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা উত্তোলন করে সিএনজি অটোরিক্সাযোগে হাদি ফকির হাট এলাকায় বাড়ি ফিরছিলেন স্কুল শিক্ষক আশরাফুল। মিরসরাই উপজেলা সদরের দক্ষিণে মহাসড়কের বাদামতলী এলাকায় পৌঁছলে একটি মাইক্রোবাস সিএনজি অটোরিক্সার গতিরোধ করে আশরাফুলকে মাইক্রোবাসে টেনে হেঁচড়ে তুলে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে মাইক্রোবাসে তাকে বেদম মারধর করে ব্যাংক থেকে উত্তোলনকৃত সাড়ে ৫ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়। পরে মহাসড়কের কুমিল্লা জেলার ফকির বাজার এলাকায় মাইক্রোবাস থেকে তাকে ফেলে দেয়। এই ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে মিরসরাই থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। গত ১৯ আগস্ট ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের বারইয়ারহাট শাখার এটিএম বুথ থেকেও বিকাশের মাধ্যমে ৮০ হাজার টাকা উত্তোলন করে ধুম ইউনিয়নের মরগাং এলাকায় বাড়ি ফিরছিলেন ফিরোজ খাঁন। কিন্তু ঢাকা-চট্টগ্রাম পুরাতন মহাসড়কের ছদরমাদীঘি এলাকায় একই স্টাইলে ছিনতাইকারীরা তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরে টাকা নিয়ে মাইক্রোবাস থেকে তাকে ফেনীর কাছে ফেলে দেয়। গত ২৪ আগস্ট ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের মিরসরাই শাখা থেকে ৩ লাখ টাকা উত্তোলন করে বাইসাইকেলযোগে বাড়ি ফিরছিলেন মায়ানী ইউনিয়নের নুরুল বারী। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বড়তাকিয়া ব্র্যাক ব্যাংকের সামনে পৌঁছলে ছিনতাইকারীরা মাইক্রোবাসে তাকে তুলে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে টাকা নিয়ে জোরারগঞ্জ এলাকায় তাকে ফেলে দেয়। প্রথম দিকের ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো নিয়ে পুলিশকে নীরব ভূমিকায় দেখা যায়। কিন্তু তৃতীয় ছিনতাইয়ের ঘটনারপর পুলিশ সক্রিয় হয়ে উঠে। ছিনতাইয়ের শিকার নুরুল বারীকে উদ্ধারের পর ওই রাতেই বাদামতলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ছিনতাইকারী হাত কাটা ফারুকে আটক করে পুলিশ। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ওই চক্রের সদস্য আরমানকে আটক করা হয়।

স্কুল শিক্ষক আশরাফুলের ছিনতাই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মিরসরাই থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) মকিবুল ইসলাম জানান, গ্রেফতারকৃত ছিনতাইকারীরা পুলিশের কাছে ছিনতাইয়ের ঘটনার কথা স্বীকার করেছে। ছিনতাইয়ের আগে ব্যাংকের ভিতরেও বাহিরে তাদের লোক থাকে। ব্যাংকের ভিতরে বেশি টাকা কে উত্তোলন করছে তার উপর নজর রাখে একজন। রাস্তায় গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করে অন্য আরেকটি গ্রুপ। ব্যাংকের ভিতরে ও বাহিরে থাকা ২ জন থেকে সিগন্যাল পেলে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করা গ্রুপ রাস্তা থেকে টাকাসহ ব্যাংক গ্রাহককে তুলে নিয়ে যায়। এরপর টাকা নিয়ে নির্জন কোন জায়গায় ফেলে দেওয়া হয়।

মিরসরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইমতিয়াজ এমকে ভূঁইয়া জানান, মহাসড়কের মিরসরাই এলাকায় ছিনতাই চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করতে পুলিশের বিশেষ টিম কাজ করে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আশা করছি আসন্ন কোরবানী ঈদের আগে গ্রুপের অন্য সদস্যদেরও গ্রেফতার করা সম্ভব হবে।

এছাড়া সম্প্রতি উপজেলার সরকারহাট এনআর উচ্চ বিদ্যালয় ও আবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে ইভটিজিং ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। সরকারহাট এনআর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ৬ জন শিক্ষার্থী মদ প্রাণ করে দুই ছাত্রের উপর হামলা করে এবং ছাত্রীদের কমনরুমে (বিশ্রামাগার) প্রবেশ করে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত ওই শিক্ষার্থীদের স্কুল থেকে বহিস্কার করা হয়। আবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাসে প্রবেশ করে এক ছাত্রকে পিটিয়ে মারাত্মক আহত করে স্থানীয় কিছু বখাটে। এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে।

মতামত