টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

চবির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ: জালিয়াতির অভিযোগ তদন্ত না করে পদোন্নতি বন্ধ 

চট্টগ্রাম, ১৩  সেপ্টেম্বর  (সিটিজি টাইমস)::  কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও শিক্ষকদের পরস্পরবিরোধী অভিযোগের কারণে এক বছর ধরে আটকে আছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (আইআর) বিভাগের সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি। আবেদনকারী দুই শিক্ষক পরস্পরের বিরুদ্ধে গ্রন্থ জালিয়াতির অভিযোগ করলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গত এক বছরে এ বিষয়ে তদন্তের কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

আইআর বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিভাগের দুই সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ ফয়সাল ও মোহাম্মদ ফরিদুল আলম সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ আবেদন করেন।

পরবর্তী সময়ে বিভাগীয় পরিকল্পনা কমিটির সভায় দুই শিক্ষক পরস্পরের বিরুদ্ধে গ্রন্থ জালিয়াতির অভিযোগ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে পাঠানো বিভাগের পরিকল্পনা কমিটি সিদ্ধান্তেও এ সব অভিযোগের বিষয় বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিস থেকে একাধিকবার বিভাগের সভাপতির কাছে চিঠি পাঠিয়ে পদোন্নতির বিষয় পুনঃবিবেচনা ও দুই শিক্ষকের পরস্পরবিরোধী অভিযোগের বিষয়ে সুস্পষ্ট মতামত নেওয়া হয়। প্রতিবারই মোহাম্মদ ফয়সাল ও মোহাম্মদ ফরিদুল একে অপরের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ করেন এবং একজন অন্যজনকে পদোন্নতি না দেওয়ার সুপারিশ করেন।

মূলত দুই শিক্ষকের পরস্পরের বিরুদ্ধে গ্রন্থ জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ এবং এ সব অভিযোগ যাচাইয়ের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় পদোন্নতি আটকে যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

এ বিষয়ে বিভাগের তৎকালীন সভাপতি মোহাম্মদ ফয়সাল  বলেন, বিজ্ঞাপিত সহযোগী অধ্যাপক পদের জন্য শর্তানুযায়ী মোহাম্মদ ফরিদুল আলম-এর অভিজ্ঞতা আট বছর পূর্ণ হয়নি। তা ছাড়া ফরিদুল আলম Resource Integration Centre(RIC)-এর যে অভিজ্ঞতাপত্র দিয়েছে তা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮৬তম সিন্ডিকেটের কার্যবিবরণীর ২০নং সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয়। অধিকন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের সময় (১২/০৮/০৬) তিনি RIC এ কর্মরত ছিলেন না। এমনকি চাকরিরত প্রার্থী হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দরখাস্ত পাঠাননি। সুতরাং NGO-এর সহকারী প্রোগ্রাম অফিসার ও চিফ প্রোগ্রাম কো-অর্ডিটের এর অভিজ্ঞতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি আরও বলেন, ফরিদুল আলম পদোন্নতির জন্য যে প্রকাশনা Scholars’ press, germany (পুনর্মুদ্রণ-২০১৩) থেকে প্রকাশিত “Life in Locker : the state of Rohingyas in Bangladesh’’ শীর্ষক সম্পাদিত বইয়ের অধ্যায়-৮ (পৃষ্ঠা ৭৫-৮৭) দাখিল করেছে তা ICDR, Dhaka Bangladesh (১ম মুদ্রণ ২০১২) থেকে প্রকাশিত “To Host or To hurt : Counter narratives on Rohingya Refugee Issue in Bangladesh” শীর্ষক সম্পাদিত বইয়ের অধ্যায়-৮ (পৃষ্ঠা ১২১-১৪২) এর হুবহু (১০০%) অনুরূপ।

এ ছাড়া তিনি আরও বেশ কয়েকটি প্রকাশনা দাখিল করেছেন যেগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। তিনি গ্রন্থ জালিয়াতি ও তথ্য গোপনের মাধ্যমে পদোন্নতি পাওয়ার চেষ্টার কারণেই দায়িত্ববোধ থেকে তার পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করিনি।

অন্যদিকে বিভাগের সাবেক সভাপতি ও তৎকালীন বিভাগীয় পরিকল্পনা কমিটির সদস্য মোহাম্মদ ফরিদুল আলম বলেন, মোহাম্মদ ফয়সালের পরে আমি বিভাগে নিয়োগ পেয়ে তার আগে সহকারী অধ্যাপক হয়ে যাওয়ায় তিনি ঈর্ষান্বিত হয়েছেন। তিনি চান না আমি তার আগে সহযোগী অধ্যাপক হই।

তিনি বলেন, মোহাম্মদ ফয়সাল বিএ (পাস) কোর্সের ডিগ্রির কারণে সহযোগী অধ্যাপক পদের জন্য শর্ত পূরণ করেননি। তার প্রকাশনার তালিকার প্রথম প্রকাশনা বাংলাদেশ অর্থনীতি শিক্ষক সমিতির একটি সংকলনে প্রকাশিত হয়- যা জার্নাল হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নাই। এ ছাড়া মোহাম্মদ ফয়সালের “The Chittagong Hill Tracts Accord in Bangladesh : An Overview’’ এবং ‘‘Reunification in Korean Peninsula’’ বিতর্কিত জার্নাল Mediterranean Journal of Social Sciences প্রকাশিত এবং ওই জার্নালে প্রবন্ধ প্রকাশে অর্থ প্রদান করতে হয় যেখানে মান মুখ্য নয়।

তিনি আরও বলেন, তার চতুর্থ প্রকাশনা ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয়তাবাদ এবং জাতিসত্তার রাজনীতি’’ সমাজ নিরীক্ষণ নামক জার্নালে প্রকাশিত, ‍যা Pear reviewed নয়। মোহাম্মদ ফয়সাল সহযোগী অধ্যাপক পদে বিজ্ঞাপিত পদ এবং আপগ্রেডেশন-এর কোনো শর্তই পূরণ করেননি। সুতরাং তার পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করার কোনো সুযোগ নাই।

এদিকে দুই শিক্ষকের পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাইয়ের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে উভয়ের পদোন্নতি আটকে রাখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিস থেকে কেবল পদোন্নতির বিষয় পুনঃবিবেচনা ও অভিযোগের বিষয়ে সুস্পষ্ট মতামত দেওয়ার জন্য চিঠি পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করা হয়। ফলে এক বছরেও এ সমস্যার এখনো কোনো সমাধান হয়নি। পরস্পরের গবেষণাপত্র জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়টি যাচাই-বাছাই হয়নি।

মোহাম্মদ ফয়সালের কথায়ও প্রশাসনের দুর্বলতার চিত্র ওঠে আসে। তিনি বলেন, বিভাগের পরিকল্পনা কমিটি থেকে ফরিদুল আলমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো প্রকার ব্যবস্থা নেয়নি বরং তৎকালীন উপাচার্যকে দিয়ে ফরিদুল আলমের বিরুদ্ধে আমার অভিযোগ উঠিয়ে নিয়ে তার পক্ষে সুপারিশ করার জন্য চাপ দেওয়া হয়।

এদিকে দুই শিক্ষকের এ টানাপোড়েনের প্রভাব পড়ছে বিভাগের অন্য শিক্ষকদের ওপর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, মোহাম্মদ ফয়সাল ও ফরিদ উদ্দিন বিভাগে যোগ দেওয়ার পর থেকে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। এ সব কারণে বিভাগের যেমন অগ্রগতি হচ্ছে না, তেমনি শিক্ষকদের পদোন্নতি আটকে আছে। এর প্রভাব এখন শিক্ষার্থীদের ওপরও পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে আইআর বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এ সব সমস্যার সমধানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

তবে বিভাগের বর্তমান সভাপতি কামাল উদ্দিন বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তাদের কাগজপত্র রেজিস্ট্রার অফিসে পাঠানো হয়েছে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভাগীয় পরিকল্পনা কমিটির যে সভা হয়েছে সেখানেও তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে আগের মতো একই অভিযোগ করেন। আশা করছি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের অভিযোগ যাচাই করে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।

কিন্তু দুই শিক্ষকের এ দ্বন্দ্বের বিষয়ে মুখ খুলছেন না বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তা ব্যক্তিরা। এ বিষয়ে সমাজ বিজ্ঞান অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবুল হোসাইন বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাইনি। যদি কেউ লিখিত আবেদন করে তাহলে আমি মিটিং ডেকে অনুষদ কমিটি করে দেব।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) প্রফেসর ড. কামরুল হুদা বলেন, আমি দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র দুই মাস হল। আমি কোনো ফাইল আটকিয়ে রাখি না। আর এ ধরনের প্রবন্ধ জালিয়াতি যদি প্রমাণিত হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী তাদের শাস্তি হবে।

এ বিষয়ে উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, এ ধরনের কোনো তথ্য প্রমাণ পেলে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নিব।- দ্য রিপোর্ট

মতামত