টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

মিয়ারমার থেকে আসছে ‘পাম্পবড়ি’ খাওয়ানো গরু

ইমাম খাইর, কক্সবাজার ব্যুরো:
দুই সপ্তাহ পরেই পবিত্র ঈদ-উল আযহা। জেলার হাট-বাজারগুলোতে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে কুরবানীর জন্তু কেনা বেচা। কুরাবনীর জন্য বাজারে প্রচুর পরিমাণ দেশীয় জন্তু মজুদ রয়েছে। সংকটের কোন আশঙ্কা নেই। কিন্তু মিয়ারমারের ‘পাম্পবড়ি’ খাওয়ানো পশু কুরাবনীর বাজারে প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের।
ঈদগাঁও বাজারের গরু বিক্রি করতে আসা রমজান আলী জানান, কুরবানীর জন্য দেশীয় জন্তুর প্রচুর পরিমাণ চাহিদা রয়েছে। সে মতে বাজারে কুরবানীর জন্তু মিলছে। দেশীয় পশুর কোন সংকট নেই।
তিনি বলেন, প্রতিবছর একটি সুবিধাবাদী শ্রেনী বাজারে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে বাইর থেকে কুরবানীর পশু আমদানীর পায়ঁতারা করে। যে কারণে দেশীয় জন্তুর মূল্যায়ন হয়না। সঠিক দাম না পেয়ে বিক্রেতারা হতাশ হন। দেশীয় উদ্যোক্তাদের মূল্যায়নে তিনি পশু আমদানী বন্ধ করা দরকার বলে মনে করেন।
এ দিকে টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ গবাদিপশুর করিডোর দিয়ে মিয়ানমার থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে গবাদিপশু। আমদানি স্বাভাবিক থাকায় এবারের কুরবানে গবাদি পশুর সংকট হবেনা বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, বর্তমানে শাহপরীর দ্বীপ করিডোর এবং টেকনাফ, সাবরাং ও শাহপরীরদ্বীপ ব্যবসায়ীদের কাছে প্রচুর সংখ্যক গবাদি পশু মজুদও রয়েছে। কুরবানের আগে আরও অন্তত ২০ হাজার গবাদি পশু মিয়ানমার থেকে আমদানী হওয়ার বা আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কেউ কেউ দামও সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও বরং আশানুরূপ বিক্রি হচ্ছেনা জানান। অথচ গত বছর এ সময়ে প্রচুর পরিমাণে গবাদি পশু বিক্রি হয়েছে। ভারত থেকে গবাদি পশু আমদানী বন্ধ থাকায় অনেকটা সুবিধায় রয়েছে বলে টেকনাফের ব্যবসায়ীরা জানান।
টেকনাফের গবাদিপশু ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে শাহপরীরদ্বীপ ক্যাডল করিডোরে শত শত গবাদি পশু এবং টেকনাফ, সাবরাং ও শাহপরীরদ্বীপ ব্যবসায়ীদের কাছে প্রচুর সংখ্যক গবাদি পশু বিক্রির অপেক্ষায় মজুদ রয়েছে। কিন্তু ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এখনও ব্যবসায়ীগণ (পার্টি) টেকনাফে আসেননি। অথচ গত বছর এসময়ে প্রচুর পরিমাণে গবাদি পশু বিক্রি হয়েছে। এবছর কুরবানির পশু সংকট হবে বলে মনে হয়না। কুরবানির পশু আমদানি, বিক্রি, পরিবহন ইত্যাদিতে কোন সমস্যা নেই বলেও তিনি দাবি করেন।
ব্যবসায়ীরা কুরবানির পশু সংকট নেই বলে দাবি করে বলেন, শুধু শাহপরীরদ্বীপ ক্যাডল করিডোর এবং টেকনাফ, সাবরাং ও শাহপরীরদ্বীপ ব্যবসায়ীদের কাছে হাজার হাজার গবাদি পশু বিক্রির অপেক্ষায় মজুদ রয়েছে।
কাস্টমস সুত্র জানায়, শাহপরীরদ্বীপ করিডোর দিয়ে জুলাই মাসে ১ হাজার ১৪২ টি, আগস্ট মাসে ৩ হাজার ৫৪ টি এবং ও সেপ্টেম্বর মাসে এ পর্যন্ত ৭২২ টি গবাদি পশু আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে আগষ্ট মাসে এ খাতে রাজস্ব আয় হয়েছে ১৫ লাখ ১৫ হাজার ৬০০ টাকা আর সেপ্টেম্বর মাসে এ পর্যন্ত ৩ লাখ ৬০ হাজার ১ শ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের গ্রামে গঞ্জে বিশেষ করে পাহাড়ী এলাকায় এবং তিন পার্বত্য জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার গরু, ছাগল ও মহিশের প্রচুর বংশ বিস্তার হয়ে থাকে। দেশীয় এসব পশু দিয়ে কুরবানীর চাহিদা মেঠানো সম্ভব বলে মনে করেন পশু বিশেষজ্ঞরা। বাণিজ্যিকভাবে বড় কোন খামার এখনো সৃষ্টি না হলেও প্রচুর পরিমানে দেশীয় গরু, ছাগল ও মহেষ পাওয়া যায় বাজারে। এসব পশু সারা বছর মানুষের পূরণ করে থাকে। দেশের সম্ভাব্য এলাকায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পশু খামার গড়ে তোলা হলে ঈদুল আজহার সময় এবং সারা বছর গোস্তের চাহিদা পূরণ করে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গোস্ত রপ্তানী করা সম্ভব বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এতে করে ভারত ও মিয়ানমার থেকে পশু আমদানীর কোন প্রয়োজন হবে না।
ব্যবসায়ী বলেন, দেশের তিন পার্বত্য জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা বাণিজ্যিকভাবে পশু উৎপাদনের জন্য খুবই অনুকুল। এমনিতেই এসব এলাকায় থেকে প্রচুর পরিমানে গরু, ছাগল ও মহিশ পালন করা হয়ে থাকে। কুরবানরি মৌসুমে এসব পশু মোটা-তাজা করে কুরবানীর বাজারে সরবরাহ করে থাকে। কুরবানীর সময় ছাড়াও সারা বছর এসব পশু গোস্তের চাহিদা পূরণে সহায়ক হয়। পরিকল্পিতভাবে বাণিজ্যিক খামার সৃষ্টির মাধ্যমে পশু পালন ও উৎপাদন করা গেলে দেশের বাজারে পশু ঘাটতির কোন আশঙ্কা থাকে না। এতে করে ভারত-মিয়ানমার থেকে পশু আমদানীর ও প্রয়োজন হবে না। তবে এজন্য দরকার পরিকল্পিতভাবে বাণিজ্যিক খামার গড়ে তোলা, উন্নত জাতের ঘাস উৎপাদনে এবং শুষ্ক মৌসুমে ঘাস সংরক্ষণের জন্য কৃষকদের সহায়তা দেয়া। সরকার এবিষয়ে আন্তরিকতার সাথে এগিয়ে এলে বাংলাদেশ পশু সম্পদের দিক থেকেও স্বনির্ভর হতে পারে বলে মনে করেন তারা।
এক সমীক্ষায় জানাগেছে, প্রতিবছর দেশে কমপক্ষে এক কোটির মত পশু কুরবানী হয়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারী পৃষ্টপোষকতায় পরিকল্পিত পশু খামার গড়ে তোলা হলে, বিশেষ করে পার্বত্য এলাকা ছাড়াও দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে দিয়ে ক্ষুদ্র ক্ষদ্র খামার গড়ে তোলা গেলে ওই পরিমান পশুর চাহিদায় কোন ধরণের ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা নেই।
কুতুবদিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান নূরুল বশর চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, বাজারে কুরবানীর পশুর কোন ঘাটতি নাই। পরিকল্পিত ও বাণিজ্যিকভাবে পশু পালনের উদ্যোগ নেয়া হলে বাংলাদেশ পশু সম্পদের দিক থেকেও স্বনির্ভর হবে। বাজারে পশুর ঘাটতি না থাকা সত্ত্বেও মহল বিশেষের প্রচারণায় গরু, ছাগলের দাম বাড়ানো হয়ে থাকে। এই সুযোগে ভারত থেকে রুগা গরু-মহেশ ও মিয়ানমার থেকে (পামবড়ি খাওয়ানো) অস্ব্যাস্থকর গরু আমদানী করা হয়ে থাকে। যা দেশীয় পশু সম্পদের জন্য অশনি সংকেত।
নাইক্ষংছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যাপক তোফায়েল আহমদ বলেন, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির তিন পার্বত্য জেলাং পরিকল্পিত পশুপালন খামার সৃষ্টি করা গেলে কোন দেশ থেকে পশু আমদানীর প্রয়োজন পড়বে না। এখানে দেশের চাহিদা মত পশু উৎপাদন করা সম্ভব।
বর্তমান সরকার চাইলেই এটা সম্ভব এবং কঠিন কোন ব্যাপার নয়। এতে করে দেশের মানুষ পশু পালন করে চামড়া বিক্রি ও গোস্তের স্বনির্ভরতায় উপকৃত হবে বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে ভারত ও মিয়ানমারের কড়াকড়িতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে দেশের পশু বিক্রেতা ও ক্রেতারা। কক্সবাজার সদরের খরুলিয়া পশুর হাট ও উখিয়ার মরিচ্যা পশুর হাটের কয়েকজন ব্যবসায়ীর সাথে আলাপ করে জানা যায়, ভারতীয় রুগ্ন পশু ও মিয়ানমারের পামবডি খাওয়ানো গরুর চেয়ে দেশীয় গরু, ছাগল ও মহিশের গোস্ত অনেক সু-সাধু। দামও তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক। এছাড়া ভারত ও মিয়ানমারের পশু আমদানীর কারণে দেশীয় পশু খামারী এবং ব্যবসায়ীরা মার খাচ্ছে বলেও জানান তারা।
পশু বিশেষজ্ঞ তারিকুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, দেশে সারা বছর যে পরিমান গোস্তের চাহিদা রয়েছে তা দেশে উৎপাদিত পশু থেক পাওয়া সম্ভব। পশুর খামার সৃষ্টি করা গেলে এবং কুরবানীর জন্য একটু পরিকল্পিতভাবে পশু পালন করা গেলে কুরবানীর ঈদের বাজারে পশু ঘাটতির আশঙ্কা তো থাকেই না।
তিনি বলেন, দেশীয় পশুর গোস্ত বিদেশের বাজারেও রপ্তানী করার সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। তাঁর মতে পশু আমদানীর কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
টেকনাফ স্থল বন্দর কাস্টমস কর্মকর্তা হুমায়ূন কবির জানান, শাহপরীরদ্বীপ করিডোর দিয়ে গরু মহিষ আমদানি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মিয়ানমার থেকে পর্যাপ্ত পরিমান গবাদি পশু আমদানি করা হয়েছে। কুরবানীর পশু নিয়ে কোন সংকট সৃষ্টি হবে না।

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত