টক অব দ্য চট্টগ্রাম
Ad2

পথহারা বিএনপি

bnp-flagচট্টগ্রাম, ১ সেপ্টেম্বর  (সিটিজি টাইমস) : নতুন নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিও ছেড়ে দেওয়ার পথে বিএনপি। দলের আশা, সরকার মধ্যবর্তী নির্বাচন দেবে এবং তার ফল যাই হোক না কেন, তাতে অংশ নিয়ে সংসদে ফেরাটাই গুরুত্বপূর্ণ এখন বিএনপির কাছে।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন ভুল ছিল, এখন বিএনপির নানা পর্যায়ের নেতারাও বলছেন এই কথা। তারা বলছেন, সে সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্বাচনে একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের মতো অবস্থায় ছিল না আওয়ামী লীগ। কিন্তু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে এখন সরকারি দল অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে। সরকারকে টলাতে কিছু করা সম্ভব, সেটা এখন বিশ্বাস করে না বিরোধী এই দলটির নেতারাও।

তার ওপর সৌদি আরব সফর স্থগিত, তার আগের দিন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যদের বৈঠকে নেতাদের তুলোধুনো করা, দল ভাঙার নানা গুঞ্জন, শীর্ষস্থানীয় নেতাদের টেলিফোনালাপে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থার বিষয়টি উঠে আসার ঘটনায় নতুন সংকটে পড়েছে বিএনপি।

ঘোষণা দিলেও এখনো দল গোছানোর লক্ষ্যে দৃশ্যমান কিছু শুরু করেননি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি আসলে কী করতে চাইছেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই কারও কাছে। এর মধ্যে নেতাদের নিয়ে খালেদা জিয়ার সন্দেহ-অবিশ্বাস, কর্মীদের নিষ্ক্রিয়তা, সাম্প্রতিক দলত্যাগ, হরতাল-অবরোধে নাশকতার মামলা বিচার পর্যায়ে চলে যাওয়ার ঘটনায় বিএনপিতে উদ্বেগ পুরনো।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের পর একতরফা নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ বেশিদিন টিকতে পারবে না-এমন বিশ্বাস ছিল বিএনপিতে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এভাবেই একতরফা নির্বাচন করে নিজেরাও দুই সপ্তাহ টিকে থাকতে না পারায় আবারও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির আশা ছিল বিএনপিতে। নির্বাচনের পর গণআন্দোলনের কথা বারবারই বলতেন বিএনপি নেতারা। কিন্তু দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এক বছর পূর্তির পর আন্দোলনে নেমে শূন্য হাতে ঘরে ফেরার পর আন্দোলনের কথাই আর তুলছেন না বিএনপির নেতারা। বরং রাজনীতি থেকে দূরে দূরেই থাকছেন তারা।

নাশকতার মামলায় ছয় মাস আটকের পর জামিতে মুক্তি পেয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আন্দোলন বা সরকারের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেননি। বরং তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার কথাটিই বড় করে বলেছেন। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি প্রকাশ্যে আসেননি একটি দিনের জন্যও, এমনকি দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানেও যোগ দেননি মির্জা ফখরুল। তার এক নিকটাত্মীয় বিএনপি নেতা জানান, মির্জা ফখরুল জামিনে মুক্তি পেয়েছেন চিকিৎসা করানোর কথা বলে। এই অবস্থায় দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি সরকারের বিরাগভাজন হতে চান না।

ফখরুল কবে দেশে ফিরবেন সে বিষয়ে কোনো ধারণা নেই নেতাদের। তবে তিনি যে সহসা ফিরছেন না, সেটা অনেকটাই নিশ্চিত বলে জানিয়েছেন তারা। ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার চিকিৎসার কথা বলে যুক্তরাষ্ট্র অবস্থান নিয়েও দলে কানাঘুষা আছে।

তার ওপর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে এখন জেরার পর্যায়ে আছে শুনানি। এরই মধ্যে একটি মামলায় বাদীর জেরা শেষ হয়েছে। বারবার স্থগিত এই মামলার শুনানি এখন বিশেষ আদালতে প্রতি সপ্তাহেই চলবে বলে জানিয়েছেন বিচারক। এই দুটি মামলার কার্যক্রমে বাধা দিতে বারবার উচ্চ আদালতে গিয়েও কাজ হয়নি। এই মামলার রায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গেলে আগামী জাতীয় নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে যাবেন তিনি।

কেবল এই দুটি নয়, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্যাটকো এবং নাইকো দুর্নীতি মামলাও চলবে বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে হাইকোর্ট। মামলা দুটি দীর্ঘদিন স্থগিত ছিল উচ্চ আদালতে। খালেদা জিয়ার আইনজীবী এবং বিএনপি নেতারা বলছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাদের নেত্রীর বিরুদ্ধে এই মামলাগুলো করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বিএনপি না রাজপথে না আদালতে সুবিধা করতে পারছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ার, নজরুল ইসলাম খান, মওদুদ আহমদ, রফিকুল ইসলাম মিয়া, আবদুল মঈন খান, আ স ম হান্নান শাহ, মাহবুবুর রহমানরা এক বছর আগেও নিয়মিত সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে এলেও এখন রাজনীতি থেকে নিজেদের অনেকটাই সরিয়ে রেখেছেন।

দলটির নেতারা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের পক্ষে সরকারবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া কঠিন। কারণ অর্জন ছাড়া টানা আন্দোলনে নেতা-কর্মীরা ক্লান্ত। প্রায় ২০ হাজারের মতো মামলায় সারা দেশে হাজার হাজার নেতা-কর্মী আসামি, অনেকে কারাগারে। অনেকে বাড়িছাড়া। স্বজনদের ছাড়াই ঈদ করেছেন অনেকে। এই অবস্থায় এলাকায় ব্যবসা করে খেতেন এমন নেতা-কর্মীরা আছে বিপাকে। প্রকাশ্যে এলেই গ্রেপ্তার আতঙ্ক আর আত্মগোপনে থাকলে আয় বন্ধÑ এই দুয়ে মিলে পিষ্ট হচ্ছেন অনেক নেতা-কর্মী।

এবার এলো আন্দোলনে না যাওয়ার ঘোষণা

গত ছয় বছর ধরেই বিএনপি ঈদের পর আন্দোলনের কথা বলে এলেও এবারই প্রথম আন্দোলনে না যাওয়ার ঘোষণা দিলেন খালেদা জিয়া। ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, দল গোছানোর আগে আন্দোলনে যাবে না আর বিএনপি।

বিএনপির জন্য সাম্প্রতিক আরেক বড় ধাক্কা খালেদা জিয়ার সৌদি আরব সফর বাতিল হওয়া। কী কারণে ওমরাহ করতে খালেদা জিয়া এই সফর বাতিল করলেন তা নিয়ে বিএনপি স্পষ্ট করে কিছু না বললেও এ নিয়ে দলের ভেতর নানা কানাঘুষা চলছে। খালেদা জিয়ার সফরসঙ্গীদের কারও কারও ভিসা না হওয়া, তারেক রহমানের সৌদি আরব সফর অনিশ্চয়তাসহ নানা বিষয় উঠে আসছে আলোচনায়।

শেখ হাসিনার সরকার পছন্দ করবে না বলে খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে চিকিৎসা করাতে সৌদি সরকার রাজি হয়নিÑএমন কথা ফাঁস করেছে উইকিলিকস। এ কারণে খালেদার সৌদি সফর স্থগিত হওয়া নিয়ে চিন্তিত বিএনপি। শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়া দেশের বাইরে গেলে দলে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা হবে, এমন কথা নানা সূত্রে কানে গেছে চেয়ারপারসনের।

দল পুনর্গঠন কেবল ঘোষণায়

দল গোছানোর ঘোষণা দিলেও এ বিষয়ে যে খুব বেশি অগ্রগতি নেই। বরং নানা চিন্তায় আটকে গেছে এই উদ্যোগ। কাকে কোন দায়িত্ব দেওয়া হবে, কে আসলে সক্রিয় হবেন এ নিয়ে সিদ্ধান্তে আসতে পারছেন না দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঠেকানোর আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর বিএনপির পুনর্গঠনের ঘোষণা দিয়েও তা এগিয়ে নিতে পারেননি খালেদা জিয়া। বেশ কিছু জেলা কমিটি ভেঙে আহ্বায়ক কমিটিও করা হয়। ভেঙে দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর বিএনপির কমিটিও। কিন্তু বলার মতো কিছুই না হওয়ায় এ কমিটি থমকে যায় কয়েক মাসের মধ্যেই।

সরকার পতনের আন্দোলনে নেমে ব্যর্থ হওয়ার পর দ্বিতীয় দফায় দল পুনর্গঠনের ঘোষণা দেওয়ার পরও কেটে গেছে দুই মাসের বেশি সময়। কিন্তু এখনো সেই কথাই বলে যাচ্ছেন বিএনপি নেতারা। বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব দেবেন জানিয়েছিলেন। কিন্তু এ নিয়ে এখন আর কিছু বলছেন না তিনি। বিএনপির সূত্র জানিয়েছে, কোন প্রক্রিয়ায় দল গোছাবেন তা স্পষ্ট করেননি খালেদা জিয়া। তাই এ নিয়ে শীর্ষ নেতারা আছেন অনেকটা অন্ধকারে।

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, দলীয় ফোরামে এখনো সেভাবে পুনর্গঠনের বিষয়ে কথা না হলেও খালেদা জিয়া চাইলে যেকোনো সময় যেকোনো কমিটি ভেঙে দিতে পারেন। কারণ ৭৫টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কমিটি হয় না এমন সংখ্যাই বেশি। আবার অনেক জেলা বিএনপি বছরের পর বছর আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে চলছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটিও হচ্ছে না। আন্দোলনে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের বেশি অবদান থাকায় খালেদা জিয়া সেখানকার নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন করবে বলে আশা করছে তারা।

শীর্ষ নেতারাও তৃণমূল থেকে দল পুনর্গঠন শুরুর ওপর জোর দিচ্ছেন। এছাড়া সম্প্রতি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে খালেদা জিয়ার বক্তব্যে এমন ইঙ্গিতও মিলেছে। যদিও খালেদা জিয়ার দল পুনর্গঠনের ঘোষণার পর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আসলেই কি তিনি নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী নেতাদের মূল্যায়ন করতে পারবেন? নাকি আবার সুবিধাবাদীরাই থাকবেন বিএনপির নেতৃত্বে? তবে খালেদা জিয়ার ঘোষণার পর আন্দোলন থেকে গা বাঁচিয়ে থাকা নেতারা আতঙ্কে আছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য জমির উদ্দিন সরকার বলেন, ‘আমার ধারণা জেলা কমিটিগুলো ভেঙে দিয়ে দল পুনর্গঠন শুরু হতে পারে। পরে সুযোগ হলে কাউন্সিল করে কেন্দ্রীয় কমিটিতে হাত দেওয়া হবে। তবে চেয়ারপারসন এখনো বিষয়টি নিয়ে ওইভাবে কিছু জানাননি।’

স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের আদর্শ ধারণ করেন এমন সৎ, যোগ্যদের অগ্রাধিকার দিয়ে দল পুনর্গঠন করা উচিত। চেয়ারপারসন সেভাবেই কাজ শুরু করেছেন। সবার মতামত নিচ্ছেন। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের সামনে প্রধান কাজ হলো দল গোছানো।’

বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘দলের গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতা জেলে আছেন। তারা বের হলেই দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করা হবে।’ কোন প্রক্রিয়ায় দল গোছানো হবে এমন প্রশ্নে মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘হয়ত তৃণমূল থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। আর কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের জন্য কাউন্সিল করা দরকার। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কাউন্সিল করাও কষ্টসাধ্য ব্যাপার।’

শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনেও আর আপত্তি নেই

দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করবে না বলে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাইডলাইনে বসেছিল বিএনপি। একতরফা নির্বাচনের সরকার টিকবে না বিশ্বাস করে সে সময় নেওয়া সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণ হয়েছে। ২০১৯ সালের আগে নির্বাচন হবে না সরকারি দলের এই বক্তব্যই এখন প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক মহলে।

তাহলে বিএনপি কী করবে? নেতারা বলছেন, নতুন নির্বাচন দিলে তা শেখ হাসিনার অধীনে হলেও আপত্তি নেই তাদের। বিএনপি নেতারা বলছেন, সরকারের কাছে নিরপেক্ষ নির্বাচনের মৌখিক নিশ্চয়তা আর নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন হলেই এখন আর কিছু চান না তারা। এই দুটি বিষয় ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে সহজেই আদায় করা যেত কি না সে প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাব নেই কারও কাছে।

বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এখন যেকোনো মূল্যে একটি মধ্যবর্তী জাতীয় নির্বাচন চান। সেজন্য কিছু বিষয় ছাড় দিতেও তাদের আপত্তি নেই। দলীয় সূত্রে জানা যায়, সংবিধানের আলোকে নির্বাচনের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের কড়া অবস্থানে তত্ত্বাবধায়কের দাবি থেকে কিছুটা সরে আসার কথা বলছেন বিএনপির নেতারা। পেশাজীবীদের দেওয়া পরামর্শ অনুযায়ী সরকারকে নির্বাচনের পথে আনতে এ বিষয়ে যথাসম্ভব ছাড় দেওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এছাড়াও সরাসরি তত্ত্বাবধায়ক না হলেও প্রধানমন্ত্রীকে রেখে কীভাবে নিরপেক্ষ নির্বাচন করা যায়, সে বিষয়ে একটি প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন বিএনপি নেতারা। বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে জানালেও এতে কী থাকছে সে বিষয়ে কোনো ধারণাই নেই নেতাদের।

বিএনপির কোনো কোনো নেতা মনে করেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের মাসুল দিচ্ছে বিএনপি। কোনোভাবে একটি নির্বাচন করে জাতীয় সংসদে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে মরিয়া বিএনপি। এ কারণেই দলীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রীর অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয় থাকলেও তাতে ছাড় দিতে চায় দলটি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বর্তমান সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপতি স্বপদে থাকলেও নির্বাচনে বিএনপির আপত্তি নেই। তবে এজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সরকারকেই নিতে হবে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, ‘আমরা চাই নির্বাচন। সেজন্য প্রধানমন্ত্রীকে রেখে নির্বাচন করলেও সমস্যা নেই। তবে নির্বাচনকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্যই স্বরাষ্ট্র ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে দূরে থাকতে হবে। পাশাপাশি গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে।’

বিএনপি সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব দিচ্ছে কি না জানতে চাইলে জমিরউদ্দিন সরকার বলেন, ‘এ বিষয়ে দলের মধ্যে আলোচনা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। তবে শিগগিরই বৈঠকে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে।’

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমরা তো সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনর্বহাল চাচ্ছি না। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। সে লক্ষ্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংলাপ হোক। সংলাপ হলে সমাধান বের হয়ে আসবে।’

কর্মীদের দলত্যাগ ভাবাচ্ছে নেতাদের

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানের একটি টেলিফোন আলাপ ফাঁস হয়েছে। নরসিংদীতে তার নির্বাচনী এলাকায় বেশ কিছু নেতা-কর্মী বিএনপি ত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগদান নিয়ে কথা হচ্ছিল আরেক নেতার সঙ্গে। ওই নেতা উদ্বেগ ভরা কণ্ঠে বলেন, এভাবে চলতে থাকলে বিপাকে পড়বেন তারা। মঈন খানও জানতে চান কীভাবে কারা সরকার দলে যোগ দিচ্ছে।

প্রায়ই বিভিন্ন জেলা থেকে এভাবে বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার সংবাদ আসছে গণমাধ্যমে। এ সব খবরেও উদ্বিগ্ন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। তৃণমূল কর্মীদের দলত্যাগ ঠেকাতে এবং তাদের মনোবল চাঙ্গা করতে নানা পরিকল্পনাও নিয়েছে দলটি। শীর্ষ নেতাদের যথাসম্ভব এলাকায় গিয়ে কর্মীদের সঙ্গে বসার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিএনপির পুনর্গঠনে সক্রিয় তৃণমূল কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এমন বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন নেতারা। কারাবন্দি ও আত্মগোপনে থাকা নেতা-কর্মীদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার নির্দেশনাও দিয়েছেন দলের প্রধান খালেদা জিয়া।

তারা বললেন

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. শান্তনু মজুমদার বলেন, আওয়ামী লীগ যেভাবে শক্তি ও মেধার খেলা খেলছে সেক্ষেত্রে কোনো নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে তাদের সরানো যাবে না এটা বিএনপির হাইকমান্ড বুঝে গেছে। এছাড়াও নিজেদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, দলে আসল মতাদর্শের কর্মী সংকটের কারণে তাদের আন্দোলনে বারবার ব্যর্থ হতে হচ্ছে। তাই আগে সংগঠন গুছিয়ে মাঠে নামার চিন্তা করা হচ্ছে বলে আমরা ধারণা।

এছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি ক্ষমতায় না থাকায় নেতাকর্মীরা এমনিতেই হতাশায় ভুগছে। পাশাপাশি মাঠ পর্যাওয়ের কর্মীরা দলের ভবিষ্যত নিয়ে অন্ধকারে আছে। তাদের কাছে পরিষ্কার ধারণা নেই। এ কারণে বারবার ঘোষণা দিয়েও তারা দল পুনর্গঠন করতে পারছেন না। কারণ এসব কারণে নেতাকর্মীরা ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নামতে চায় না।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে একটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করে এমন একটি শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা উচিত। কারণ বর্তমানে সেই অর্থে দেশে কোনো বিরোধী দল নেই। তবে সেটা বিএনপি হবে কিনা তা নিয়ে আমি চিন্তিত নই।

অপরদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লেঃ জেনারেল (অবঃ) মাহবুবুর রহমান বলেন, আমি বলবো না বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি ভেঙে গেছে, তবে সরকারের দমনপীড়নে কারণে ব্যাপক ক্ষতি হয়ে গেছে। তাই আমরা দল পুনর্গঠনকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছি। আন্দোলন যেমন চলমান তেমনি সংগঠন গোছানোর কাজটিও চলমান। এটা অনেক কঠিন কাজ। কারণ দীর্ঘদিন ধরে কাউন্সিল হয়নি, অনেক জেলা কমিটি পুরানো হয়ে গেছে। তাই এখনো দৃশ্যমান কিছু না হলেও সবকিছু মাথায় রেখে কাজ চলছে। তিনি আরো বলেন, আমরা আশাবাদি দল গুছিয়ে আবার মাঠের আন্দোলন শুরু হলে দাবি আদায় করা সহজ হবে।-ঢাকাটাইমস

সিটিজি টাইমসে প্রকাশিত সংবাদ সম্পর্কে আপনার মন্তব্য

মতামত